রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প থেকে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা) লোপাটের অভিযোগ আছে পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং ভাগনি টিউলিপ সিদ্দিকে বিরুদ্ধে। অথচ প্রায় ১৬ মাস আগে উঠা এ অভিযোগের বিষয়ে দুদকের (দুর্নীতি দমন কমিশন) অনুসন্ধান চলছে ধীর গতিতে। অনুসন্ধান দল এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি। দুদক সংশ্লিষ্টদের দাবি-বর্তমানে কমিশন না থাকায় দুদকের সব কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অভিযোগ অনুযায়ী মালয়েশিয়ার বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে রূপপুর প্রকল্প থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচারের বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা থাকলেও প্রয়োজনীয় দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ করতে বিলম্ব হচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশ থেকে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হওয়ায় অনুসন্ধান এগোচ্ছে ধীরগতিতে।
দুদক সূত্র জানায়, অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক তথ্য বিদেশ থেকে আনতে হচ্ছে। এজন্য বিভিন্ন দেশে এমএলআর (মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট) পাঠানো হয়েছে। তবে দুদকের কার্যক্রম পূর্ণমাত্রায় সক্রিয় না থাকায় এসব অনুরোধের প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এসব নথি হাতে না পাওয়ায় অনুসন্ধান দল চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে পারছে না। প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ হাতে এলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে দুদকের সূত্রগুলো জানাচ্ছে।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম দুপুরে বলেন, এই মুহূর্তে রূপপুর দুর্নীতিসংক্রান্ত অনুসন্ধান সম্পর্কে আমার জানা নেই। তবে পরে খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে জানানো যাবে। এরপর বিকালে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।
দুদকের অচলাবস্থার বিষয়ে দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, কমিশন ছাড়া দুদক আইনে নির্ধারিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে কার্যক্রমে একধরনের অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। কমিশন থাকার সময় যেসব অনুসন্ধান ও তদন্ত অনুমোদিত হয়েছিল, সেগুলো সীমিত পরিসরে চলমান রয়েছে। তবে নতুন কোনো অনুসন্ধান বা মামলা অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না।
২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প থেকে ৫ বিলিয়ন বা ৫০০ কোটি ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা) লোপাটের অভিযোগ অনুসন্ধানের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ।
রিটে শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও ভাগনি টিউলিপ সিদ্দিকী মালয়েশিয়ার বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প থেকে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে দুদকের নিষ্ক্রিয়তার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়। এতে বিবাদী করা হয় দুদক চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের। পরবর্তীতে রিটের শুনানি নিয়ে এসব অভিযোগ অনুসন্ধানে দুদকের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে ১৫ ডিসেম্বর রুল জারি করেন হাইকোর্ট। এর দুই দিন পর ১৭ ডিসেম্বর দুদকের এক সভায় শেখ হাসিনা ও তার বোনের পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর প্রায় দেড় বছর পার হয়ে গেলেও তদন্তে অগ্রগতি হয়নি।
গত ৩ মার্চ দুদকের তিন সদস্যের কমিশন পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে কমিশনশূন্য হয়ে আছে দুদক।
২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট বিভিন্ন দেশের সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে দুর্নীতি নিয়ে কাজ করা ‘গ্লোবাল ডিফেন্স কর্প’ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে শেখ হাসিনা পরিবারের দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর শিরোনাম ছিল ‘আউস্টেড বাংলাদেশ’স প্রাইম মিনিস্টার শেখ হাসিনা, হার সান সজীব ওয়াজেদ জয় অ্যান্ড নিস টিউলিপ সিদ্দিক এমবেজেলড ৫ বিলিয়ন ডলার্স ফ্রম ওভারপ্রাইজড ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার্স রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট থ্রু মালয়েশিয়ান ব্যাংকস’। কর্পের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা রাশিয়ার রোসাটম মালয়েশিয়ার ব্যাংকের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে এ অর্থ আত্মসাতের সুযোগ করে দিয়েছে। এতে মধ্যস্থতা করেছেন তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও ভাগনি টিউলিপ সিদ্দিক।
এতে বলা হয়, বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। শেখ হাসিনা এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র অদূর ভবিষ্যতে দেশের বিদ্যুতের ২০ শতাংশ পর্যন্ত সরবরাহ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি ভিভিইআর ইউনিট ব্যবহার করে ২০২৪ সালের মধ্যে দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি অবশ্যই বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে ব্যাপকভাবে সাহায্য করবে। এতে বলা হয়, গণমাধ্যমে এমন ইতিবাচক প্রচারণার আড়ালে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন (রোসাটম) থেকে সোভিয়েত আমলের পারমাণবিক চুল্লি কেনার জন্য ৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ লোপাট করেছেন শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যরা। এর নির্মাণব্যয় তুলনামূলকভাবে বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। এর মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন ব্যাংকে গোপনে পাঁচ বিলিয়ন ডলার সরিয়ে নিতে সহায়তা করেছে রাশিয়া। মালয়েশিয়ার ওইসব ব্যাংকে রাশিয়ার বিশেষ তহবিল থেকে এ অর্থ এসেছে।