বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের ঝুঁকি নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামী পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ বাবদ প্রায় ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হবে, যা স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে পরিশোধ করা মোট অর্থের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। একই সময়ে সহজ শর্তের (কনসেশনাল) ঋণের সুযোগ কমে যাচ্ছে, বাড়ছে বাজারভিত্তিক ভাসমান সুদের (ফ্লোটিং রেট) ঋণের ওপর নির্ভরতা।
এমন বাস্তবতায় বৈদেশিক ঋণের ঝুঁকি মূল্যায়নে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সঙ্গে বৈঠক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধি দল।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের ব্যয়, ঋণের গড় সুদ, ফ্লোটিং-রেট ঋণের পরিমাণ, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চায় আইএমএফ।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা জানান, আইএমএফকে জানানো হয়েছে—বাংলাদেশ এখন বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় তুলনামূলক কম ঝুঁকির অবস্থান থেকে মধ্যম ঝুঁকির পর্যায়ে প্রবেশ করছে। এর প্রধান কারণ হলো সহজ শর্তে ঋণের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারসংশ্লিষ্ট সুদের হারে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আগে যেসব উন্নয়ন সহযোগী দীর্ঘমেয়াদি ও কম সুদের ঋণ দিত, তাদের অনেকেই এখন তুলনামূলক কঠোর শর্তে অর্থায়ন করছে। জাপানের মতো দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতাদের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণেও বাজারভিত্তিক সুদের অংশ বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক সুদের হার বাড়লে বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধ ব্যয়ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যাবে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বৈদেশিক ঋণ পোর্টফোলিওর প্রায় ৩০ শতাংশই ছিল ফ্লোটিং-রেট ঋণ। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে এই হার আরও বেড়েছে বলে কর্মকর্তাদের ধারণা।
বৈঠকে আইএমএফ জানতে চায়, প্রতিশ্রুত বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় কেন ধারাবাহিকভাবে কমছে। ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আগের সরকারের নেওয়া অনেক প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকল্প অনুমোদনেও সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি কমে যাওয়ায় ঋণের অর্থছাড়ও কমেছে।
ইআরডির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাইপলাইনে অর্থছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে ৪১ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে অর্থছাড় হয়েছে ৪ দশমিক ৫৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ কম। পুরো ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও অর্থছাড় কমে ৯ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১০ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার।
আইএমএফের প্রতিনিধি দল বাজেট সহায়তা কমে যাওয়ার বিষয়েও ব্যাখ্যা চায়। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা পেলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে। চলতি অর্থবছরে এ সহায়তা আরও কমতে পারে বলে সরকারের ধারণা।
বৈঠকে কর্মকর্তারা আরও তুলে ধরেন যে, আগামী পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ রাজস্ব ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। ফলে ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায় সামাল দিতে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর বিকল্প থাকবে না।
বর্তমানে বাংলাদেশ আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে। আগের ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচি থেকে সরে এসে সরকার এখন সংশোধিত সংস্কার শর্তে ৪ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন তিন বছর মেয়াদি কর্মসূচি চায়। সেই কর্মসূচির সম্ভাব্যতা যাচাই করতেই আইএমএফের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাঁচ দিনের সফরে ঢাকায় অবস্থান করছে।