সরাইলে সেপটিক ট্যাংকে নেমে প্রাণ গেল ৪ শ্রমিকের

প্রকাশিতঃ মে ২১, ২০২৬ | ৬:২১ অপরাহ্ণ
মো: রফিকুল ইসলাম, জেলা প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

বিষাক্ত গ্যাস নাকি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট — তদন্তে প্রশাসন, এলাকায় শোকের মাতম সরাইল উপজেলার কালিকচ্ছ ইউনিয়নের গলানিয়া গ্রামে নির্মাণাধীন একটি ভবনের সেপটিক ট্যাংকে কাজ করতে গিয়ে একে একে চার শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। ২০শে মে বুধবার বিকেলে ৩টায় ঘটে যাওয়া এ হৃদয়বিদারক ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামের পরিবেশ। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গলানিয়া গ্রামের একটি নির্মাণাধীন ভবনের সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার ও কাজের জন্য কয়েকজন শ্রমিক সেখানে যান। প্রথমে একজন শ্রমিক ট্যাংকের ভিতরে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণ পার হলেও তিনি বাইরে ফিরে না আসায় অন্যরা তাকে ডাকাডাকি করেন। কোনো সাড়া না পেয়ে দ্বিতীয় একজন শ্রমিক ভিতরে নামেন। এরপর একইভাবে আরও দুজন একে একে ভিতরে প্রবেশ করেন। কিন্তু তারাও আর বের হয়ে আসেননি। দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও ভিতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে ভবনের মালিক আলী মিয়ার সন্দেহ হয়। পরে তিনি স্থানীয় লোকজনকে খবর দেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ও বাংলাদেশ পুলিশ সরাইল থানা ওসি কে অবগত করা হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। তবে সেপটিক ট্যাংকের প্রবেশপথ অত্যন্ত সরু হওয়ায় উদ্ধারকর্মীরা প্রথমদিকে ভিতরে প্রবেশ করতে পারেননি। পরে আরসিসি ওয়ালের একটি অংশ ভেঙে ট্যাংকের ভিতরে পৌঁছান তারা। সেখানে গিয়ে চারজনের নিথর দেহ দেখতে পান উদ্ধারকারীরা। পরে একে একে মরদেহগুলো বাইরে আনা হয়। নিহতরা হলেন— ১. ইমাম হোসেন, গলানিয়া পশ্চিমপাড়া ২. সমশের মিয়া, গলানিয়া ৩. আরমান, ধর্মতীর্থ ৪. মোঃ হৃদয় মিয়া, গলানিয়া স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সেপটিক ট্যাংকের ভিতরে অন্ধকার পরিবেশে বিদ্যুতের একটি সচল লাইন ছিল। এ কারণে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে অনেকের মতে, দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকা ট্যাংকের ভিতরে জমে থাকা বিষাক্ত মিথেন গ্যাসের কারণেও শ্বাসরোধ হয়ে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে একজনের পর আরেকজন উদ্ধার করতে গিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে অচেতন হয়ে পড়ার ঘটনাকে বিষাক্ত গ্যাসজনিত দুর্ঘটনা বলেই ধারণা করছেন স্থানীয়রা। এ বিষয়ে সরাইল থানা পুলিশ জানায়, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে। প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকেও দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। ঘটনার পরপরই শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় করেন। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। নিহতদের অনেকেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন বলে জানা গেছে। হঠাৎ এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে পরিবারগুলো দিশেহারা হয়ে পড়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেন, সেপটিক ট্যাংক বা সুয়ারেজ লাইনের মতো বদ্ধ স্থানে কাজের আগে গ্যাস পরীক্ষা ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা না হলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। একসঙ্গে চার শ্রমিকের করুণ মৃত্যুতে গলানিয়া গ্রামসহ পুরো সরাইল এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।