শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের লোভে ৭ ব্যাংকে জিম্মি শিক্ষকদের সারাজীবনের সঞ্চয়

প্রকাশিতঃ জুন ১০, ২০২৬ | ৫:৪২ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে শ্রেণিকক্ষে জ্ঞান বিতরণ করে অবসরে যাওয়া হাজারো শিক্ষকের সারাজীবনের সঞ্চয় আজ জিম্মি সাতটি বেসরকারি ব্যাংকে। বাড়তি মুনাফার লোভে আইন লঙ্ঘন করে দুর্বল বেসরকারি ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা এই অর্থ এখন আর ছাড় করা যাচ্ছে না। ফলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন অগণিত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী। এমনকি অনেকে প্রাপ্য টাকা হাতে না পেয়েই মৃত্যুবরণ করেছেন। ৬৪০ কোটি টাকা আটকে সাত ব্যাংকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে অবসর সুবিধা বোর্ডের তহবিলে ১ হাজার ৮২ কোটি টাকা এবং কল্যাণ ট্রাস্টের ৩৫০ কোটি টাকাসহ মোট প্রায় সাড়ে ১৪’শ কোটি টাকা জমা রয়েছে। এর মধ্যে ৬৩৯ কোটি ৬০ লাখ ৬১ হাজার ৭২৫ টাকা আটকে আছে সাতটি বেসরকারি ব্যাংকে। অবশিষ্ট প্রায় ৮০০ কোটি টাকা রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ও জনতা ব্যাংকে রয়েছে, যেখান থেকে অর্থ ছাড়ে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। যে সাতটি বেসরকারি ব্যাংকে শিক্ষকদের অবসরের অর্থ এফডিআর এবং এসটিডি আকারে গচ্ছিত রাখা হয়েছে সেগুলো হলো— ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ ২০০ কোটি টাকারও বেশি রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে। আইন লঙ্ঘন করে বেসরকারি ব্যাংকে অর্থ, নেপথ্যে সাবেক সচিব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা আইন, ২০০২-এর ধারা ৯(৪) এবং সংশ্লিষ্ট প্রবিধানমালা, ২০০৫-এর প্রবিধি ৬ অনুযায়ী অবসর সুবিধা বোর্ডের সমুদয় অর্থ সরকারি ব্যাংকে রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই সুস্পষ্ট আইনি বিধান লঙ্ঘন করে বাড়তি মুনাফার আশায় তুলনামূলক দুর্বল বেসরকারি ব্যাংকে টাকা গচ্ছিত রাখা হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বোর্ডের সাবেক সচিব অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ, বোর্ডের প্রোগ্রামার জামাল হোসেন এবং বোর্ডের ব্যবহারকৃত সফটওয়্যার কোম্পানির মালিক গোলাম সারোয়ার ও মোফাজ্জল মওদুদ এলাহীর যোগসাজশে অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তীতে তারা ওই অর্থ থেকে অতিরিক্ত মুনাফা আদায় করে নেন। সূত্র জানায়, অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ দীর্ঘ সাড়ে আট বছর বোর্ডের সচিব হিসেবে দায়িত্বে থেকে নিজের ভাতিজা মোফাজ্জল মওদুদ এলাহীর সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান ‘গ্রিন বি’কে বোর্ডের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা পরস্পর যোগসাজশে অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের শত শত কোটি টাকা তছরুপ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বিগত সরকারের আমলে শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ ক্ষমতাসীন মহলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মালিকানাধীন ব্যাংকে রাখা হয়েছিল। এর ফলে শিক্ষকদের অর্থ সঠিক সময়ে পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে একসঙ্গে একাধিক শিক্ষকের অর্থ পরিশোধের আবেদন পাঠানো হলেও ব্যাংকগুলো তা দিতে পারছে না বা দিতে অনিচ্ছুক। ব্যাংকগুলো কী বলছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসক মুহম্মদ বদিউজ্জামান দিদার জানান, মন্ত্রণালয় থেকে কোনো চিঠি এসেছে কিনা এবং অবসর সুবিধা বোর্ডের অ্যাকাউন্ট এখনও সক্রিয় আছে কিনা, তা অফিসে গিয়ে যাচাই না করে বলতে পারছেন না। ইউনিয়ন ব্যাংকের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবুল হাশেম স্বীকার করেন যে আগের দায়িত্বশীলরা জমাকৃত অর্থ কোনো খাতে বিনিয়োগ না করে ভাগাভাগি করেছেন বলে তিনি শুনেছেন। এ কারণেই অর্থ ফেরত দিতে সমস্যা হচ্ছে বলে তার ধারণা। সিটিজেনস ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, যিনি অর্থ গচ্ছিত রেখেছিলেন, তিনি আবেদন করলে নিয়ম অনুযায়ী টাকা দেওয়া হবে। টাকা পাওয়ার আগেই মৃত্যু, বাড়ছে মানবিক বিপর্যয় সাতক্ষীরার তালতলা আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী মো. সিরাজুল হক ২০২৪ সালের ১ মে অবসর গ্রহণের পর নিয়মানুযায়ী আবেদন করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ প্রতীক্ষায় প্রাপ্য অর্থ না পেয়ে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়— এমন অনেক শিক্ষক-কর্মচারী আবেদনের পর অর্থ না পেয়েই পৃথিবী ছেড়েছেন। উচ্চ আদালত অবসরের ছয় মাসের মধ্যে শিক্ষকদের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধের নির্দেশনা দিলেও তা মানা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই অর্থ সময়মতো পাওয়া শিক্ষকদের আইনগত ও নৈতিক অধিকার। যা বলচছে মন্ত্রণালয় শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, “শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা দিতে ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।” মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব এবং অবসর সুবিধা বোর্ডের চেয়ারম্যান আবদুল খালেক বলেন, “সাতটি বেসরকারি ব্যাংকে আটকে থাকা মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ে মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। শিক্ষকদের কষ্টার্জিত টাকা আদায় করে তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে।” তবে মন্ত্রণালয়ের আশ্বাসে ভরসা রাখতে পারছেন না ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকরা। দীর্ঘ অপেক্ষা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর কর্মকর্তাদের লোভের বলি হয়ে তারা এখন কেবল ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষায়।