প্রচণ্ড গরম। মাথার ওপর গনগনে রোদ। এর মাঝেই চলছে ভয়াবহ লোডশেডিং। দিনে-রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। গরমে হাঁসফাঁস করছে মানুষ। চরম ভোগান্তিতে অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। শনিবার ছুটির দিনেও দুপুরে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। অথচ এই চরম দুর্ভোগের মূলে রয়েছে কেবলই অব্যবস্থাপনা এবং সরকারি বিভাগগুলোর চরম সমন্বয়হীনতা। একদিকে ৪২ হাজার কোটি টাকার বকেয়া, টাকার অভাবে কয়লা ও জ্বালানি কিনতে পারছে না বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। অন্যদিকে নতুন নতুন শর্ত জুড়ে দিয়ে ভর্তুকির টাকা আটকে রেখেছে অর্থ বিভাগ। দুই বিভাগের এই আমলাতান্ত্রিক লড়াইয়ের চড়া মাশুল গুনছে সাধারণ মানুষ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আপাতত বৃষ্টি কেবল দেশকে লোডশেডিংমুক্ত করতে পারে। কারণ, এই গরমে বিদ্যুতের যে চাহিদা, তা মেটানোর মতো প্রস্তুতি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবির নেই। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এ ব্যাপারে বলেছেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে মাত্র দুই মাস হয়েছে। এর মধ্যে সমন্বয় করে বিদ্যুতের এ পরিস্থিতি সামাল দিতে কাজ চলছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, এই গরমে একটা ভালো প্রস্তুতি থাকা দরকার ছিল। কিন্তু সেটা করার কথা ৩/৪ মাস আগে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার আমলে। তারা কী করেছে, আমার জানা নেই।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের এই সময়ে দেশে তেমন কোনো লোডশেডিং হয়নি। গেল বছর বৈশাখের এই সময়ে তেমন গরমও ছিল না। এবার গরমটা অন্য বছরের তুলনায় বেশি। কিন্তু এরপরও সারা দেশে এত লোডশেডিং কেন। ব্যবসায়ী মইনুল হক সিদ্দিকী বলেন, গত সপ্তাহে গাজীপুরে এক দিনের জন্য ছিলাম। ঢাকার পাশের জেলায় সারা দিনে ৪ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যায়নি। তার প্রশ্ন-এবার বিদ্যুতের এত খারাপ অবস্থা কেন।
জানা যায়, এবারের গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিপর্যয় ঘটতে পারে, তা অনেক আগেই বিদ্যুৎ ও অর্থ বিভাগকে জানানো হয়েছিল পিডিবি থেকে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও কঠিন করে তুলেছে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। পিডিবির এই হিসাব এখন শুধুই কিতাবে আছে। বাস্তবে নেই। পাওয়ার গ্রিড অব কোম্পানি বাংলাদেশ-পিজিসিবির তথ্য বলছে, শনিবার দুপুর ১টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৫৭৪ মেগাওয়াট। আর সরবরাহ দেওয়া হয়েছে ১২ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট। লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে দিনে ১৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা গেছে; কিন্তু বড়পুকুরিয়ার একটি ইউনিট বন্ধ এবং শুক্রবার রাতে ভারত থেকে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম আমদানি হওয়ায় বিদ্যুতের ঘাটতি বেড়েছে।
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবার গরম বেশি পড়বে এবং বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি হতে পারে, তা অনেক আগেই বলা হয়েছে সরকারকে। কিন্তু সেই তুলনায় প্রস্তুতি অপ্রতুল। বিশেষ করে গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েল সরবরাহ বাড়ানোর ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের আগ্রহ কম। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি হলেও স্পটে বেশি দামে এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এবার গ্যাসের সরবরাহ আগের চেয়ে কিছুটা কম। গত বছর বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক ৯৫ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস দেওয়া হলেও এবার দেওয়া হচ্ছে ৯২ কোটি ঘনফুটের মতো। এ কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু শুক্রবার উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ১৮ মেগাওয়াট।
