ব্র্যাককে বিদেশী অনুদানে কর রেয়াত: চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ভূমিকার পুরস্কার?

প্রকাশিতঃ জুন ১৫, ২০২৬ | ৪:৪১ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় গত ৮ জুন একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে ১১টি প্রতিষ্ঠানকে কর রেয়াতের সুবিধা দিয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এনজিও ব্র্যাক। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত এই সুবিধা বলবৎ থাকবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের সময় ও প্রেক্ষাপট মিলিয়ে দেখলে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে — এটি কি নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি জুলাই-আগস্ট ব্র্যাকের ভূমিকার প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ? জুলাই আন্দোলনে ব্র্যাকের ভূমিকা বিডিডাইজেস্টের পূর্বে প্রকাশিত একটি বিশেষ তদন্তমূলক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ১৮ জুলাই আন্দোলন পুনরায় চাঙ্গা করতে ব্র্যাক কর্তৃপক্ষের সরাসরি নির্দেশনা ও সহায়তার অভিযোগ তোলা হয়েছে প্রতিবেদনে। সংবাদের লিংকঃ ইউএসএআইডি ও সোরস ফাউন্ডেশনের বিপুল অর্থায়ন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবেদন আরও জানা যায়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. ডেভিড ডাউল্যান্ড আন্দোলনস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন এবং আক্রমণ হলে প্রধান ফটক খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া ব্র্যাকের প্রধান নির্বাহী আসিফ সালেহ ১৭ জুলাই একটি ভার্চুয়াল মিটিংয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চালু রাখার নির্দেশনা দেন বলে একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়। মিটিংয়ে উপস্থিত এক শিক্ষক জানান, আসিফ সালেহ ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন (সোরোস) ও ইউএসএআইডির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর আন্দোলন চালু রাখার বিষয়ে নির্দেশনা পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। বিদেশি অর্থের বিশাল প্রবাহ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এ পর্যন্ত ইউএসএআইডি থেকে প্রায় ৩৪ মিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা পেয়েছে, যার মধ্যে শুধু ২০২৪ সালেই অর্থ ছাড় হয়েছে ১৮ মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২০০ কোটি টাকা। এছাড়া ২০২০ সালে জর্জ সোরোসের ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের ১ বিলিয়ন ডলারের ফান্ডের অংশীদার হয় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। উল্লেখযোগ্য যে, ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে ইউএসএআইডির একাধিক প্রকল্পকে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটির বাজেটে কর রেয়াতের প্রশ্ন ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং আগামী অর্থবছরে তা সাড়ে ৯ লাখ কোটি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই বিশাল বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রাও বিশাল। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষা ফি আরোপের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি কোটি কোটি ডলারের অনুদানে পরিচালিত একটি বিশাল এনজিওকে কর রেয়াতের সুবিধা দেওয়া রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। পুরস্কার নাকি নীতি? কর রেয়াতের তালিকায় থাকা রামকৃষ্ণ মঠ, বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি বা চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত সম্পদে জনসেবা করে যাচ্ছে। এদের পাশে ব্র্যাকের মতো বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে একই কর রেয়াতের সুবিধায় রাখা কতটা যুক্তিসঙ্গত? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুলাইয়ের কথিত বিপ্লবে ভূমিকা রাখা একটি প্রতিষ্ঠানকে সরকার গঠনের পরপরই কর রেয়াতের সুবিধা দেওয়ার সময়টি অন্তত একটি জরুরি প্রশ্নের দাবি রাখে — এটি কি নীতিগত সিদ্ধান্ত, নাকি রাজনৈতিক কৃতজ্ঞতার প্রকাশ? এই প্রশ্নের উত্তর সরকারকেই দিতে হবে।