চরম গ্যাস সংকটে উৎপাদনে ধস: সংকটে শিল্প, শঙ্কায় রপ্তানি ও কর্মসংস্থান

প্রকাশিতঃ জুলাই ২৭, ২০২৬ | ৫:০১ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

দেশের শিল্প খাতে গ্যাস সংকট নতুন নয়। তবে গত এক সপ্তাহে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক কারখানায় উৎপাদন নেমে এসেছে মোট সক্ষমতার এক-চতুর্থাংশে। কোথাও দিনের পর দিন প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না থাকায় উৎপাদন লাইন বন্ধ রাখতে হচ্ছে, আবার কোথাও বয়লার চালু করার মতো ন্যূনতম চাপও মিলছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও শিল্প বিনিয়োগ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিল্প মালিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদিত লোড অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছেন না তারা। সংকটের বিষয়টি বারবার সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোকে জানানো হলেও কার্যকর সমাধান আসেনি। এর মধ্যে একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় সংকট আরও প্রকট হয়েছে। রোববার সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। বর্তমানে দুটি এফএসআরইউ দিয়ে যে পরিমাণ এলএনজি আমদানি হচ্ছে, তার বেশি আনার সুযোগ নেই। ফলে রাতারাতি পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনাও নেই। নারায়ণগঞ্জের মেঘনা সুগার রিফাইনারি লিমিটেডের সুগার প্ল্যান্টের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) কামরুল হাসান বলেন, “গ্যাস না পাওয়ায় আমরা মাত্র চার ভাগের এক ভাগ উৎপাদন করতে পারছি। অনেক সময় ফ্যাক্টরিই বন্ধ হয়ে যায়। বয়লারে নির্দিষ্ট চাপ না থাকলে উৎপাদন চালানো সম্ভব নয়।” তিনি জানান, গত এক সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এমনকি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও যেকোনো সময় উৎপাদন বন্ধের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। ক্রিয়েটিভ পেপারস মিল লিমিটেডের জিএম নাসিম আক্তার মোড়ল বলেন, “তিনটি মেশিনের মধ্যে কখনো একটি, কখনো দুটি চালাতে পারছি। বাকিগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন যেমন কমছে, তেমনি আর্থিক ক্ষতিও বাড়ছে।” দীর্ঘদিন বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করা প্রকৌশলী আজাদুল খালেদ বলেন, এটি কোনো একক কারখানার সমস্যা নয়, বরং জাতীয় শিল্প খাতের সংকট। তার ভাষায়, “চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় কোথাও কোথাও সিস্টেমই ভেঙে পড়ছে। গ্যাসের চাপ ওঠানামা করায় অনেক সময় ন্যূনতম চাপও পাওয়া যায় না। তখন পুরো প্ল্যান্ট বন্ধ রাখতে হয়।” বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি খোরশেদ আলম বলেন, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জসহ কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে অনেক কারখানায় একসঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ—দুটোরই সংকট দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, “গ্যাসের চাপ এত কম যে বয়লারই চালু করা যাচ্ছে না। যারা বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছে, তারা কিছুটা উৎপাদন চালাচ্ছে। কিন্তু যেসব মিল শতভাগ গ্যাসনির্ভর, তারা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।” তার ভাষ্য, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় স্থানীয় ও রপ্তানি—দুই বাজারের অর্ডারই ঝুঁকিতে পড়ছে। এর সঙ্গে ব্যাংকঋণের অর্থ ছাড়ে বিলম্ব যোগ হওয়ায় অনেক উদ্যোক্তা তারল্য সংকটে পড়েছেন। তিনি আরও বলেন, “সামনে শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার সময়। কয়েক দিন পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অনেক কারখানার জন্য বেতন পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে যেতে পারে।” গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে আবাসিক গ্রাহকদের ওপরও। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বিভিন্ন সময় চুলায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকছে যে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এলপিজি, বৈদ্যুতিক চুলা বা বাইরে থেকে খাবার কিনে খাচ্ছে। একই সঙ্গে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছেন না। তিতাস গ্যাসের অপারেশন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, বর্তমানে তিতাস প্রতিদিন প্রায় ১,২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাচ্ছে, যেখানে তাদের চাহিদা প্রায় ১,৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তার মতে, এফএসআরইউ চালু হলেও সংকট পুরোপুরি কাটবে না। কারণ, সেটি বিকল হওয়ার আগেও তিতাস সর্বোচ্চ ১,৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাচ্ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট বিদ্যুৎ ও সার কারখানায় চলে যায়। ফলে অন্যান্য খাতে প্রয়োজনের তুলনায় প্রতিদিনই ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থেকে যায়। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) এলএনজি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বিদেশি প্রকৌশলীরা মেরামতের কাজ করছেন। তবে কবে নাগাদ এফএসআরইউ সচল হবে, সে বিষয়ে এখনই নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে বেগমগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ এলাকায় পাঁচটি নতুন কূপ খননের প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন এফএসআরইউ স্থাপন, ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনা এবং এলএনজি আমদানির নতুন উৎস খোঁজার উদ্যোগ চলছে। তবে শিল্প উদ্যোক্তাদের প্রশ্ন, এসব উদ্যোগ বাস্তবে ফল দিতে কত সময় লাগবে। কারণ বর্তমান সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি আদেশ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান—সবই ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তাদের মতে, সাময়িক সংকট নয়, দেশে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের ঘাটতিই এখন শিল্প খাতের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তায় পরিণত হয়েছে।