তবে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এরফানুল হক শনিবার বলেছেন, এবারও বিদ্যুৎ খাতকে দৈনিক ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হচ্ছে এবং এটা বছরের শুরুতে তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই এখন চাইলেই বিদ্যুৎ খাতকে বেশি করে গ্যাস দেওয়া সম্ভব নয়।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (আদানি ছাড়া) উৎপাদনের সক্ষমতা আছে ৬ হাজার ২৭৩ মেগাওয়াট। শুক্রবার দুপুরে উৎপাদন হয়েছে ৪ হাজার ২৯৬ মেগাওয়াট। মাতারবাড়ী কেন্দ্রে খারাপ কয়লা সরবরাহ দিয়েছিল সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। কেন্দ্রটির উৎপাদনের সক্ষমতা ১ হাজার ২৩০ মেগাওয়াট। কয়লা শূন্যতার কারণে এটি প্রায় ২ সপ্তাহ ১৭০ মেগাওয়াট করে চলেছে। কয়লা আসার পর এখন ১ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করা হচ্ছে। কয়লাভিত্তিক আরেক কেন্দ্র এসএস পাওয়ার কোম্পানির বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১২৩০ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ বিল বকেয়া এবং জাহাজ ভাড়া বিরোধ মীমাংসা না হওয়ায় এটিতে উৎপাদন হচ্ছে (শনিবার বিকাল পর্যন্ত) ৬০০ মেগাওয়াটের মতো। এসএস পাওয়ারের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা-সিএফও এবাদত হোসেন বলেন, এসএস পাওয়ার চালু হয়েছে ২০২৩ সালের অক্টোবরে। এখনো পিডিবি কয়লার দাম নিয়ে বিরোধ মীমাংসা করতে পারেনি। উপরন্তু জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টিও মীমাংসা করতে চাইছে না সরকারি ওই সংস্থা। কয়লার টেন্ডার নিয়ে বিরোধের কারণে নরেনকো ১২৩০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটি অনেকদিন ধরে পুরোদমে চালানো যাচ্ছে না।
অর্থ বিভাগের জিজ্ঞাসা না হয়রানি : পিডিবির কাছে বিভিন্ন সরকারি-বেরসকারি কোম্পানির পাওনা ৪২ হাজার কোটি টাকা। বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রির কারণে পিডিবি এই বছর লোকসান করবে ৬২ হাজার কোটি টাকার মতো। এর মধ্যে ৩৭ হাজার কোটি টাকা কেবল ভর্তুকি দেওয়া হবে অর্থ বিভাগ থেকে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ব্যাপারেও কোনো সিদ্ধান্ত এখনো দেয়নি সরকার।
হাতে আসা কিছু নথিতে দেখা যায়, অর্থ বিভাগের উপসচিব জাকির হোসেন ২১ এপ্রিল বিদ্যুৎ বিভাগকে ১৩টি শর্ত দিয়ে ভর্তুকির ২ হাজার ৬৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ছাড় দিয়েছেন। সেই শর্তের মধ্যে অন্যতম হলো-এই অর্থে (ভর্তুকির টাকা) অনুমোদিত নির্দিষ্ট ৯৪টি কেন্দ্র ছাড়া অন্য কাউকে বিল দেওয়া যাবে না। অর্থ পরিশোধের বিবরণী পরবর্তী প্রস্তাবে জমা দিতে হবে। ভর্তুকির অর্থ বি-আর পাওয়ার ১৬০ মেগাওয়াট কেন্দ্র এবং নরেনকো পাওয়ার কোম্পানিকে দেওয়া যাবে না। এ ধরনের বেশকিছু নতুন শর্ত সংশ্লিষ্টদের চিন্তায় ফেলেছে। কারণ, পিডিবি চাইছে কয়লাসহ তুলনামূলক সস্তার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া আগে পরিশোধ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বকেয়ার কারণে বেরসরকারি বিভিন্ন বিদ্যুৎ কোম্পানি ফার্নেস অয়েল ও কয়লা কিনতে পারছে না। তাই লোডশেডিং বেড়েছে। সেখানে অর্থ বিভাগের নতুন নতুন শর্ত বিদ্যুৎ খাতকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলছে। এক্ষেত্রে অর্থ ও বিদ্যুৎ বিভাগের মধ্যে এখন ঠান্ডা লড়াই চলছে বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন।
২০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির প্রস্তাব নাকচ : অর্থ বিভাগ সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগকে অতিরিক্ত ২০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ওই বিভাগের উপসচিব সুমনা ইসলাম এক চিঠিতে বিদ্যুৎ বিভাগকে জানিয়েছেন, ভর্তুকি পাওয়ার মতো নিয়ম মানার আগে কোনো ভর্তুকি দেওয়া যাবে না। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রের জ্বালানি (কয়লা) কেনাসহ অন্যান্য আর্থিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিত না করে কোনো ভর্তুকি দেওয়া হবে না। তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ কেনার ব্যাপারে ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এবং ভর্তুকির জন্য অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া নীতিমালার পরিপন্থি। পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, সরকারি-বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর ৭/৮ মাসের বিল বকেয়া। টাকার অভাবে অনেকে এলসি করতে পারছে না। অথচ অর্থ বিভাগ এবং বিদ্যুৎ বিভাগ টাকা নিয়ে চিঠি, পালটা চিঠি দিয়ে যাচ্ছে। এদিকে জনগণ ১০/১২ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে।