ফ্রান্স, প্যারিস: ফ্রান্সভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ) আজ একটি নতুন মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে ব্যাপক শ্রম অধিকার লঙ্ঘন ও ক্রমাবনতিশীল মানবাধিকার পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
“থ্রেডস আন্ডার প্রেশার: দ্য রেডি-মেড গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স রাইটস ক্রাইসিস ইন বাংলাদেশ ২০২৬” শিরোনামের এই প্রতিবেদনটি গবেষণা করেছেন জেএমবিএফ-এর সহকারী মহাসচিব জান্নাতুল ফেরদৌস এবং সম্পাদনা করেছেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহনূর ইসলাম।
প্রতিবেদনটি নথিভুক্ত ঘটনা, নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যম প্রতিবেদন, সরকারি তথ্য এবং প্রকাশ্যে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বেতন পরিশোধে বিলম্ব ও বকেয়া মজুরি, ব্যাপক ছাঁটাই, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, শান্তিপূর্ণ শ্রমিক আন্দোলন দমন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ও স্যানিটেশন সুবিধা এবং শ্রম আইনের দুর্বল প্রয়োগের ধারাবাহিক নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের মধ্যে রয়েছে—২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে ৮০টি পোশাক কারখানা থেকে প্রায় ২০ হাজার ৭৮৩ জন শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে ৪৫৭টি পোশাক ও বস্ত্র কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে দুই লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই কারখানাগুলোর মধ্যে ২০৫টি পর্যাপ্ত কার্যাদেশের অভাবে, ১৯০টি আর্থিক দেউলিয়াত্বের কারণে এবং ১১টি শ্রম অসন্তোষের জেরে বন্ধ হয়েছে। বাকি ৫১টি কারখানা বন্ধের পেছনে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংকিং জটিলতা, জ্বালানি সংকট, কাঁচামালের ঘাটতি এবং কারখানা স্থানান্তরের মতো নানা কারণ কাজ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে মজুরি পরিশোধে বিলম্ব, ওভারটাইমের পাওনা না দেওয়া, উৎসব বোনাস আটকে রাখা, খেয়ালখুশিমতো চাকরিচ্যুতি এবং ক্রমাবনতিশীল কর্মপরিবেশের বিষয়টি বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার শ্রমিক ও তাদের পরিবার তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ছে।
বকেয়া মজুরি ও উন্নত কর্মপরিবেশের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনরত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শন, ফৌজদারি মামলা এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের একাধিক ঘটনাও প্রতিবেদনে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, শব্দ গ্রেনেড, রাবার বুলেটসহ বিভিন্ন দাঙ্গা-দমন কৌশল প্রয়োগ করেছে। এসব ঘটনা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংগঠন করার অধিকার সংরক্ষণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতা পালনের ক্ষেত্রে গুরুতর প্রশ্ন তুলে ধরে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুতর ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। এতে শ্রমিকদের মধ্যে বারবার গণঅসুস্থতার ঘটনা এবং অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন, নিরাপদ পানির সীমিত সুযোগ, দুর্বল বায়ু চলাচল ব্যবস্থা, অতিরিক্ত তাপ, ঠাসাঠাসি উৎপাদন তল, ক্ষতিকর পদার্থের দীর্ঘস্থায়ী সংস্পর্শ এবং কর্মক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবার মতো বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী এসব সমস্যা নারী শ্রমিকদের ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রভাব ফেলছে, যারা বাংলাদেশের পোশাক খাতের শ্রমশক্তির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ।
জেএমবিএফ-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহনূর ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ রপ্তানিকারক খাতে পরিণত হলেও লাখ লাখ শ্রমিক এখনো বকেয়া মজুরি, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ ও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছেন।
তিনি মন্তব্য করেন, শ্রমিকদের মর্যাদা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও স্বীকৃত শ্রম অধিকারের মূল্যে অর্জিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই বলা যায় না, এবং ন্যায্য পাওনা মজুরি বা নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আওয়াজ তোলার জন্য কোনো শ্রমিকের সহিংসতা, ভয়ভীতি বা গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হওয়া উচিত নয়।
জেএমবিএফ-এর প্রধান উপদেষ্টা রবার্ট সাইমন বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, জাতিসংঘ, উন্নয়ন সহযোগী, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্বব্যাপী পোশাক ব্র্যান্ডসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত অর্থবহ শ্রম সংস্কারের প্রচেষ্টা জোরদার করা, যাতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি শ্রমিক অধিকার, কর্পোরেট জবাবদিহিতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
তিনি বলেন, শ্রম শোষণ বা দায়মুক্তির ওপর ভিত্তি করে টেকসই সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি বহন করে এবং প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক এই খাতে নিয়োজিত, যাদের অধিকাংশই নারী। এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অবদান সত্ত্বেও, প্রতিবেদনে উপসংহার টানা হয়েছে যে, বাংলাদেশের সংবিধান, জাতীয় শ্রম আইন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধীনে নিশ্চিত করা অধিকার ভোগ করতে গিয়ে অসংখ্য শ্রমিক এখনো উল্লেখযোগ্য বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সরকার, পোশাক শিল্প মালিক পক্ষ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা ও শ্রম আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একাধিক সুপারিশও পেশ করা হয়েছে।