২৭ কোটি থেকে বাড়িয়ে ১,০৮১ কোটির বরাদ্দ: ইমাম-মুয়াজ্জিনের জীবন বদলাবে, নাকি ভোটের মাঠ গরম হবে?

প্রকাশিতঃ জুন ১৪, ২০২৬ | ৪:০৯ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত ও সেবায়েতদের জন্য ১ হাজার ৮১ কোটি টাকার বরাদ্দ নিঃসন্দেহে চোখ টানছে। গত বছরের ২৭ কোটি থেকে এক লাফে চল্লিশ গুণ বৃদ্ধি — সংখ্যাটা যত বড়, প্রশ্নও তত বেশি। এই বরাদ্দ কি সত্যিকারের কল্যাণের ইচ্ছা, নাকি আসন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে কৌশলী পদক্ষেপ? সংখ্যার ভেতরে লুকানো অসংগতি বাজেট বিশ্লেষণ করলে প্রথমেই চোখে পড়ে একটি বড় ফাঁক। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে দেশের মোট ৬,৪৩৮টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৯,৫২০ জনকে এই মাসিক সম্মানি ও উৎসব ভাতা প্রদান করা শুরু হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র ৯,৫২০ জন সুবিধাভোগী — এই সংখ্যাটা বাংলাদেশের বাস্তবতার সামনে দাঁড়ালে কতটা ক্ষুদ্র তা স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশে নিবন্ধিত মসজিদের সংখ্যাই তিন লাখের বেশি। প্রতিটি মসজিদে একজন করে ইমাম ধরলেই সংখ্যা দাঁড়ায় তিন লাখ। সেখানে মাত্র ৯,৫২০ জন পাচ্ছেন সুবিধা — মানে মাত্র ৩ শতাংশ। বাকি ৯৭ শতাংশ ইমাম-মুয়াজ্জিনের জীবনে এই বরাদ্দের কোনো প্রভাবই পড়ছে না। ১,০৮১ কোটি টাকায় আদৌ কতজনকে দেওয়া সম্ভব? মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের মোট ১০,০০০ টাকা করে মাসিক সম্মানি প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই হিসেবে ১,০৮১ কোটি টাকায় বছরে সর্বোচ্চ ৯০,০৮৩ জনকে সম্মানি দেওয়া সম্ভব। দেশের লাখ লাখ ইমাম-মুয়াজ্জিনের তুলনায় এই সংখ্যা হাস্যকর রকম কম। তাহলে বাকি টাকা কোথায় যাবে? প্রশ্নটা অমীমাংসিতই থাকছে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: সারওয়ার ও ধর্মীয় ভোটব্যাংক বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। দেশে প্রায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় মসজিদ এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনরা তৃণমূল পর্যায়ে বিশাল সামাজিক প্রভাব রাখেন। নির্বাচনের আগে এই শ্রেণিকে সন্তুষ্ট রাখার রাজনৈতিক সুবিধা অনেক বেশি। বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই বাজেট তৈরি হলেও, রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষত বিএনপি নেতৃত্বাধীন শিবির এই বরাদ্দকে ভবিষ্যৎ ভোটের মাঠে কাজে লাগাতে মরিয়া বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ: তিনটি মূল প্রশ্ন এই বরাদ্দ ঘোষণার পর থেকেই তিনটি প্রশ্ন বারবার উঠছে — প্রথমত, কারা পাবেন? নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মসজিদের মধ্যে পার্থক্য আছে। যে ইমাম বা মুয়াজ্জিন কোনো অনিবন্ধিত মসজিদে কাজ করেন, তিনি কি এই সুবিধার আওতায় আসবেন? এই বিষয়ে সরকার এখনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়নি। দ্বিতীয়ত, কীভাবে পাবেন? সারা দেশে লক্ষাধিক ধর্মীয় কর্মীর কাছে নিয়মিত অর্থ পৌঁছে দেওয়ার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বর্তমানে নেই। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বিতরণের কথা বলা হলেও এই প্রতিষ্ঠানটির নিজেরই সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তৃতীয়ত, কতদিন পাবেন? বাংলাদেশের বাজেট বরাদ্দের ইতিহাস বলে, প্রথম বছর ঘোষণা হলেও পরবর্তী বছরে বরাদ্দ কমে যাওয়ার নজির অনেক। ধর্মীয় নেতাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এক বিবৃতিতে জানান, এই বাজেট জনআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী। অর্থাৎ বরাদ্দ যতই বড় হোক, ধর্মীয় নেতারাও নিশ্চিত নন যে এই বাজেট আদৌ সাধারণ মানুষের কাজে আসবে। ঘোষণা বনাম বাস্তবতা ইতিহাস বলে, বাংলাদেশে বড় বরাদ্দ মানেই বড় উপকার নয়। ৯৭ শতাংশ ইমাম-মুয়াজ্জিনকে বাইরে রেখে ৩ শতাংশকে সুবিধা দেওয়ার এই মডেল কতটা কার্যকর তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটুকু নিশ্চিত — ১,০৮১ কোটি টাকার এই ঘোষণায় যতটা না ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জীবন বদলাবে, তার চেয়ে বেশি বদলাবে রাজনৈতিক সমীকরণ।