মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে নীরব অথচ ভয়ংকর রোগগুলোর একটি হলো— অন্যের সাফল্যে কষ্ট পাওয়া। যখন কারো উন্নতি, সুখ কিংবা সম্মান দেখি, তখন অজান্তেই নিজের ভেতরে এক ধরনের হীনমন্যতা কাজ করে। মনে হয়, ‘সে কেন পেল, আমি কেন পেলাম না?’ আর ঠিক এখান থেকেই জন্ম নেয় হিংসা, অশান্তি ও হৃদয়ের সংকীর্ণতা।
কিন্তু ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে এক অপূর্ব হৃদয়ের শিক্ষা—
অন্যের সুখে খুশি হতে শেখো, অন্যের জন্য দোয়া করো। কারণ যে হৃদয় অন্যের কল্যাণ কামনা করে, আল্লাহ সেই হৃদয়কে কখনো শূন্য রাখেন না। আপনি যখন কারো ভালো কিছু দেখে আন্তরিকভাবে বলবেন—
بَارَكَ اللَّهُ فِيكَ
বারাকাল্লাহু ফিকা। অর্থাৎ ‘আল্লাহ তোমার মাঝে বরকত দান করুন।’
তখন শুধু একজন মানুষকে দোয়া করা হয় না; বরং নিজের অন্তরকেও হিংসা থেকে পবিত্র করা হয়।
অন্যের নেয়ামতে হিংসা নয়, বরং দোয়া করুন
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ
‘আল্লাহ যাদেরকে তোমাদের কারো ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন, তোমরা তা লালসা কর না।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৩২)
এই আয়াত আমাদের শেখায়— ‘অন্যের প্রাপ্তি দেখে আফসোস করা মুমিনের কাজ নয়। কারণ প্রতিটি মানুষের রিযিক, সম্মান, সৌন্দর্য, প্রতিভা ও সফলতা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত।’
হিংসা মানুষের নেক আমল ধ্বংস করে
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِيَّاكُمْ وَالْحَسَدَ، فَإِنَّ الْحَسَدَ يَأْكُلُ الْحَسَنَاتِ كَمَا تَأْكُلُ النَّارُ الْحَطَبَ
‘তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা হিংসা নেক আমলকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে, যেমন আগুন কাঠকে পুড়িয়ে ফেলে।’ (আবু দাউদ ৪৯০৩)
হিংসা শুধু অন্যের ক্ষতি চায় না; বরং নিজের অন্তরকে ধ্বংস করে দেয়। এতে ইবাদতে প্রশান্তি থাকে না, দোয়া কবুলের স্বাদ থাকে না, জীবনে বরকতও কমে যায়।
মুমিনের হৃদয় হবে উদার ও কল্যাণকামী
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّىٰ يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্যও তাই পছন্দ করবে যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (বুখারি ১৩, মুসলিম ৪৫)
একজন সত্যিকারের মুমিন অন্যের সুখে কষ্ট পায় না; বরং খুশি হয়। কারণ সে জানে, আল্লাহর ভাণ্ডার সীমাহীন। অন্যের প্রাপ্তি আমার প্রাপ্তি কমিয়ে দেয় না।
بَارَكَ اللَّهُ فِيكَ— বারাকাল্লাহু ফিকা। একটি ছোট দোয়া, বিশাল প্রভাব
কারো নতুন চাকরি হয়েছে, ব্যবসায় সফল হয়েছে, সুন্দর কিছু পেয়েছে কিংবা জীবনে ভালো কিছু অর্জন করেছে— তখন হিংসা নয়, বলুন—
بَارَكَ اللَّهُ فِيكَ
বারাকাল্লাহু ফিকা।
‘আল্লাহ তোমার মাঝে বরকত দান করুন।’
এই দোয়া সম্পর্ককে সুন্দর করে, অন্তরকে প্রশান্ত করে এবং সমাজে ভালোবাসা বাড়ায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ دَعَا لِأَخِيهِ بِظَهْرِ الْغَيْبِ قَالَ الْمَلَكُ: آمِينَ وَلَكَ بِمِثْلٍ
‘কেউ যখন তার ভাইয়ের জন্য অগোচরে দোয়া করে, তখন ফেরেশতা বলে— ‘আমিন, এবং তোমার জন্যও অনুরূপ কল্যাণ হোক।’ (মুসলিম ২৭৩২)
অর্থাৎ আপনি অন্যের জন্য কল্যাণ চাইলে, ফেরেশতা আপনার জন্যও সেই কল্যাণের দোয়া করেন।
কেন অন্যের সুখে খুশি হওয়া জরুরি?
১. এতে অন্তর পবিত্র হয়
হিংসা হৃদয়কে অন্ধকার করে, আর দোয়া হৃদয়কে আলোকিত করে।
২. সম্পর্ক সুন্দর হয়
অন্যের ভালো চাইলে মানুষের ভালোবাসা ও বিশ্বাস অর্জিত হয়।
৩. আল্লাহ বরকত দান করেন
যে অন্যের সুখে খুশি হয়, আল্লাহ তার জীবনেও অপ্রত্যাশিত রহমতের দরজা খুলে দেন।
৪. মানসিক শান্তি আসে
তুলনা মানুষকে ক্লান্ত করে, কিন্তু কৃতজ্ঞতা মানুষকে শান্তি দেয়।
এই পৃথিবীতে সবার পরীক্ষা আলাদা, রিযিক আলাদা, সময় আলাদা। তাই অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবন মেলাতে গিয়ে হৃদয়কে অশান্ত করবেন না। বরং কেউ ভালো থাকলে তার জন্য দোয়া করুন, অন্তর থেকে বলুন—
بَارَكَ اللَّهُ فِيكَ— বারাকাল্লাহু ফিকা।
মনে রাখবেন—
অন্যের সুখে যে হৃদয় হাসতে পারে, আল্লাহ সেই হৃদয়ের জন্য আসমানের অদেখা রহমত খুলে দেন। হয়তো আজ আপনি অন্যের জন্য দোয়া করছেন, আর কাল আল্লাহ এমনভাবে আপনার জীবন বদলে দেবেন— যা আপনার কল্পনারও বাইরে ছিল। আল্লাহ আমাদের অন্তরকে হিংসা, অহংকার ও সংকীর্ণতা থেকে পবিত্র রাখুন এবং অন্যের কল্যাণে খুশি হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।