ঝিনাইদহে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও মেয়র জামায়াতে যোগদানের গুঞ্জন

প্রকাশিতঃ জুন ৩০, ২০২৬ | ৫:১০ পূর্বাহ্ণ
আসাদুর রহমান, হরিণাকুণ্ডু, ঝিনাইদহ থেকে

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছেন ঝিনাইদহ-২ (সদর-হরিণাকুণ্ডু) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নাসের শাহরিয়ার জাহেদী মহুল এবং তার ভাই ঝিনাইদহ সদর পৌরসভার সাবেক মেয়র কাইয়ুম শাহরিয়ার জাহেদী হিজল। এর মধ্যে মহুল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝিনাইদহ জেলা কমিটির সহ-সভাপতি ও হিজল ঝিনাইদহ পৌর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। সম্প্রতি প্রাথমিক সহযোগী সদস্য ফরম পূরণ করে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে দলটিতে যোগ দেন। সূত্র জানিয়েছে, ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধ, দেশের স্বার্থ এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাকি জীবন অতিবাহিত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন নাসের শাহরিয়ার জাহেদী মহুল ও কাইয়ুম শাহরিয়ার জাহেদী হিজল। পাশাপাশি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিয়ম-নীতি, আদর্শ, দলীয় শৃঙ্খলা ও আনুগত্যের প্রতি অনুগত থাকার অঙ্গীকার করেছেন। ঝিনাইদহ জেলা জামায়াতের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। জামায়াত নেতারা জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝিনাইদহ জেলায় জামায়াত মনোনীত প্রার্থীদের বিজয়ী করতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছেন নাসের শাহরিয়ার জাহেদী মহুল ও কাইয়ুম শাহরিয়ার জাহেদী হিজল। বিশেষ করে ঝিনাইদহ-২ ও ঝিনাইদহ-৪ আসনে দাঁড়িপাল্লার প্রতীকের প্রার্থীদের জয়ী করতে অনুগত কর্মী-সমর্থকদের ভোটের মাঠে নামিয়েছিলেন তারা। আওয়ামী লীগের একাংশের ভোট পেয়ে জামায়াত প্রার্থীরা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মধ্যে জয়ী হন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনে সংসদ সদস্য পদ হারান আওয়ামী লীগ নেতা নাসের শাহরিয়ার জাহেদী মহুল। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলার বহু অভিযোগ রয়েছে মহুলের বিরুদ্ধে। একইভাবে তার ভাই কাইয়ুম শাহরিয়ার জাহেদী হিজলও পৌর মেয়রের পদ হারান। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নাসের শাহরিয়ার জাহেদী মহুলের এমপি হওয়ার স্বপ্ন ছিল দীর্ঘদিনের। ২০০৭ সালের নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আম মার্কায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই নির্বাচন না হওয়ায় সে সময় স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায় তার। সেই স্বপ্ন পূরণের পথ খোলো দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। বিএনপি-জামায়াতসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল নির্বাচন বয়কট করলে আওয়ামী লীগ সব আসনে ডামি প্রার্থী দেয়। নৌকার বিরুদ্ধে দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থী ঠিক করে দেয় আওয়ামী লীগ। ঝিনাইদহ-২ আসনে আওয়ামী লীগের ডামি প্রার্থী হন মহুল। শেখ হাসিনার ইশারায় তাকে বিজয়ী করা হয়। আওয়ামী লীগের প্রভাব ও পেশীশক্তি খাটিয়ে মহুলের ছোটভাই কাইয়ুম শাহরিয়ার জাহেদী হিজল ঝিনাইদহ পৌরসভার মেয়র পদ দখলে নেন। নির্বাচিত হওয়ার পর পৌরভবনে বসে মদপান করে আলোচনায় আসেন হিজল। পৌরসভার বেশিরভাগ ঠিকাদারি কাজ করাতেন নিজের বাড়ির কাজের লোকদের দিয়ে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই ঝিনাইদহ সদর উপজেলা পাগলাকানাই ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা যুবদলের সদস্য লিটন মন্ডলকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হাতের কব্জি বিচ্ছিন্ন করে দেয় মহুলের পালিত সন্ত্রাসীরা। এছাড়া একটি হাত ও পা কেটে ঝুলন্ত অবস্থায় ফেলে পালিয়ে যায় তারা। পাগলাকানাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান চিহ্নিত অস্ত্রধারী আবু সাইদ বিশ্বাস ও রাজন কসাইয়ের নেতৃত্বে যারা হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করে তারা সবাই মহুলের অনুসারী। গত বছরের ১৬ জুলাই ঝিনাইদহে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয়। শহরের উজির আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে এই হামলায় অনেকে আহত হন। তৎকালীন সংসদ সদস্য নাসের শাহরিয়ার জাহেদী মহুলের নির্দেশে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সজিব হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আল ইমরান হামলায় নেতৃত্ব দেন। ঝিনাইদহে কোটা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীরা জানান, মহুল জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও স্বৈরাচার সরকারের একতরফা নির্বাচনের এমপি। তিনি ও তার ভাই হিজল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন বানচাল করার অর্থ জোগান ও মদদদাতা ছিলেন। আন্দোলন চলাকালে মহুল ও তার ভাই ছাত্রদের ওপর নির্যাতন চালানোর সবধরনের ব্যবস্থা করেন। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মহুল। ঝিনাইদহ জেলা ছাত্র অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নিহান হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা দেখেছি এই মহুল অর্থ দিয়ে ছাত্রলীগকে বিভিন্নভাবে নির্দেশনা দিয়েছিল আন্দোলন দমাতে। মহুলের ভাই হিজলের নেতৃত্বে পৌরসভা ভবন থেকে লাঠিসোটা বের করে ছাত্র-জনতাকে আঘাত করে রক্ত ঝরানো হয়েছে। পঙ্গু করা হয়েছে। এই মহুল হিজল যদি এই ঝিনাইদহের রাজপথে আসার চেষ্টা করে দাঁতভাঙা জবাব দেবে ছাত্র-জনতা।’ ছাত্র আন্দোলন ঝিনাইদহের সভাপতি নাইমুল ইসলাম বলেন, ‘টাকার বিনিময়ে ঝিনাইদহে যারা আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করবেন তাদের আস্তানাও এই ঝিনাইদহে রাখা হবে না।’ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা আহ্বায়ক আবু হুরায়রা সাংবাদিকদের বলেন, ‘২০২৪-এর পাতানো নির্বাচনে অংশ নিয়ে এমপি হওয়া নাসের শাহরিয়ার জাহেদী মহুল হাসিনার দোসর। তিনি ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সহ-সভাপতি। তার ভাই হিজল পৌর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। আমরা অবাক হই, লজ্জিত হই, মানুষকে বোকা বানিয়ে কীভাবে তারা এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছে।’ এ বিষয়ে ঝিনাইদহ-২ আসনের সাবেক এমপি মো. নাসের শাহরিয়ার জাহেদী মহুল বলেন, আমি কোনো রাজনৈতিক দলেই সক্রিয় নই। জামায়াতে ইসলামীর প্রাথমিক সদস্য ফরম পূরণ বা যোগদানের কোনো ঘটনা ঘটেনি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলাম। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী বা স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা কিংবা সন্ত্রাসী লালন-পালনের যে অভিযোগ বিদ্বেষমূলক। আমার ছোট ভাই কাইয়ুম শাহরিয়ার জাহেদী হিজল স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে হারিয়ে পৌর মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন।