এনবিআরের মাঠপর্যায়ের তদারকি নিয়ে উদ্বেগ: ‘হয়রানি-দুর্নীতি বাড়ার শঙ্কা, সমাধান ডিজিটাল করব্যবস্থা’

প্রকাশিতঃ জুলাই ২৩, ২০২৬ | ৪:৫২ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

কর ফাঁকি শনাক্তের নামে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে পরিদর্শন চালিয়ে প্রয়োজনীয় নথি ও ডিজিটাল তথ্য জব্দের ক্ষমতা ব্যবহারের ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে এই উদ্যোগে রাজস্ব আদায়ের চেয়ে ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও দুর্নীতির সুযোগ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের দাবি, কর প্রশাসনকে আরও ক্ষমতাবান করার বদলে পুরো করব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করা হলে কর ফাঁকি কমবে, একই সঙ্গে ঘুষ ও অনিয়মের সুযোগও সীমিত হবে। এনবিআরের ঘোষণার পর দেওয়া এক বিবৃতিতে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) বলেছে, আইন প্রয়োগের নামে কর-অনুগত (কমপ্লায়েন্ট) ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যেন অপ্রয়োজনীয় হয়রানির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো পুরোপুরি কর-অনুগত হতে পারেনি, তাদেরও প্রয়োজনীয় সময় ও সুযোগ দিয়ে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। গত ১৯শে জুলাই জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এনবিআর জানায়, উৎসে কর (টিডিএস) যথাযথভাবে আদায় হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে কর্মকর্তারা যেকোনো বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে সরেজমিনে পরিদর্শন করতে পারবেন। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কর্মকর্তারা হিসাবের বই, ভাউচার, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, রসিদসহ আর্থিক কার্যক্রম-সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা ও তলব করতে পারবেন। পাশাপাশি কম্পিউটার, ক্লাউড সার্ভার, ডিজিটাল রেকর্ড কিংবা অন্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসে সংরক্ষিত তথ্যও পরীক্ষা করা যাবে। প্রয়োজনে পাসওয়ার্ড বা এনক্রিপশন ভেঙে তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতাও থাকবে। উৎসে কর কর্তনের তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে হিসাবের খাতা, নথিপত্র, ইলেকট্রনিক রেকর্ড বা ডিভাইস সাময়িকভাবে জব্দ করে নিজস্ব হেফাজতে রাখা এবং প্রয়োজনীয় নথি বা তথ্যের অনুলিপি সংগ্রহ করতে পারবেন কর্মকর্তারা। পরিদর্শনে বাধা দিলে আয়কর আইনের ১৪৭(২) ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবদুল ওয়াহেদ বলেন, রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্য থেকেই এনবিআর এ উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর উল্টো ফল হতে পারে। তিনি বলেন, “কর্মকর্তারা যদি কম্পিউটার বা হিসাবের খাতা জব্দ করেন, তাহলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এতে ব্যবসা পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে ঘুষ ও দুর্নীতির সুযোগও বাড়তে পারে।” রাজস্ব আদায় বাড়াতে করব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন এবং এনবিআরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রামের একজন শীর্ষস্থানীয় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক বলেন, “আইন মেনে চলা প্রতিষ্ঠানও এ ধরনের অভিযানে হয়রানির শিকার হতে পারে। মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ যত বাড়বে, ঘুষের ঝুঁকিও তত বাড়বে।” এনবিআরের ঘোষণার পরদিন দেওয়া বিবৃতিতে ডিসিসিআই বলেছে, আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কর-অনুগত প্রতিষ্ঠানগুলো যেন অযথা হয়রানির শিকার না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো পুরোপুরি কর-অনুগত নয়, তাদেরও প্রয়োজনীয় সময় দিয়ে নিয়মের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বিজ্ঞপ্তিতে নতুন কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। আয়কর আইনে আগে থেকেই যেসব ক্ষমতা রয়েছে, বিজ্ঞপ্তিতে শুধু সেগুলো স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “অতীতে অনেক ক্ষেত্রে পরিদর্শনে গিয়ে কর্মকর্তারা অসহযোগিতার মুখে পড়েছেন। এবার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য অনেক বড়। আয়করের সবচেয়ে বড় অংশ আসে উৎসে কর থেকে। সেখানে যেন কোনো ফাঁকি না থাকে, সে জন্য মাঠপর্যায়ের তদারকি জোরদার করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়।” চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি। এই উচ্চ লক্ষ্য পূরণে অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আহরণ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন কার্যক্রম অনেকটাই কমে যায়। কয়েকটি ঘটনায় অভিযানে গিয়ে কর্মকর্তারা হামলারও শিকার হন। নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর মাঠপর্যায়ের নজরদারি ও তদারকি বাড়ানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সাম্প্রতিক এই ঘোষণা তারই অংশ।