বিআরটিএর ওয়েবসাইট ক্লোন: এআই ক্যামেরার ভুয়া মামলায় গচ্চা লাখ লাখ টাকা, বিদেশি চক্রের ফাঁদ

প্রকাশিতঃ জুন ১৫, ২০২৬ | ৪:৪৮ পূর্বাহ্ণ
প্রধান সম্পাদক

রাজধানীর সড়কে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ক্যামেরার নজরদারিকে পুঁজি করে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক চক্র। আইন ভঙ্গ করেননি এমন মানুষের মোবাইল ফোনেও ট্রাফিক মামলার ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে বিআরটিএর ক্লোন ওয়েবসাইটে নিয়ে গিয়ে কার্ডের তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে এই চক্র। ইতিমধ্যে অনেকেই প্রতারকদের ফাঁদে পা দিয়ে লাখ টাকা পর্যন্ত খুঁইয়েছেন। ক্রমেই বাড়তে থাকা এসব ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। অবশেষে এই প্রতারক চক্রের সন্ধান পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, চক্রের সদস্যরা বিদেশে বসেই তিনটি স্তরে প্রতারণা পরিচালনা করছে এবং টাকা হাতিয়ে নিতে দেশে এজেন্ট নিয়োগ দিচ্ছে। পরে সেই অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, চীন, কম্বোডিয়া ও হংকংয়ের প্রতারক চক্রের তথ্য পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে মূল প্রতারকদের দেশীয় এজেন্টদের বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। চীন থেকে সক্রিয় একটি চক্রের তিন বাংলাদেশি এজেন্টকে গত বুধবার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন- মূল দেশীয় এজেন্ট ইফতেখার হাসান রায়হান এবং তার দুই সহযোগী মো. জাহিদুল ইসলাম ও রিপন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেমেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজের বিজ্ঞাপন দিলে রায়হানকে খুঁজে নেয় ওই চীনা প্রতারক চক্র এবং রায়হান পরে অপর দুজনকে যুক্ত করে। বিদেশ থেকে যেভাবে পাতা হচ্ছে প্রতারণার ফাঁদ ডিবি জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশন ও বিআরটিএর সার্ভার হ্যাক হয়ে তথ্য আগেই পাচার হয়ে গেছে এবং ডার্ক ওয়েবে প্যাকেজ হিসেবে বিক্রিও হয়েছে। বিভিন্ন দেশের প্রতারকরা সেই তথ্য কিনে নিয়ে এখন প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এআই মামলার প্রতারণার ক্ষেত্রে প্রথমে বিআরটিএর ওয়েবসাইট হুবহু নকল করে একটি ক্লোন ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়। মামলার ভুয়া বার্তায় থাকা লিংকে ক্লিক করে ভুক্তভোগী যখন ওই ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেন, তখন পেমেন্ট অপশনে নাম, ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড নম্বর, কার্ডের মেয়াদ ও সিভিভি নম্বর দিতে বলা হয়। মূলত ফিশিং ওই ওয়েবসাইটে প্রবেশমাত্রই ভুক্তভোগীর মোবাইলের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় প্রতারকের হাতে। কার্ডের তথ্য দেওয়ার পর প্রতারক মোবাইলে আসা ওটিপি নম্বরও দেখতে পান এবং তাৎক্ষণিক সেই তথ্য পাঠিয়ে দেন দেশে ভাড়া করা এজেন্টের কাছে। মুহূর্তের মধ্যে অ্যাকাউন্ট থেকে সর্বোচ্চ সম্ভব পরিমাণ টাকা বিকাশে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর আরেক চক্রের মাধ্যমে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে সেই অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়। ডিবি আরও জানায়, ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের তথ্য থেকে বিকাশে এড মানি করে একটি চক্র টাকা সরবরাহ করে আরেক চক্রের কাছে, যারা সেই অর্থ পাচার করে। এই দুই স্তরের কেউ কাউকে চেনে না। উভয় স্তরের এজেন্ট নির্বাচন করে বিদেশে থাকা মূল চক্র। লাখ টাকাও খুঁইয়েছেন অনেকে গত ২৫শে মে জিয়ারত ইসলাম নামে এক চিকিৎসকের মোবাইলে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের নাম করে বার্তা আসে, ওভার স্পিডের কারণে তার গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বার্তায় সড়ক ট্রাফিক আইনের ১৪ ও ২৩ ধারার সংশোধনী উল্লেখ করে জানানো হয়, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জরিমানা পরিশোধ না করলে প্রতিদিন ৫ থেকে ১০ শতাংশ হারে বিলম্ব ফি যুক্ত হবে এবং বকেয়া ৩০ দিন ছাড়িয়ে গেলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়াসহ আদালতে মামলা দায়েরের হুমকিও দেওয়া হয়। বার্তায় থাকা লিংকে প্রবেশ করে ক্রেডিট কার্ডের তথ্য দেওয়ার পর মুহূর্তের মধ্যে দুটি বাংলাদেশি নম্বরে তার অ্যাকাউন্ট থেকে ১ লাখ টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়। ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের (দক্ষিণ) সহকারী কমিশনার খান মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘প্রতারকরা নতুন কোনো ডিজিটাল সেবা দেখলে সেটিকে পুঁজি করে প্রতারণার ফাঁদ পাতছে। এটি থেকে বাঁচতে সচেতনতার বিকল্প নেই।’