কোটা সংস্কারের পর বিসিএসে নারীদের নিয়োগে বড় পতন, প্রশ্নের মুখে সংস্কার

প্রকাশিতঃ জুলাই ২৮, ২০২৬ | ৪:৪৭ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের পর বিসিএসে নারীদের নিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। সর্বশেষ ৪৭তম বিসিএসে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে নারী মাত্র ২২ শতাংশ। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও অন্যান্য পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের বাস্তব প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম বলছেন, শুধু কোটা সংস্কারের কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো যাবে না। বিষয়টি নিশ্চিত হতে পরপর কয়েকটি বিসিএস পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণা প্রয়োজন। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের নাম করে ২০২৪ সালের বিক্ষোভ সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। ওই বছরের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান ৫৬ শতাংশ কোটা কার্যত পুনর্বিন্যাস করা হয়। বর্তমানে সরকারি চাকরিতে মোট কোটা ৭ শতাংশ। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ১ শতাংশ সংরক্ষিত রয়েছে। নারী ও জেলা কোটা পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। ফলে এখন ৯৩ শতাংশ নিয়োগ হচ্ছে উন্মুক্ত মেধার ভিত্তিতে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের প্রয়োজন ছিল। তবে নারী কোটা পুরোপুরি বাতিল এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কোটা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার ফলে প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কোটা-ভাতা-চাকরি-বরাদ্দ, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা সবই কোটাবিরোধীদের ঝোলায় পিএসসির তথ্য অনুযায়ী, ৪৭তম বিসিএসে মোট ১ লাখ ৪০ হাজার ৭২২ জন নারী আবেদন করেছিলেন। প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নেন ৯০ হাজার ২৬২ জন। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পান মাত্র ২৯৪ জন নারী। একই বিসিএসে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত পুরুষের সংখ্যা ১ হাজার ৪০ জন। মোট ১ হাজার ৩৩৪ জনের মধ্যে নারীর হার মাত্র ২২ শতাংশ। পিএসসির আগের বার্ষিক প্রতিবেদনগুলোও একই ধরনের প্রবণতা দেখাচ্ছে। ৩৪তম বিসিএসে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত নারীর হার ছিল ৩৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ। পরে ৪১তম বিসিএসে তা কমে ২৬ দশমিক ৭১ শতাংশ, ৪৩তম বিসিএসে ১৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং ৪৪তম বিসিএসে ২০ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে আসে। কোটা-ভাতা-চাকরি-বরাদ্দ, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা সবই কোটাবিরোধীদের ঝোলায় অর্থাৎ, কোটা সুবিধা বহাল থাকাকালেও নারীদের অংশগ্রহণ কমছিল। তবে কোটা পুরোপুরি বাতিলের পর সেই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পিএসসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম বলেন, সাম্প্রতিক কয়েকটি বিসিএসে নারী প্রার্থীদের সাফল্যের হার উদ্বেগজনকভাবে কমছে। তবে এর পেছনে কোটা বিলোপ নাকি অন্য কোনো কারণ কাজ করছে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে অন্তত পাঁচ থেকে সাতটি বিসিএস পরীক্ষার তথ্য নিয়ে সময়ভিত্তিক গবেষণা করতে হবে। ড. মোবাশ্বের মোনেম বলেন, পিএসসির পরীক্ষায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করা হয়। লিখিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন থেকে শুরু করে মৌখিক পরীক্ষার বোর্ড গঠন পর্যন্ত কোথাও কোনো ধরনের বৈষম্য বা পক্ষপাতের সুযোগ নেই। পিএসসির সদস্য অধ্যাপক ড. ফেরদৌস আরফিনা ওসমান বলেন, সরকারি প্রশাসনে নারীদের অংশগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে কমছে। সাম্প্রতিক বিসিএসগুলোতে নারী প্রার্থীদের উপস্থিতিও কমেছে। অনেকেই লিখিত পরীক্ষায় বাদ পড়ছেন, আবার অনেকে মৌখিক পরীক্ষায়ও টিকতে পারছেন না। তার ভাষায়, কোটা ব্যবস্থা নারীরা নিজেরা চাননি। কিন্তু কোটা তুলে দেওয়ার পর তারা লাভবান হয়েছেন, এমনটিও দেখা যাচ্ছে না। এখন প্রশ্ন হলো, নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিকল্প কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরীক্ষায় ভালো ফল করাই একমাত্র মেধার পরিচায়ক নয়। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক বৈষম্যের কারণে অনেক জনগোষ্ঠী সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ পায় না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে সমতার জায়গায় নিয়ে আসা। তাদের মতে, নারী কোটা বাতিলের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কোটা ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামিয়ে আনার ফলে এসব জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব আরও কমে যেতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশেই সরকারি চাকরিতে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে বিশেষ সংরক্ষণ নীতি রয়েছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষেত্রবিশেষে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নারী কোটা রয়েছে। পাকিস্তানে সরকারি চাকরিতে ১০ শতাংশ নারী কোটা সংরক্ষিত। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানে নারী-পুরুষের ভারসাম্য নিশ্চিত করতে বিশেষ নীতি অনুসরণ করা হয়। ড. মোবাশ্বের মোনেম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেয়েরা ভালো ফল করে ভর্তি হতে পারছেন। অনেক বিভাগে মেয়েদের সংখ্যাও ছেলেদের চেয়ে বেশি। কিন্তু বিসিএসের মতো উচ্চপর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় কোনো এক পর্যায়ে তারা ঝরে পড়ছেন। বিষয়টি গভীর গবেষণার দাবি রাখে। অন্যদিকে ড. ফেরদৌস আরফিনা ওসমান বলেন, পরিবার, সন্তান লালন-পালন, সামাজিক দায়িত্ব এবং কর্মজীবনের ভারসাম্যসহ নানা বাস্তবতার চাপ নারীদের ওপর বেশি থাকে। এসব সামাজিক প্রতিবন্ধকতা দূর না করে কেবল কোটা বাতিল বা বহাল রাখার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বিশ্লেষকদের মতে, কোটা সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য ছিল বৈষম্য দূর করে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা। তবে নতুন ব্যবস্থায় যদি নারী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে, তাহলে কোটা সংস্কারের বাস্তব প্রভাব নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে।