আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাজেট প্রস্তাবে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ বিনিয়োগে আনার পরিকল্পনা করেছে সরকার।
এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ২৪.৯ এবং সরকারি খাতে ৬.৫ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। অর্থ বিভাগের মতে, এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারলে অর্থনীতিতে গতি ফিরবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং উৎপাদন ও রপ্তানি নতুন করে উজ্জীবিত হবে। তবে বৈশ্বিক সংকট, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা এবং ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধজনিত কারণে জ্বালানি অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। গ্যাস-বিদ্যুতের বাড়তি দাম, অবকাঠামো উন্নয়নে ধীরগতি এবং ব্যাংকিং খাতের চাপের মধ্যে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত কয়েকটি অর্থবছরে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। বিশেষ করে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, ডলার সংকট এবং জ্বালানি ঘাটতির কারণে বিনিয়োগকারীরা নতুন প্রকল্পে যেতে অনীহা দেখিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীলতা বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার আশা করছে, রাজনৈতিক সংকট না থাকায় এখন উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন। তাই বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ ছিল জিডিপির প্রায় ৩০.২ শতাংশ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (প্রাক্কলন) এটি সামান্য বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৩০.৮ থেকে ৩১ শতাংশে। এ হিসাব থেকে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে দেশে বিনিয়োগে বড় ধরনের কোনো জাম্প হয়নি। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির ছিল। উদ্যোক্তারা নতুন শিল্প স্থাপনের বদলে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই বেশি মনোযোগ দিয়েছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়োগ বাড়ানোর যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা অর্থনীতিকে চাঙা করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এক্ষেত্রে প্রয়োজন কার্যকর নীতি, স্থিতিশীল পরিবেশ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সরকার এসব বিষয়ে এখন গুরুত্ব দিচ্ছে। আগামী বাজেটে সরকার বিনিয়োগ বাড়াতে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিচ্ছে। এগুলো হচ্ছে-অর্থনৈতিক অঞ্চল সম্প্রসারণ ও দেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিশেষ প্রণোদনা প্রদান, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) জোরদার করা এবং ডিজিটাল সেবা বৃদ্ধি। এছাড়া নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে স্টার্টআপ সহায়তা ও বিশেষ তহবিল গঠনের কথাও ভাবা হচ্ছে। নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশে কর্মসংস্থানও বাড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বিনিয়োগের হার ৩২-৩৪ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। সেই হিসাবে বর্তমান লক্ষ্য এখনো সীমিত।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ সম্প্রতি বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে প্রথমেই স্থিতিশীল নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকলে কেউ বড় বিনিয়োগে যাবে না। ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কার্যকরভাবে চালু করতে হবে। অনেক সময় একটি প্রকল্প অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, যা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, রপ্তানি খাত এখন বহুমুখী চাপে আছে। গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আবার আন্তর্জাতিক বাজারেও চাহিদা কমছে। এ অবস্থায় নতুন বিনিয়োগের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সহজ শর্তে ঋণ, ব্যাংক সুদহার কমানো এবং রপ্তানিতে নগদ সহায়তা বৃদ্ধি না করলে বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হবে।
জানা যায়, বর্তমানে বিনিয়োগের বড় বাধা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা এবং ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। এলএনজি আমদানি ব্যয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে শিল্প খাতে। গ্যাস সরবরাহ অনিশ্চিত, ফলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটি বড় নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, সরকার বিনিয়োগের যে উচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ করছে, তা কাগজে ভালো শোনালেও বাস্তবায়ন নির্ভর করছে কাঠামোগত সংস্কারের ওপর। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ, ডলার সংকট এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা দূর না করলে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। শুধু বাজেটে লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এদিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া ও উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে। সহজে শিল্পঋণ পাওয়া যায় না। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের (এসএমই) শিল্প খাতগুলো ব্যাংক থেকে সহজে ঋণ পাচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা এবং সহজ শর্তে ঋণ প্রদান না করলে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে না। এছাড়া অবকাঠামো উন্নয়নে ধীরগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকার বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প হাতে নিলেও বাস্তবায়ন হচ্ছে ঢিমেতালে। বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন বিলম্বিত, গ্যাস সরবরাহ লাইনে সীমাবদ্ধতা এবং বন্দর সক্ষমতা এখনো পর্যাপ্ত নয়। এই সীমাবদ্ধতা বিনিয়োগের পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করছে। এজন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কার্যকর করা, কর কাঠামো সহজ ও স্থিতিশীল করা, ব্যাংক সুদহার কমানো, ডলার সংকট নিরসন এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর সংশ্লিষ্টরা গুরুত্বারোপ করেছেন।