বিভিন্ন ইস্যুতে ধামাচাপা পড়ে গেল রাষ্ট্রীয় গাফিলতিতে হামের মহামারিতে শিশু মৃত্যুর ঘটনাগুলো। শীর্ষ গণমাধ্যমেও এখন আর হামের খবরটি গুরুত্ব পাচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, ‘উপরমহল’ থেকে এ নিয়ে ‘চাপ’ প্রয়োগ করা হয়েছে গণমাধ্যমগুলোর ওপর।
তবে থেমে নেই শিশু মৃত্যুর ঘটনাগুলো। প্রতিদিনই খালি হচ্ছে মায়েদের কোল। হামের উপসর্গ নিয়ে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে আজ শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে এই শিশুমৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ই মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে মোট ৬০৯ শিশু মারা গেছে। এর বাইরে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৯৩ শিশুর। ফলে হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত হাম—দুই মিলিয়ে এখন পর্যন্ত মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭০২।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে ৮৬৯ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর ফলে ১৫ই মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৫২২ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ১০৭ জনের শরীরে। ১৫ই মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে মোট ১১ হাজার ৫৪৯ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে।
হাসপাতালে ভর্তি ও সুস্থতার পরিসংখ্যান প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ই মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট ৮১ হাজার ২৮৩ জন রোগী। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ৭৭ হাজার ৬১৩ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে যে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তারা ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা।
ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মত প্রতিষ্ঠানগুলোর সতর্কতা উপেক্ষা করে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনা সরকারের গৃহীত স্বাস্থ্য খাতের ৫ বছর মেয়াদি অপারেশনাল প্ল্যান বা ওপি স্থগিত করার পর একের পর এক টিকা সংকটে জর্জরিত দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের অযোগ্যতা, অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা এবং হঠকারিতাকে দুষছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। দেশের স্বাস্থ্যখাতকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে’ চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে ‘ইউনূরজাহান’ গং- এমন কথা এখন প্রকাশ্যেই বলছেন সাধারণ মানুষ।
হামের টিকাদানের ৯ সপ্তাহেও তৈরি হয়নি অ্যান্টিবডি, টিকার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ
হামের টিকা গ্রহণের দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু টিকাদান শুরুর ৯ সপ্তাহ পরও সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। এই পরিস্থিতিতে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যবিদরা।
টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না তা যাচাইয়ের বারবার পরামর্শ দেওয়া হলেও সরকার তা আমলে নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
দেশব্যাপী হামের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ার পর গত ৫ই এপ্রিল উচ্চ সংক্রমিত উপজেলাগুলোতে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। প্রথম দফায় ১৮ জেলার ৩০ উপজেলা ও পৌরসভায় টিকা দেওয়া হয়। দুই সপ্তাহ পর ২০ এপ্রিল শুরু হয় দেশব্যাপী কার্যক্রম।
সরকার ছয় থেকে নয় মাস বয়সি ১ কোটি ৯০ লাখ পাঁচ হাজার ৯৫০ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ই মে শতভাগ কাভারেজ অর্জিত হয়। ২০শে মে পর্যন্ত চলা এই কার্যক্রমে মোট দুই কোটি ২৪ হাজার ১১৭ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬ শতাংশ বেশি। তবে এত বেশি কাভারেজের পরও সংক্রমণ কমেনি।
টিকার মান ও সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন
লক্ষ্যমাত্রার বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও সংক্রমণ ও মৃত্যু না কমায় টিকার কার্যকারিতা ও সংরক্ষণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, টিকার কার্যকারিতা নির্ভর করে শিশুর বয়স, পুষ্টি ও মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির ওপর। বয়স যত কম, টিকার কার্যকারিতা তত কম।
সরকারের ইপিআই ও আইসিডিডিআর,বিতে দীর্ঘদিন কাজ করা টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. মো. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, ‘টিকাদানের দুই মাস হয়ে গেল, এখনও উচ্চ সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। এই মুহূর্তে জরুরি হলো বয়সভিত্তিক ছয় থেকে নয় মাস, নয় মাসের পর থেকে দুই বছর এবং পাঁচ বছরের নিচের টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করে দেখা যে, আসলে হামের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না।’
‘একই সঙ্গে কিছু অ্যান্টিবডি তৈরি হলেও সেটি রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতার পর্যায়ে রয়েছে কি না, তা-ও দেখতে হবে। কিন্তু সরকার সে ব্যাপারে কোনো পরামর্শই কানে তুলছে না’, বলেন তিনি।
বয়সভেদে টিকার কার্যকারিতার হার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সাধারণত ছয় থেকে নয় মাসের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে টিকার কার্যকারিতার হার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ। নয় মাস থেকে দেড় বছরের মধ্যে ৮৫ শতাংশ এবং চার থেকে ছয় বছরের শিশুদের ক্ষেত্রে কার্যকারিতার সম্ভাবনা ৯৭ শতাংশ। কাজেই টিকার সঙ্গে বয়সের একটা বিরাট সম্পর্ক রয়েছে।’
কার্যকারিতা যাচাইয়ের দাবি
টিকার কার্যকারিতা যাচাইয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, ‘সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন ন্যাশনাল কন্ট্রোল ল্যাবরেটরিতে (এনসিএল) টিকা পরীক্ষা করা দরকার।’
তিনি বলেন, ‘পরিবহনে কোথাও কোল্ড চেইনে সমস্যা হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখতে আইইডিসিআরকে কাজে লাগানো যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে টিকার মান যাচাইয়ে পরীক্ষার কিট দিতে বলতে হবে। কিন্তু সরকার এগুলোতে গুরুত্ব দিচ্ছে না। ফলে এখনও শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে, আর আমরা চেয়ে চেয়ে দেখছি।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘এখনও প্রতিনিয়ত সংক্রমণ হচ্ছে। অথচ টিকাদানের ৯ সপ্তাহ হয়ে গেছে। কাজেই আদৌ শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না, তা দেখা দরকার।’
আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. আহমেদ নওশের আলম বলেন, ‘টিকার কাভারেজ শতভাগ হলেও হয়তো দেখা যাবে কোনো একটা জনগোষ্ঠী বাদ গেছে। সেখান থেকে ছড়াতে পারে। এখন টিকার কার্যকারিতা আদৌ রয়েছে কি না তা পরীক্ষা না করলে বোঝা যাবে না। বিষয়টি নিয়ে যেহেতু আলোচনা হচ্ছে, সেক্ষেত্রে ভেবে দেখা যেতে পারে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ডা. হালিমুর রশিদ বলেন, ‘বিষয়টি ভাবনায় আছে। কিন্তু এখনও কিছু করা যায়নি। সংক্রমণ কমে আসবে এটাই চিন্তা ছিল। যেহেতু তা হয়নি, তাই বিষয়টি নিয়ে মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলব।’