জিম্বাবুয়ের স্কোরবোর্ডে রান তখন ৮ উইকেটে ৭০। উইকেটে আগুন ঝরাচ্ছেন নাহিদ রানা। হারারে স্পোর্টস ক্লাবের সবুজ ঘাসঘেরা উইকেটে তখন স্রেফ সময়ের ব্যাপার মনে হচ্ছিল স্বাগতিকদের অলআউট হওয়া। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো, জিম্বাবুয়ে থামল ১৪১ রানে। ওয়ানডে ইতিহাসে বাংলাদেশের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড গড়ে ২১ রানে ৬ উইকেট নিলেন নাহিদ।
মধ্যাহ্নবিরতির সময় বাংলাদেশ শিবিরে ছিল চনমনে আড্ডার মেজাজ। অথচ সেই ম্যাচই যে কয়েক ঘণ্টা পর পরিণত হবে এক দুঃস্বপ্নে, তা কে ভেবেছিল! অবিশ্বাস্য ব্যাটিং ব্যর্থতার এক মহড়া মঞ্চস্থ করে বাংলাদেশ ম্যাচটি হেরে গেল ২৫ রানে। লক্ষ্য মাত্র ১৪২ রানের, কিন্তু মেহেদী হাসান মিরাজের দল অলআউট হয়ে গেল ১১৬ রানেই!
অথচ জিম্বাবুয়ের পুঁজিটা দেড়শও ছোঁয়নি। কিন্তু ব্যাটসম্যানদের একে একে উইকেট বিলিয়ে দেওয়ার আত্মঘাতী প্রতিযোগিতায় সেই মামুলি লক্ষ্যটাই পাহাড়সম হয়ে দাঁড়াল। তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতেই এমন হারে ব্যাকফুটে চলে গেল বাংলাদেশ।
সবুজ উইকেটের বাড়তি বাউন্স সামলাতে গিয়ে শুরুতেই দিক হারায় বাংলাদেশের টপ অর্ডার। ব্লেসিং মুজারাবানির বলে তানজিদ হাসান ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত সাজঘরে ফেরেন দ্রুতই। পাওয়ার প্লে শেষ হওয়ার আগেই রিচার্ড এনগারাভাকে আপার কাট করতে গিয়ে আত্মঘাতী শটে উইকেট উপহার দেন সৌম্য সরকারও (৬)।
চতুর্থ উইকেটে তাওহিদ হৃদয় ও নুরুল হাসান সোহান প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু রান তোলার গতি ছিল ভীষণ শ্লথ। এক সময় ৪১ বলে মাত্র ১০ রান করা হৃদয় ধৈর্য হারিয়ে উইকেট বিলিয়ে আসেন ২০ বছর বয়সী তরুণ নিউম্যান নিয়ামুরির বলে। এরপর মোসাদ্দেক হোসেন ও অধিনায়ক মিরাজও দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হন। এক প্রান্ত আগলে রাখা সোহান ৩১ রানে আউট হন আম্পায়ারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে। এই সিরিজে ডিআরএস না থাকায় আম্পায়ারের আঙুল তোলার পর মাঠ ছাড়া ছাড়া কোনো পথ ছিল না তাঁর।
জিম্বাবুয়ের চার পেসার মিরাজদের ইনিংস গুটিয়ে দিতে সময় নেননি। শেষ পর্যন্ত ৩৩.১ ওভারেই শেষ হয় বাংলাদেশের লড়াই। অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে ম্যাচের সেরা হয়েছেন জিম্বাবুয়ের নিয়ামুরি—৯ নম্বরে নেমে সর্বোচ্চ ৩৩ রান করার পর বল হাতে নিয়েছেন ২ উইকেট। এছাড়া অধিনায়ক এনগারাভা নেন ৩টি উইকেট।
এর আগে ম্যাচের প্রথম ভাগটা শুধুই নিজের করে নিয়েছিলেন নাহিদ রানা। টস জিতে বোলিংয়ে নেমে জিম্বাবুয়ের ব্যাটিং লাইনে রীতিমতো ত্রাস সৃষ্টি করেন এই গতি তারকা। সিকান্দার রাজা, ওয়েসলি মাধেভেরে ও ক্লাইভ মাডান্ডেকে দ্রুত ফিরিয়ে স্বাগতিকদের ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেন তিনি। মাত্র ১৪ ম্যাচের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এটি তাঁর তৃতীয় পাঁচ উইকেট।
তবে সেই ধ্বংসস্তূপেই প্রতিরোধ গড়ে তোলেন জিম্বাবুয়ের দুই লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যান নিয়ামুরি ও এনগারাভা। নবম উইকেটে তাঁদের গড়া ৬৩ রানের জুটিটাই মূলত ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয়। পরে দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে ২৭ রান করা এনগারাভাকে বোল্ড করে নিজের ষষ্ঠ উইকেট তুলে নেন নাহিদ। ২১ রানে ৬ উইকেট—ওয়ানডেতে বাংলাদেশের কোনো বোলারের এটিই সেরা বোলিংয়ের কীর্তি।
নাহিদের দিনে এমন বোলিংয়ের পর হারের এই ক্ষত সহজে ভোলার নয়। সিরিজ বাঁচাতে আগামী বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ঘুরে দাঁড়ানোর বিকল্প নেই বাংলাদেশের সামনে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
জিম্বাবুয়ে: ৩৬.৪ ওভারে ১৪১ (নিয়ামুরি ৩৩, এনগারাভা ২৭, কাইয়া ২৬; নাহিদ ১০-২-২১-৬, তাসকিন ৭-১-৩২-২, মিরাজ ৫.৪-০-২২-১)
বাংলাদেশ: ৩৩.১ ওভারে ১১৬ (সোহান ৩১, হৃদয় ২৫, মিরাজ ১০; এনগারাভা ৭.১-১-৩১-৩, ইভান্স ১০-২-৩৪-৩, মুজারাবানি ১০-১-২৪-২, নিয়ামুরি ৬-২-২২-২)
ফল: জিম্বাবুয়ে ২৫ রানে জয়ী। ম্যান অব দা ম্যাচ: নিউম্যান নিয়ামুরি।