বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটে ৬৩টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কোনও কর বাড়ানো হয়নি; বরং যেখানে ৫ শতাংশ কর ছিল, সেখানে তা কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করা হয়েছে। তবে এই কর কমানোর প্রভাব বাজারে তেমন একটা পড়েনি।
যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন শুল্ক-ছাড়ে আমদানি করা পণ্য বাজারে আসার পরই এর প্রকৃত প্রভাব বোঝা যাবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাজেটে আমদানি করা সব ধরনের মসলা ও খেজুরের ওপর থেকে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে এই নীতিগত ছাড়ের সুফল এখনও রাজধানীর খুচরা বাজারে পুরোপুরি পৌঁছায়নি।
বাজারে ব্যবসায়ীদের বক্তব্যেও রয়েছে ভিন্নতা। কেউ বলছেন, কিছু মসলার দাম কমেছে। আবার কেউ বলছেন, দাম আগের মতোই রয়েছে, এমনকি কিছু মসলার দাম বেড়েছে। অন্যদিকে খেজুরের দাম এখনও অপরিবর্তিত।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন। বাজারে গেলে দেখা যায় স্বল্প আয়ের মানুষের হাহাকার। পণ্য নেড়েচেড়ে রেখে দিচ্ছেন, দামের কারণে কিনতে পারছেন না নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রেতারা। তাদের কণ্ঠে অসন্তোষের সুর।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজেটে অনেক পণ্যের দাম কমার কথা থাকলেও এখনও সব পণ্যের দামে তার প্রভাব পড়েনি। তাদের ধারণা, ধীরে ধীরে এর প্রভাব দেখা যেতে পারে।
তবে নতুন শুল্ক-ছাড়ে আমদানি করা পণ্য পাইকারি আড়ত থেকে খুচরা বাজারে পুরোপুরি না আসা পর্যন্ত বাজারে উচ্চমূল্যের প্রবণতা বজায় থাকতে পারে।
পুরান ঢাকার আল্লাহর দান মসলা বিতানের মালিক হাজি আবু বক্কর বলেন, “বাজেটের পর বাজারে একেক পণ্যের দাম একেক রকম। এলাচ ও জিরার দাম কিছুটা কমেছে। এতে ক্রেতারা এই দুটি পণ্য কিনতে আগের চেয়ে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। কিন্তু শুধু এই দুটির দাম কমলেই তো হবে না। দারুচিনি, লবঙ্গ, জয়ত্রী, পোস্তদানা, কাজুবাদাম ও কাঠবাদামসহ বেশির ভাগ মসলার দাম উল্টো বেড়ে গেছে।”
তিনি বলেন, “অনেক ক্রেতাই মনে করেন, এলাচ-জিরার দাম কমেছে মানেই সব মসলার দাম কমেছে। কিন্তু অন্য মসলার দাম শুনে তারা হতাশ হন। পাইকারি বাজারে দাম বেশি থাকায় আমাদেরও বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। ফলে বাজারে সার্বিকভাবে কোনও স্বস্তি নেই, বিক্রিও আগের তুলনায় কমে গেছে। পাইকারি বাজারে দাম না কমলে বাজেটের প্রভাবও বাজারে তেমন দেখা যাবে না।”
বিপাশা স্টোরের স্বত্বাধিকারী ফয়জুল করিম বলেন, “মসলার কিছু পণ্যের দাম ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। আগে যে দাম অনেক বেড়ে গিয়েছিল, এখন তা কিছুটা কমছে। তবে বাজার এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি, সরবরাহও আগের তুলনায় কিছুটা কম। বাজার স্থিতিশীল হলে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক হলে ক্রেতাদের কেনাকাটাও বাড়বে। বাজেটের প্রভাবে বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিললেও পুরোপুরি স্বস্তি ফিরতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।”
খেজুর বিক্রেতা আমান আলী বলেন, “এখনও বাজেটের প্রভাব খেজুরের বাজারে তেমন পড়েনি। নতুন চালানের পণ্য বাজারে আসার পর দাম কিছুটা কমতে পারে। বর্তমানে যে দামে খেজুর বিক্রি হচ্ছে, সেটিই রাখতে হচ্ছে। নতুন মাল এলে তখন বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী দামে পরিবর্তন আসতে পারে।”
বাদামতলীর খেজুর বিক্রেতা মো. ইদ্রিস বলেন, “সরকার শুল্ক-কর কমানোর ঘোষণা দিলেও এখনও এর প্রভাব খেজুরের বাজারে পড়েনি। কারণ বর্তমানে খেজুর আমদানির মৌসুম নয়। সাধারণত অক্টোবরের শেষ দিক থেকে নভেম্বর মাসে নতুন চালান আসতে শুরু করে। এখন বাজারে যে খেজুর বিক্রি হচ্ছে, সেগুলো আগের শুল্ক-কর পরিশোধ করেই আমদানি করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “নতুন চালান আসার পর সরকার ঘোষিত কর-ছাড়ের কিছুটা প্রভাব দামে পড়তে পারে। তবে বর্তমানে বাজারে পুরোনো মজুত পণ্য থাকায় দাম কমার সুযোগ নেই। আগেও হঠাৎ কর কমানোর কারণে ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়েছিলেন। তাই নতুন আমদানি না হওয়া পর্যন্ত বাজারে বড় ধরনের কোনও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।”
পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের বিক্রেতা আবুল হাশেম বলেন, “বর্তমানে প্রতিকেজি পেঁয়াজ ৪০ টাকায় বিক্রি করছি। পেঁয়াজের পাশাপাশি রসুন, আদা ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও মূলত বাজারে সরবরাহ ও আমদানির ওপর নির্ভর করে। বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য এলে দাম কমে, আর সরবরাহ কমে গেলে দাম বেড়ে যায়। এবার পেঁয়াজের ফলন ভালো হওয়ায় দাম আগের তুলনায় অনেক কমেছে। তবে রসুন, আদা ও কিছু আমদানিনির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে সরবরাহ ও আমদানির পরিস্থিতি অনুযায়ী দামের ওঠানামা হচ্ছে। বাজেটের চেয়ে বাজারে পণ্যের সরবরাহই দামের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে।”
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের এলডি হলে অনুষ্ঠিত বাজেট পরবর্তী সংসদ সম্মেলনে চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, “সরকার চায়—যেসব ক্ষেত্রে কর কমানো হয়েছে, সেসব পণ্যের দামও কমুক। এই বিষয়ে সরকার আন্তরিক। ৬৩টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কোনও কর বাড়ানো হয়নি; বরং যেখানে ৫ শতাংশ কর ছিল, সেখানে তা কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দাম কমা উচিত।”
তিনি বলেন, “এই বাজেট মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় সব খাতকেই স্পর্শ করেছে। সে কারণেই প্রধানমন্ত্রী এটিকে ‘জীবনবান্ধব বাজেট’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট একটি বাস্তব অর্থেই জীবনবান্ধব বাজেট।”