দীর্ঘদিন তুলনামূলক শান্ত থাকা পার্বত্য চট্টগ্রামে ফের উত্তেজনা বাড়ছে। খাগড়াছড়ির পানছড়ি ও রামগড় উপজেলায় গত দুই দিনে পরিচালিত আলাদা দুটি অভিযানে সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে। সেনাবাহিনীর সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এতে সশস্ত্র সংগঠনের একজন সদস্য নিহত হয়েছেন এবং বেশ কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে স্থানীয় ও অনানুষ্ঠানিক সূত্রে তিনজন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার দাবি করা হলেও তা আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
সেনাবাহিনীর বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত সোমবার (২৩ জুন) দুপুর আনুমানিক ২টায় পানছড়ি উপজেলায় এবং মঙ্গলবার (২৪ জুন) সকাল আনুমানিক ১০টায় রামগড় উপজেলায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলের বিরুদ্ধে দুটি অভিযান পরিচালনা করে সেনাবাহিনী। অভিযান চলাকালে সংগঠনের সদস্যরা সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি চালালে উভয়পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় হয়।
আইএসপিআর অনুযায়ী, পানছড়ি উপজেলার বরকলক এলাকা থেকে সশস্ত্র সংগঠনের দুই সদস্য দুটি একে-৪৭ রাইফেল, দুটি ম্যাগাজিন এবং ১৩২ রাউন্ড গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করেন। অন্যদিকে রামগড় উপজেলার হাজাছড়া এলাকায় পরিচালিত অভিযানে গুলি বিনিময়ের একপর্যায়ে সংগঠনের একজন সদস্য নিহত হন। সেখান থেকে একটি একে-৪৭ রাইফেল, একটি ম্যাগাজিন, একটি পাইপগান এবং ২৭ রাউন্ড গোলাবারুদসহ অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধার করা হয়। সেনাবাহিনীর বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সকল জাতিগোষ্ঠীর জানমাল ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
এদিকে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে, খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার চেঙ্গী ইউনিয়নের বারকলক বুজ্জে পাড়া এলাকায় সেনাবাহিনী ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-মূল)-এর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে এবং তাতে তিনজন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। তবে এই তথ্যের ব্যাপারে সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি, এবং তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অনানুষ্ঠানিক সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১টার দিকে এলাকাটিতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়, পরে সেনাবাহিনীর একটি দল সেখানে গেলে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী, ইউপিডিএফ (মূল)-এর দুই সদস্যকে আত্মসমর্পণে প্রভাবিত করার চেষ্টা নিয়ে বিরোধের জেরে এই উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনী এলাকায় গেলে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে বলে দাবি করা হয়েছে।
ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। পানছড়ির এক অধিবাসী ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, ইউপিডিএফ জোরপূর্বক তরুণদের কর্মী হিসেবে সংগঠনে যুক্ত করছে এবং তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে। ওই পোস্টে আত্মসমর্পণকারী দুই ব্যক্তিকে ইউপিডিএফের সদস্য সত্য চাকমা ও বিশাল চাকমা নামে উল্লেখ করে বলা হয়, তারা পানছড়ির বরকলকে সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন।
খাগড়াছড়ির পার্বত্য অঞ্চলে বেশকিছুদিন ধরেই বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে আসছে। সাম্প্রতিক সময়েও পানছড়ি উপজেলায় একাধিক হত্যাকাণ্ড ও সংঘর্ষের খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে গত কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে শান্ত থাকার পর সাম্প্রতিক এই দুটি অভিযান এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন দাবি ও প্রতিক্রিয়া অঞ্চলটিতে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির আভাস দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।