‘ব্যাগ ভরে টাকা নিলে মিলছে পকেট ভরা বাজার’, লাগামহীন দামে মেজাজ চড়া ক্রেতাদের

প্রকাশিতঃ মে ১২, ২০২৬ | ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ
প্রধান সম্পাদক

রাজধানীর কাঁচাবাজার থেকে মুদিদোকান — সর্বত্রই এখন একই চিত্র। নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা কার্যত দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। সবজি, ডিম, চাল, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস — কোনো কিছুতেই স্বস্তি নেই ক্রেতাদের। রাজধানীর বিভিন্ন বাজার সরেজমিন ঘুরে এই উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে। এই পরিস্থিতিতে মেজাজ চরমে ক্রেতাদের। বাজারে গিয়ে তাদের অসন্তোষ এবং উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় চোখে পড়ে প্রতিবেদকের। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী মো. সোহেল ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় বললেন- আগে পকেট ভরে টাকা নিলে ব্যাগ ভরে বাজার নিয়ে ফিরতাম, এখন বাজারের ব্যাগ ভরে টাকা নিয়ে গেলে তবেই পকেট ভরা বাজার নিয়ে ফিরতে হচ্ছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গ্রীষ্মকালীন সবজির দাম এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে প্রায়। কাঁকরোল ও গোলবেগুন প্রতি কেজি ১২০ টাকা, দেশি শসা ও লম্বা বেগুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা, ঝিঙা, চিচিঙ্গা ও ধুন্দল ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পটোল ও করলার কেজি ৮০ টাকা। তুলনামূলক কম দামি সবজির মধ্যে ঢেঁড়স ৬০ টাকা এবং মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। তবে কাঁচা মরিচের দাম এখন রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো — প্রতি কেজি ১৬০ টাকা। লাউ ও জালিকুমড়া পিসপ্রতি যথাক্রমে ৭০ ও ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম বাড়ার বিষয়ে বিক্রেতাদের সেই চিরাচরিত আবহাওয়ার অজুহাত, সাথে যুক্ত হয়েছে সবজি পরিবহন খরচের কথাও। কয়েকজন বিক্রেতা জানালেন, কয়েক দিন ধরে বৃষ্টির কারণে কৃষকের সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বাজারে সবজি সরবরাহ হচ্ছে না। এ কারণে বেশি দামেই বিক্রি হচ্ছে সবজি। তবে ক্রেতারা বিক্রেতাদের এই যুক্তি মানতে নারাজ। এক ক্রেতা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “বাজারে এলে মনে হয় পকেট ডাকাতি হচ্ছে। আয় তো বাড়ে না, কিন্তু খরচ প্রতিদিনই বাড়ছে।” বাজারে ভোজ্যতেলের সংকট এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফার অংশ কমিয়ে দেওয়ায় লিটারপ্রতি মাত্র ২ টাকা লাভে তেল বিক্রিতে অনীহা দেখাচ্ছেন ছোট দোকানিরা। ফলে পাড়া-মহল্লার অনেক দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। একই সঙ্গে চিনি, মসুর ডাল, প্যাকেটজাত গুঁড়া মসলা ও পোলাওয়ের চালসহ একাধিক অতিপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও গত দুই থেকে তিন সপ্তাহে লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। প্রোটিনের সহজলভ্য উৎস হিসেবে পরিচিত ডিমের দামও সাম্প্রতিক সময়ে লাফিয়ে বেড়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম ডজনপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়ে এখন ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মুরগির বাজারে ব্রয়লার কেজিপ্রতি ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকায় স্থিতিশীল থাকলেও সোনালি মুরগির দাম উঠেছে ৩৪০ থেকে ৩৫০ টাকায়। গরুর মাংস মানভেদে ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকা এবং খাসির মাংস ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে — যা নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য কার্যত অনাগম্য। চালের বাজারেও স্বস্তি নেই। খুচরা পর্যায়ে মাঝারি মানের চাল ৬০ থেকে ৬৮ টাকা এবং মোটা চাল ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে মাছের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী দামের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। এক কেজি ওজনের রুই বা কাতলার দাম ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় পৌঁছেছে। পাঙাশ ও তেলাপিয়ার মতো তুলনামূলক সস্তা মাছও এখন ২২০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বাজারের সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, একদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিজনিত পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, অন্যদিকে বৃষ্টিজনিত কারণে কৃষিপণ্যের সরবরাহ সংকট — এই দুইয়ের চাপে নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন জ্বলছে। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সংসার চালানো দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।