বছরে ৫ হাজার কোটি টাকার গ্যাস চুরি

প্রকাশিতঃ জুলাই ৭, ২০২৬ | ৫:০৭ অপরাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

দেশে তীব্র গ্যাস সংকটে ভুগছেন গ্রাহকরা। রাজধানীর অনেক এলাকায় দিনে দুই বেলাও ঠিকমতো চুলা জ্বলছে না। পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন কমছে। এই পরিস্থিতিতে অবৈধ সংযোগ, চুরি, লিকেজ ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতায় বছরে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার গ্যাসের অপচয় হচ্ছে। অনুমোদিত সিস্টেম লস বাদ দিলে বছরে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা, যার পুরোটাই চুরি। সিস্টেম লস কমাতে সরকার বিশেষ ‘১৮০ দিনের পরিকল্পনা’ নেওয়ার পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বরং লোকসান কমানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জ্বালানি বিভাগ। সম্প্রতি, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অধীন পেট্রোবাংলার গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর সিস্টেম লস নিয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভার কার্যবিবরণীতে এই চিত্র উঠে এসেছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সিস্টেম লসের বড় অংশই অনুমোদিত কারিগরি ক্ষতির বাইরে, যা মূলত অবৈধ সংযোগ ও গ্যাস চুরির কারণে হচ্ছে। একদিকে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে এলএনজি আমদানি করছে, অন্যদিকে বছরে হাজারো কোটি টাকার গ্যাস চুরি হচ্ছে। গ্যাস চুরি বন্ধ করা গেলে ঘাটতির একটা বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব হতো এবং ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমত। দৈনিক ক্ষতি ১৮ কোটি টাকা বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের সরকার নির্ধারিত গড় বিক্রয়মূল্য প্রায় ৭০০ টাকা। জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট সিস্টেম লস ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এই হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ২৫ কোটি ৩৩ লাখ ঘনফুট গ্যাস হিসাবের বাইরে চলে যাচ্ছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৮ কোটি টাকা। বছর হিসাবে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ছয় হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। এদিকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গ্যাস বিতরণে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ পর্যন্ত সিস্টেম লস অনুমোদন করে। অর্থাৎ বর্তমান ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ সিস্টেমলসের মধ্যে অনুমোদিত ২ শতাংশ বাদ দিলে অবশিষ্ট ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ মূলত চুরি। এই হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চুরি হচ্ছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, বছরে ক্ষতির পরিমাণ পাঁচ হাজার ১১০ কোটি টাকার। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণে কারিগরি ত্রুটি সর্বোচ্চ ২ শতাংশ হতে পারে। এর বাইরে ৬-৭ শতাংশের বেশি যে ক্ষতি (সিস্টেম লস) হচ্ছে, তার পুরোটাই চুরি। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ তিতাস ও বাখরাবাদ গত ৩০ এপ্রিল জ্বালানি বিভাগে অনুষ্ঠিত এক সভায় জানানো হয়, সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী সিস্টেম লস কমানোর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, বর্তমান অগ্রগতিতে তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। সভায় উপস্থিত জ্বালানি বিভাগের অপারেশন শাখার একজন যুগ্ম সচিব বলেন, সরকারের লক্ষ্য সিস্টেম লস ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা। কিন্তু বর্তমানে তা ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশে আটকে আছে। সভায় আরও জানানো হয়, একমাত্র গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি (জিটিসিএল) নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে। কিন্তু তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি নির্ধারিত ৫ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন তো দূরের কথা, উল্টো তাদের সিস্টেম লস আরও বেড়েছে। একই ধরনের পরিস্থিতি বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতেও দেখা গেছে। পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে সভায় বলা হয়, ওয়াশিং ফ্যাক্টরি ও চুন কারখানাগুলোতে অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। শুধু সাময়িক অভিযান চালালেই হবে না, অবৈধ গ্রাহকদের স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করা না গেলে সিস্টেম লস কমানো অসম্ভব। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি তিতাসে পেট্রোবাংলার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি গ্যাস বিতরণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সিস্টেম লস তিতাসে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির সিস্টেম লস ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এ বিষয়ে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শাহনেওয়াজ পারভেজ জানান, বড় শিল্প গ্রাহকদের অংশে সিস্টেম লস তুলনামূলক কম। তবে অবৈধ সংযোগ, পাইপলাইনের লিকেজ এবং আবাসিক খাতের কারণে ক্ষতি বাড়ছে। তিনি বলেন, নিয়মিত অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ কার্যক্রম চলছে। প্রতি বছর লাখ লাখ সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং শত শত কিলোমিটার অবৈধ লাইন তুলে ফেলা হচ্ছে। এরপরও অনেক অবৈধ সংযোগ পুনরায় চালু হয়ে যাচ্ছে। সূত্র বলছে, অভিযান চালিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবার সেই সংযোগ চালু হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, তিতাসের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এই অবৈধ চক্রের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। পুরোনো পাইপলাইন বড় সমস্যা অবৈধ সংযোগের পাশাপাশি পুরোনো পাইপলাইনের লিকেজও সিস্টেম লস বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় চার হাজার ৭০ কিলোমিটার পাইপলাইনে জরিপ চালিয়ে তিতাস ৯ হাজার ৩৮৪টি লিকেজ শনাক্ত করে। বিপরীতে একই সময়ে জালালাবাদ গ্যাসে ১১৮টি, কর্ণফুলীতে ১১টি, বাখরাবাদে তিনটি এবং জিটিসিএলের সঞ্চালন লাইনে মাত্র দুটি লিকেজ পাওয়া যায়। ব্যর্থ হলে পদোন্নতি বন্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি বিভাগ কয়েকটি কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সম্পৃক্ত করে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি দেওয়া হবে। এ ছাড়া অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের ক্ষতি প্রচারে জনসচেতনতামূলক টেলিভিশন প্রচারচিত্র (টিভিসি) তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জোনভিত্তিক কর্মকর্তাদের জন্য ‘রিওয়ার্ড অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ (পুরস্কার ও শাস্তি) ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যারা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করবেন, তারা পুরস্কৃত হবেন। যারা ব্যর্থ হবেন, তাদের পদোন্নতি বন্ধ, বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) স্থগিতসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রশাসনিক ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাড়ছে এলএনজি খাতের ভর্তুকি ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও ছয় হাজার কোটি টাকা এলএনজিতে ভর্তুকি রাখা হলেও তা বেড়ে হয় আট হাজার ৯০০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ছয় হাজার কোটি টাকা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সরকারকে বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এতে চলতি বছরের শুরুতে ভর্তুকি বেড়ে হয়েছে ১৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।