সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষক নিয়োগে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ অসম্মতি দিয়েছে বলে জাতীয় সংসদে স্বীকার করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। রবিবার (১৪ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ষষ্ঠ দিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের জামায়াত সংসদ সদস্য মো. নুরুল ইসলামের লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
জামায়াত সাংসদের প্রশ্ন, সরকারের স্বীকারোক্তি
জামায়াতের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম প্রশ্নে সংগীত শিক্ষকের পদটিকে সরাসরি ‘বিতর্কিত’ আখ্যা দিয়ে জানতে চান এই পদের বর্তমান অবস্থা কী। জবাবে মন্ত্রী লিখিতভাবে সংসদকে জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত বিষয়ের শিক্ষক পদ সৃজনের বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ অসম্মতি দিয়েছে।
ঘটনাপ্রবাহ: যেভাবে বাতিল হলো সংগীত শিক্ষকের পদ
গত বছরের ২৮ আগস্ট ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা ২০২৫’ জারি করা হয়। সেখানে চারটি পদে শিক্ষক নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছিল — প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক (সংগীত) এবং সহকারী শিক্ষক (শারীরিক শিক্ষা)।
প্রজ্ঞাপন জারির পরপরই জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনসহ একাধিক ধর্মভিত্তিক দল বিক্ষোভ, সেমিনার ও মিছিলে এর বিরোধিতা করে। তাদের দাবি ছিল, সংগীত শিক্ষা ইসলামি মূল্যবোধের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ। এই চাপের মুখে মাত্র দুই মাসের মধ্যে গত ২ নভেম্বর ২০২৫ সংশোধিত গেজেট জারি করে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার পদ দুটি বাতিল করা হয়।
হাইকোর্টের রুল, তবু মন্ত্রিপরিষদের দরজা বন্ধ
পদ বাতিলের ওই প্রজ্ঞাপনকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হলে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ প্রজ্ঞাপনটি কেন বেআইনি ও বাতিল ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। কিন্তু সেই রুল বিচারাধীন থাকার মধ্যেও আজ সংসদে মন্ত্রী স্পষ্ট করলেন — মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এই নিয়োগে সম্মতি দেয়নি।
প্রশ্নটি যা থেকে যাচ্ছে
বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত রবীন্দ্রনাথের রচনা, মুক্তিযুদ্ধে সংগীত ছিল প্রেরণার উৎস, লোকসংগীত এই ভূখণ্ডের হাজার বছরের ঐতিহ্য। অথচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষকের পদ রাখার সাহস দেখাতে পারল না সরকার। মৌলবাদী দলগুলোর চাপে একের পর এক পিছু হটার এই ধারা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলছে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, আজ জামায়াতের সংসদ সদস্যের প্রশ্নে সরকার যা স্বীকার করল, তা কেবল একটি শিক্ষক পদ বাতিলের গল্প নয় — এটি সাংস্কৃতিক শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রের আত্মসমর্পণের স্বীকৃতি।