২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম বাঁশি এখনও বাজেনি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসব মাঠে গড়াতে বাকি আর ৩দিন। কিন্তু বাংলাদেশে বিশ্বকাপকে ঘিরে সবচেয়ে বড় লড়াইগুলোর একটি শেষ হয়েছে। সেই লড়াই ছিল সম্প্রচার স্বত্ব। কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর খেলা দেখার অধিকার নিয়ে এবং দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটনির্ভর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।
গত কয়েক মাস ধরে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব। দেশের দর্শকরা কোথায় খেলা দেখবেন, কোন চ্যানেল সম্প্রচার করবে, সম্প্রচার স্বত্বের মূল্য কত হবে এবং শেষ পর্যন্ত কারা দেখাবে সেসব নিয়ে ছিল নানা আলোচনা, গুঞ্জন ও অনিশ্চয়তা।
অবশেষে সেই অনিশ্চয়তার অবসান হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), সময় টিভি এবং টি-স্পোর্টস বিশ্বকাপের ম্যাচ সম্প্রচার করবে। শুধু টেলিভিশনেই নয়, সময় টিভি ও টি-স্পোর্টস তাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং ইউটিউব চ্যানেলেও ম্যাচ দেখাবে। পাশাপাশি ছয়টি ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও বিশ্বকাপ সম্প্রচারের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের দর্শকরাও টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, ট্যাব কিংবা স্মার্ট টিভির মাধ্যমে খেলা উপভোগ করতে পারবেন।
বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ টেলিভিশনকে কোনো অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে না। তথ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী কোনো বেসরকারি সম্প্রচারমাধ্যম বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব অর্জন করলে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বিটিভি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার আওতায় সেই সম্প্রচার সুবিধা বিনামূল্যে পেতে পারে। ফলে জনগণের অর্থ ব্যয় না করেই দেশের সাধারণ দর্শকদের জন্য বিশ্বকাপ সম্প্রচারের সুযোগ নিশ্চিত হয়েছে।
জানা গেছে, সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান ইন্টারস্পিড প্রায় ৩৬ কোটি টাকায় বাংলাদেশের জন্য বিশ্বকাপ সম্প্রচারের স্বত্ব নিশ্চিত করেছে। পরবর্তীতে তাদের কাছ থেকে স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যমগুলো সম্প্রচারের ব্যবস্থা করছে।
বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে এই অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার বিষয়টি প্রথম থেকেই আলোচনায় নিয়ে আসে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্বের মূল্য, একাধিক মধ্যস্বত্বভোগীর সম্পৃক্ততা, ছয় হাত ঘুরে স্বত্ব বাংলাদেশে আসার প্রক্রিয়া এবং আর্থিক অসঙ্গতির নানা তথ্য প্রকাশ করা হয়।
২০২৬ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠী প্রায় ২০০ কোটি টাকার বাজার তৈরির চেষ্টা করছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে সম্প্রচার স্বত্বের মূল্য কয়েক গুণ বাড়িয়ে বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি করা।
এই বিতর্কের পেছনে রয়েছে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতাও। সে সময় বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব একাধিক হাত ঘুরে বাংলাদেশে আসে। অভিযোগ ছিল, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে সম্প্রচার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বিভিন্ন মহলে তখনও প্রশ্ন উঠেছিল, বাংলাদেশের মতো বড় ফুটবল বাজার কেন সরাসরি সম্প্রচার স্বত্ব সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছে না।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সরকার শুরু থেকেই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছে। তাদের অবস্থান ছিল পরিষ্কার।ভারতের দর্শকরা বিশ্বকাপ দেখতে পারবেন অথচ বাংলাদেশের মানুষ খেলা দেখতে পারবেন না, এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সেই লক্ষ্যেই বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক, আলোচনা এবং বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা হয়েছে।
জানা গেছে, বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে গঠিত বিশেষ কমিটি একাধিক বৈঠক করেছে। সম্প্রচার স্বত্বের মূল্য, বাজার বাস্তবতা এবং দর্শকের স্বার্থকে সামনে রেখে সম্ভাব্য সমাধান খোঁজা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে,বিটিভিকে এই সম্প্রচারের জন্য কোনো অর্থ দিতে হচ্ছে না। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বেসরকারি সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান স্বত্ব কিনলে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বিনামূল্যে সম্প্রচার সুবিধা পেতে পারে। ফলে সরকার কোনো আর্থিক চাপ ছাড়াই দর্শকের জন্য খেলা দেখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করছে।
একই সঙ্গে সরকারের অবস্থান নিয়েও কড়া বার্তা এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অতীতের মতো কোন মধ্যস্বত্বভোগী রাখা হবে।
অন্যদিকে আগামী ১১ জুন সকালে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী সাংবাদিকদের আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং করবেন বলে জানা গেছে। সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এই ব্রিফিংয়ে বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্বের চূড়ান্ত কাঠামো, কারা কীভাবে সম্প্রচারের সঙ্গে যুক্ত থাকছে, এবং দর্শকরা কোন কোন প্ল্যাটফর্মে খেলা দেখতে পারবেন তা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হবে বলে মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।
বিশ্বকাপ ফুটবল বাংলাদেশের দর্শকদের আবেগ, উন্মাদনা, উৎসব এবং ভালোবাসার নাম। বিশ্বকাপ এলেই দেশের অলিগলি, মহল্লা, গ্রাম এবং শহর ছেয়ে যায় বিভিন্ন দেশের পতাকায়। রাত জেগে খেলা দেখা, বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক, প্রিয় দলের জয়-পরাজয় নিয়ে উচ্ছ্বাস কিংবা হতাশা সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ হয়ে ওঠে এক বিশাল আয়োজন।