কমনওয়েলথ সেক্রেটারি-জেনারেল অনার শার্লি বচওয়েকে চিঠি দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। গত ১৯ জুন তারিখে লেখা এই চিঠিতে তিনি গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দলের প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
চিঠিতে ওবায়দুল কাদের জানান, গত ৯ জুন কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েটের পাঠানো চিঠি ও পর্যবেক্ষক দলের প্রতিবেদন তিনি পেয়েছেন।
এই প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে শেয়ার করার সিদ্ধান্তকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, এটি প্রমাণ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো অর্থপূর্ণ আন্তর্জাতিক আলোচনা থেকে দেশের সবচেয়ে পুরনো ও বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর একটিকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়।
চিঠিতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একটি সম্পূরক প্রতিবেদনও সংযুক্ত করা হয়েছে, যার শিরোনাম— “Beyond Election-Day Order: Awami League’s Observations on the Commonwealth Observer Group Report on Bangladesh’s 12 February 2026 Parliamentary Election and Referendum”। এই প্রতিবেদনে নির্বাচন-পরবর্তী নয়, বরং নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া—আইনি কাঠামো, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা, ভোটার ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা, ভোটের হার ও ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা—এসব বিষয়ের ভিত্তিতে নির্বাচনের মূল্যায়ন হওয়া উচিত বলে আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে মত দেওয়া হয়েছে।
ওবায়দুল কাদের চিঠিতে লেখেন, পর্যবেক্ষক দলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী যেসব স্থানে পরিদর্শন হয়েছে সেখানে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল মনে হয়েছিল বলে আওয়ামী লীগ তা নোট করেছে। তবে দলের বক্তব্য, কেবল নির্বাচনের দিনের শৃঙ্খলা দিয়ে গণতান্ত্রিক বৈধতা নিশ্চিত হয় না। তার ভাষায়, উপরোক্ত মানদণ্ডে বিবেচনা করলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক বা প্রতিনিধিত্বশীল ছিল না।
চিঠিতে দাবি করা হয়, আওয়ামী লীগ কোনো অবাধ নির্বাচনে ভোটারদের কাছে পরাজিত হয়নি, বরং ভোটারদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার আগেই দলটিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। দলের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে, নির্বাচনী নিবন্ধন বন্ধ করা হয়েছে এবং দলটির সঙ্গে সম্পর্কিত লাখ লাখ নাগরিককে অর্থপূর্ণ রাজনৈতিক পছন্দের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
সম্পূরক প্রতিবেদনে গণভোটের আইনি কাঠামো নিয়ে বিতর্ক, জনসচেতনতার ঘাটতি, “হ্যাঁ” ভোটের পক্ষে রাষ্ট্রীয় প্রচার, ব্যালট ডিজাইন নিয়ে প্রশ্ন, গণভোটের ফল প্রকাশে বিলম্ব, অস্বাভাবিক ভোটার উপস্থিতির ধরন, পোস্টাল ভোট নিয়ে উদ্বেগ, সহিংসতা ও ভয়ভীতির প্রতিবেদন এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থকদের ওপর চাপের বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে বলে চিঠিতে জানানো হয়।
চিঠিতে কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েটের প্রতি ছয়টি অনুরোধ জানিয়েছেন ওবায়দুল কাদের। এর মধ্যে রয়েছে—
আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার;
দলটির সংগঠিত হওয়া, কথা বলা, সভা করা ও ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার পুনর্বহাল;
কোনো পূর্বশর্ত বা বহিরাগতভাবে আরোপিত রাজনৈতিক ফর্মুলা ছাড়াই সব প্রধান রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংলাপ;
রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে দলীয় কর্মী, পেশাজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার;
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোট প্রক্রিয়ার স্বাধীন পর্যালোচনা; এবং
একটি নিরপেক্ষ কাঠামোর অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি।
চিঠির শেষাংশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লেখেন, দলটি সাংবিধানিক গণতন্ত্র, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং নিজেদের সরকার বেছে নেওয়ার জনগণের সার্বভৌম অধিকারের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। তিনি বলেন, বাদ দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে না এবং লাখ লাখ নাগরিককে নিশ্চুপ করে বা দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক ধারাকে গণতান্ত্রিক অঙ্গন থেকে অপসারণ করে স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব নয়।
২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, ঢাকা’র ঠিকানা সম্বলিত প্যাডে পাঠানো এই চিঠির একটি অনুলিপি লন্ডনের মার্লবরো হাউসে কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েটের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।