জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান হাসপাতালের সফটওয়্যার কারসাজিতে লোপাট ২ কোটি টাকা

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ১৩, ২০২৬ | ৯:৩৬ অপরাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে (এনআইওএইচ) দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম অবশেষে প্রকাশ্যে এসেছে। অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটির এক অফিস সহকারী সফটওয়্যার কারসাজি ও নথি জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন—যা নিরীক্ষা ব্যবস্থার চোখ এড়িয়ে গেছে। তদন্তে জানা যায়, অভিযুক্ত কর্মী রিয়াজ উদ্দিন হাসপাতালের বিভিন্ন সেবা—টিকিট, রেজিস্ট্রেশন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচার, কেবিন, রক্ত সংগ্রহ ও অ্যাম্বুলেন্স ফি—থেকে আদায়কৃত অর্থের হিসাব সফটওয়্যারে বিকৃত করতেন। প্রকৃত আদায় গোপন রেখে ব্যাংকে কম অর্থ জমা দেওয়া হতো। একই সঙ্গে ব্যাংক চালানেও কারসাজি করে হিসাবের গরমিলকে আড়াল করা হয়। ফলে প্রকৃত আয় ও জমার অঙ্ক মিলিয়ে দেখার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় বছরের পর বছর এই প্রতারণা অদৃশ্যই থেকে যায়। ঘটনার সূত্রপাত একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে, যেখানে প্রথমে ৮৬ লাখ টাকা জমা না দেওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। পরে গঠিত অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গত পাঁচ বছরের আর্থিক তথ্য খতিয়ে দেখে। সেখানে দেখা যায়, শুধু দুই অর্থবছরেই—২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬—মোট ১ কোটি ৯৯ লাখ ৮০ হাজার ১৫৯ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে, যদি আগের বছরের হিসাবও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়। অভিযুক্ত রিয়াজ উদ্দিনকে গত ৯ই মার্চ গ্রেপ্তার করা হয় এবং একই দিনে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অর্থ আত্মসাতের কথা স্বীকার করেছেন বলে তদন্ত কমিটি জানিয়েছে। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, আত্মসাৎ করা অর্থ দিয়ে তিনি সাভারে জমি কেনেন এবং স্বর্ণালঙ্কারও সংগ্রহ করেন। এমনকি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তথ্য গোপন রাখতে প্রায় ২০ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার কথাও তিনি স্বীকার করেছেন। তবে এখানেই শেষ নয়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় রিয়াজ উদ্দিন দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা এই অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং জমা পড়া অর্থ থেকে অংশ নিয়েছেন। যদিও তিনি এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি। অভিযুক্তদের সবাই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং নিজেদের সম্পৃক্ততা নাকচ করেছেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি এককভাবে সংঘটিত অপরাধ, নাকি বৃহত্তর কোনো চক্রের অংশ? তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রিয়াজ উদ্দিন ২০১৪ সালে যোগ দেওয়ার পর ২০১৮ সালে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ক্যাশিয়ার পদে যুক্ত হন। এরপর থেকেই অনিয়ম শুরু হয়। অর্থাৎ দায়িত্ব ও নজরদারির অভাব কি তাকে এই সুযোগ করে দিয়েছে—এ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। ঘটনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই কারণে যে, এত বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ দীর্ঘদিন ধরে চললেও প্রাতিষ্ঠানিক নিরীক্ষা বা তদারকি ব্যবস্থায় তা ধরা পড়েনি। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সফটওয়্যার নির্ভর হিসাব পদ্ধতির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এদিকে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ফলে তদন্তের পরবর্তী ধাপ ও দায় নির্ধারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এই ঘটনায় একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—কেবল একজন কর্মীকে দায়ী করলেই কি দায় শেষ, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও নজরদারির কাঠামোও পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে?