আকণ্ঠ ঋণে নিমজ্জিত অর্থনীতি: অন্তর্বর্তীকাল থেকে নতুন সরকার- ৪৩ দিনে আরও ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ১৩, ২০২৬ | ৯:৪০ অপরাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

২০২৪-এর আগস্টে দাঙ্গা-সংঘাতের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটানোর পর ক্ষমতায় জেঁকে বসেন বিশ্বজোড়া খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ড. ইউনূস। কিছু মানুষের প্রত্যাশা ছিল দেশের অর্থনীতি মেরামত করে দেশকে শক্ত ভিত্তিতে দাঁড় করিয়ে দেবেন তিনি। তবে নিজের ও সংশ্লিষ্টদের আখের গোছানো ছাড়া কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে বিপুল অর্থ- এমন নানা তথ্য উঠে আসছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। দেশকে আকণ্ঠ বৈদেশিক ঋণে নিমজ্জিত করে সরে পড়েছে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর ক্ষমতায় বসে বিএনপি। ঋণনির্ভরতার সেই পথই পেয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। ক্ষমতায় আসার মাত্র দেড় মাস বা ৪৩ দিনে নতুন সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। ড. ইউনূসের শেষদিকের কিছু সময় আর নতুন সরকারের সময় মিলে সর্বশেষ তিন মাসে এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত ১৮ মাসে ব্যাংকঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় পৌনে ২ লাখ কোটি টাকায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না, ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি কমে গেছে। অন্যদিকে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় কেনাকাটার প্রবণতাও হ্রাস পেয়েছে। এসবের সম্মিলিত প্রভাবে রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে প্রায় সাড়ে ৭১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি-এর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. ইউনূস একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করবেন এমন প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। প্রয়োজনীয় সংস্কারও সেভাবে হয়নি। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে।’ তার মতে, ঋণ নেওয়া আদর্শ সমাধান না হলেও বাস্তবতায় সরকারকে তা করতেই হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ‘বিপুল পরিমাণ অর্থপাচার হয়েছে। গত ১৪ মাসে রপ্তানি ও বিনিয়োগ দুটিই আশানুরূপ হয়নি।’ অন্যদিকে, ব্যয় কমানোর বদলে সরকারকে জ্বালানিতে ভর্তুকি বজায় রাখতে হচ্ছে, যা আর্থিক চাপ আরও বাড়াচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে উদ্বেগের জায়গা হলো ঋণের গতি। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই সরকার ব্যাংক থেকে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে—যা পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসেই ঋণের পরিমাণ বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি এভাবে আগ্রাসীভাবে ঋণ নিতে থাকে, তবে তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমিয়ে দিতে পারে। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ১লা আগস্ট থেকে চলতি বছরের ৩১শে মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে সরকারের মোট ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা। এর বড় অংশই নেওয়া হয়েছে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-এর সভাপতি তাসকীন আহমেদ এই প্রবণতাকে “মিশ্র সংকেত” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, একদিকে এটি অর্থনীতিতে তারল্য বাড়ায়, অন্যদিকে মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি এবং খেলাপি ঋণের ঝুঁকি তৈরি করে। গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ হেলাল আহমেদ জনি বলেন, ‘নেওয়া ঋণ অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে এবং একই সঙ্গে বেসরকারি খাত গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করা সহজ হবে।’ তার মতে, দেশকে ঋণের ফাঁদে পড়া থেকে রক্ষা করতে হলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। সামগ্রিকভাবে চিত্রটি বলছে—অর্থনীতির মৌলিক সমস্যাগুলো এখনো অমীমাংসিত। সরকার পরিবর্তন হলেও নীতিগত ধারাবাহিকতায় বড় পরিবর্তন না আসায় ঋণনির্ভরতা অব্যাহত রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই ঋণ কি অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় চাপ তৈরি করবে?