মাইলস্টোনে বিমান দুর্ঘটনার এক বছর: চোখের জলে সেই ভয়াল দুপুরের স্মৃতিচারণ শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের

প্রকাশিতঃ জুলাই ২২, ২০২৬ | ৪:৪০ পূর্বাহ্ণ
প্রধান সম্পাদক

রাজধানীর দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনার এক বছর পূর্ণ হলো আজ মঙ্গলবার (২১ জুলাই)। গত বছরের এই দিনে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিদ্যালয় ভবনের ওপর ভেঙে পড়ে ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সেই দুর্ঘটনায় নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা ও আহতদের আরোগ্য প্রার্থনায় আজ মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ মিলনায়তনে আয়োজন করা হয় শোক ও দোয়া অনুষ্ঠান, যার প্রতিপাদ্য ছিল “সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে”। এক বছর পরও দগদগে স্মৃতি অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার আবেগে থমকে যাচ্ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষিকা ফারজানা কাবেরী। তিনি জানান, দুর্ঘটনার কয়েক মুহূর্ত আগেও শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ ছিল একদম স্বাভাবিক। কয়েকজন শিক্ষার্থী পড়া বুঝতে না পারায় তিনি তাদের নিয়ে ক্লাসেই ছিলেন, আর তখনই দুর্ঘটনায় নিহত সহকর্মী ও কো-অর্ডিনেটর মাহেরিন চৌধুরীর সঙ্গে তার শেষ কথোপকথন হয়। এর কিছুক্ষণ পরই বিকট বিস্ফোরণ ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে দেয় ঘন কালো ধোঁয়া আর আতঙ্ক। ফারজানা কাবেরী বর্ণনা করেন, সে সময় ঘরের ভেতর আটকে পড়া আঠারোজন শিক্ষার্থীর নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল, বাইরে বেরোনোর পথও ছিল আগুনে ঘেরা। শিক্ষার্থীদের আতঙ্কিত প্রশ্ন আর কান্নার মধ্যেও তিনি তাদের সাহস জুগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যদিও নিজেও জানতেন না তারা বাঁচবেন কি না। তিনি বলেন, ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টে ছটফট করা এক শিশু তার ওড়নার আঁচল মুখে চেপে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছিল— এই দৃশ্যটি আজও তাকে তাড়া করে বেড়ায়। নিহত শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদের বাবা রুবেল মিয়া বলেন, সকালে নিজের হাতে ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়েছিলেন, কিন্তু দুপুরে তাকে ফিরিয়ে নিতে হয়েছিল নিথর দেহ হিসেবে। এখন প্রতিদিন ছোট ছেলেকে স্কুলে আনতে গিয়ে শত শত শিক্ষার্থীর মাঝে তিনি খুঁজে ফেরেন তানভীরের মুখ। নিহত তাসনিম আফরোজ আয়মানের মা আয়েশা আক্তার বলেন, কোনো অর্থই সন্তানের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। তিনি চান, ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবার যেন এমন নির্মম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি না হয়। অভিভাবকদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার এক বছর পরও এলাকায় প্রশিক্ষণ বিমান চলাচল অব্যাহত রয়েছে। বিমান উড্ডয়নের শব্দ শুনলেই অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তারা নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার এবং ঝুঁকি কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। নিজেও একজন মা হওয়ায় শিক্ষার্থীদের আকুতি সেদিন তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছিল বলে জানান তিনি। প্রাণে বাঁচার কোনো নিশ্চয়তা না থাকলেও তিনি শিক্ষার্থীদের ভরসা দিয়ে গিয়েছিলেন যে কোনো না কোনোভাবে তারা বেরিয়ে আসতে পারবেন। শেষ পর্যন্ত সহায়তাকারীদের প্রচেষ্টা ও পারিপার্শ্বিক সহযোগিতায় তারা প্রাণে বেঁচে ফেরেন বলে জানান ফারজানা কাবেরী। তবে সেদিনের আগুন, ধোঁয়া আর শিশুদের আতঙ্কিত মুখ— এই স্মৃতি কখনো ভুলতে পারবেন না বলে জানান তিনি, একে নিজের শিক্ষকজীবনের সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করেন। শোকের এক বছর গত বছরের এই দুর্ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক শোক ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিল। এক বছর পরও সেই ঘটনার স্মৃতি এখনও শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মনে গভীরভাবে দাগ কেটে আছে বলে আজকের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। নিহতদের স্মরণে ও আহতদের সুস্থতা কামনায় দোয়া মাহফিলের পাশাপাশি বিভিন্ন স্মৃতিচারণমূলক আয়োজন করা হয় অনুষ্ঠানে।