ভারত থেকে ২০০ রেলকোচ ক্রয়: শেখ হাসিনা সরকারের করা চুক্তি বাতিল নয়, বাস্তবায়ন করছে বিএনপি, এ মাসেই আসছে ২০টি কোচ

প্রকাশিতঃ জুলাই ৭, ২০২৬ | ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার, বিরোধীদল এবং সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মী ও সমর্থকদের প্রতিনিয়ত ভারত বিদ্বেষ, বিরোধিতা এবং ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর নানাবিধ বক্তব্যের মাঝেও ভারত থেকে পণ্য আমদানি কমেনি, বরং আগের চেয়ে বহুলাংশে বেড়েছে। ভারতের সাথে শেখ হাসিনা সরকারের চুক্তি নিয়ে বিএনপি-জামায়াতসহ সংশ্লিষ্টরা দীর্ঘদিন ধরে অপপ্রচার চালিয়ে আসছিল। এসব চুক্তিকে কখনো ‘দেশের স্বার্থবিরোধী’, কখনো ‘গোলামির চুক্তি’ আবার কখনো ‘দিল্লিকে খুশি করার চুক্তি’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪-এর ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এসব চুক্তি বাতিলের দাবি করা হয়। কিন্তু ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের ব্যাপক পর্যালোচনার পরেও এসব চুক্তিতে ‘দেশের স্বার্থবিরোধী’ কোনো উপাদানের সন্ধান মেলেনি। উপরন্তু সরকার-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি পক্ষের দাবি, এসব চুক্তি বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলক লাভজনক। ফলে চুক্তি বাতিলের কোনো ঘটনা ঘটেনি। শেখ হাসিনার সরকারের সময় আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ভারতীয় রেল সংস্থা বাংলাদেশে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ বিক্রির কার্যাদেশ পায়। এই চুক্তিটি নিয়েও ব্যাপক অপপ্রচারের শিকার হয়েছিল শেখ হাসিনার সরকার। কিন্তু চুক্তিটি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় আবারও ভারত থেকে রেল কোচ আমদানি করছে বাংলাদেশ। এ নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা কেটেছে। প্রথম দফায় শিগ্গিরই যাত্রীবাহী কোচ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি। সবকিছু ঠিক থাকলে জুলাইয়ে কোচ হস্তান্তর কার্যক্রম শুরু হবে। গত ৯ই এপ্রিল জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্য মো. ইলিয়াস মোল্লার এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম নিশ্চিত করেন, ভারত থেকে আমদানি করা ২০০টি ব্রডগেজ কোচ শিগগিরই বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে যুক্ত হবে। মন্ত্রী জানান, ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (ইআইবি) অর্থায়নে ভারত থেকে ২০০টি ব্রডগেজ কোচ সরবরাহের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ধাপে ধাপে এসব কোচ বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে যুক্ত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির রেল মন্ত্রণালয়ের সংস্থা রাইটসের মাধ্যমে প্রায় ৯১৫ কোটি টাকার চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সরবরাহ করা হবে। প্রথম চালানে বাংলাদেশে যাবে ২০টি কোচ। এর আগে ভারত বাংলাদেশকে ১২০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ, ৩৬টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ এবং ১০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সরবরাহ করেছিল। নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের রেল সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভারতী রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, কোচগুলো পাঞ্জাবের কাপুরথলা রেল কোচ কারখানায় তৈরি হচ্ছে। ইতোমধ্যে হস্তান্তরের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। প্রথম চালান পাঠানোর পর ধাপে ধাপে বাকি কোচগুলো সরবরাহ পাবে বাংলাদেশ। বৈদেশিক বাণিজ্য সংশ্লিষ্টদের মতে, এ চালান শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রকল্প নয়, বরং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলমান অবকাঠামোগত সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিশেষ করে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এটিই হতে যাচ্ছে ভারতের পক্ষ থেকে প্রথম বড় সরবরাহ। জানা যায়, ২০২৪ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে সকল শর্ত পূরণের পর রাইটস এ প্রকল্পের কাজ পায়। প্রকল্পটির অর্থায়ন করছে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক। তবে বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল এবং বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লেগেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় গতি বেড়েছে সরবরাহ কার্যক্রমে। নতুন চুক্তির আওতায় শুধু কোচ সরবরাহ নয়, নকশা সহায়তা, খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ, রেলকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং কমিশনিং সেবাও দেওয়া হবে। প্রকল্পে ৩৬ মাসব্যাপী সরবরাহ ও কমিশনিং কার্যক্রম থাকবে। এর পরবর্তী ২৪ মাস ওয়ারেন্টি সুবিধাও দেওয়া হবে। ভারতের রেল খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রাইটস বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নিজেদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। রেলের লোকোপাইলট সীমান্ত হাজরা বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে এটি কেবল কোচ বিক্রির চুক্তি নয়, বরং দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত সহযোগিতার একটি অংশ। রেল যন্ত্রাংশ বিশেষজ্ঞ দেবাশিস দে বলেন, আগেও ভারতের কোচ ও ইঞ্জিন বাংলাদেশের রেলব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে। নতুন চালান সেই ধারাবাহিকতাকেই আরও এগিয়ে নেবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের রেল যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রক্রিয়াও গতিশীল হবে।