ভারতের উত্তর সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় পঞ্চম প্রজন্মের অত্যাধুনিক জে-২০ মাইটি ড্রাগন (J-20 Mighty Dragon) স্টিলথ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে চীন। সাম্প্রতিক উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, শিনজিয়াং ও তিব্বতের দুটি কৌশলগত বিমানঘাঁটিতে অন্তত ১১টি জে-২০ যুদ্ধবিমান অবস্থান করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই মোতায়েন ভারতের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, কারণ নিজস্ব স্টিলথ যুদ্ধবিমান পেতে দেশটির এখনও প্রায় এক দশক অপেক্ষা করতে হতে পারে।
স্যাটেলাইট ইমেজিং সংস্থা ভ্যান্টর-এর প্রকাশিত উপগ্রহ চিত্র অনুযায়ী, ৯ জুলাই শিনজিয়াংয়ের হোতান বিমানঘাঁটিতে রানওয়ের পাশে সারিবদ্ধভাবে সাতটি জে-২০ যুদ্ধবিমান দেখা গেছে। ঘাঁটিটি লাদাখের লেহ থেকে প্রায় ৩৮৯ কিলোমিটার এবং ভারতের কৌশলগত দৌলত বেগ ওল্ডি বিমানঘাঁটি থেকে মাত্র ২৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
আরেকটি উপগ্রহ চিত্রে তিব্বতের দামশুং বিমানঘাঁটিতে আরও চারটি জে-২০ স্টিলথ ফাইটার পার্ক করা অবস্থায় দেখা গেছে। এই ঘাঁটিটি অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং অঞ্চল থেকে প্রায় ৩৪৪ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক উপগ্রহের মাধ্যমে কোনো চীনা বিমানঘাঁটিতে একসঙ্গে এত সংখ্যক জে-২০ যুদ্ধবিমান শনাক্ত হওয়ার ঘটনা এই প্রথম। তবে এ বিষয়ে ভারতীয় বিমানবাহিনী এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।
ভারতের মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা নিউস্পেস-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সাবেক ফাইটার পাইলট সমীর জোশী বলেন, হোতান ও দামশুংয়ে জে-২০-এর উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, ভারতের সীমান্তমুখী উচ্চতর বিমানঘাঁটিতে পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমান পরিচালনা এখন চীনা বিমানবাহিনীর নিয়মিত কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে। তার মতে, এটি সাময়িক শক্তি প্রদর্শন নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রস্তুতির অংশ।
তিনি আরও বলেন, উত্তর সীমান্তে কম-শনাক্তযোগ্য স্টিলথ হুমকি মোকাবিলায় ভারতের কাউন্টার-স্টিলথ সেন্সর, সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার স্ট্যান্ডঅফ স্ট্রাইক সক্ষমতা দ্রুত আধুনিকীকরণ করা জরুরি।
জে-২০-এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর স্টিলথ প্রযুক্তি, যা প্রচলিত রাডারে শনাক্ত হওয়া কঠিন করে তোলে। ফলে ভারতের হাতে থাকা রাফায়েলের মতো উন্নত হলেও নন-স্টিলথ চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের তুলনায় জে-২০ উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত সুবিধা পায় বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
বর্তমানে ভারতের নিজস্ব কোনো স্টিলথ যুদ্ধবিমান নেই। দেশটির প্রথম দেশীয় স্টিলথ প্রকল্প অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট (AMCA) উন্নয়নাধীন থাকলেও এটি বিমানবাহিনীর বহরে যুক্ত হতে আরও অন্তত ১০ বছর সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে দ্য ওয়ার জোন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে চীনের হাতে যেখানে প্রায় ৫০টি জে-২০ ছিল, ২০২২ সালের শেষ নাগাদ সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২০০-তে পৌঁছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ১২০টিতে উন্নীত হওয়ায় ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে চীনের জে-২০ বহর ৩০০ থেকে ৫০০টির মধ্যে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট (RUSI) মনে করছে, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের জে-২০ বহর এক হাজারে পৌঁছাতে পারে।
অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় এয়ার মার্শাল নর্মদেশ্বর তিওয়ারি বলেন, প্রতিবছর শতাধিক যুদ্ধবিমান উৎপাদনের সক্ষমতা দেখিয়ে চীন প্রমাণ করেছে যে তাদের প্রতিরক্ষা শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী। প্রথম গালফ যুদ্ধের পর থেকেই চীন বিমান শক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সক্ষমতা গড়ে তুলেছে।
বর্তমানে ভারতের হাতে ৩৬টি রাফায়েল যুদ্ধবিমান রয়েছে, যা আম্বালা ও হাশিমারা বিমানঘাঁটির দুটি স্কোয়াড্রনে মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য আরও ২৬টি রাফায়েল অর্ডার করা হয়েছে এবং বিমানবাহিনীর জন্য অতিরিক্ত ১১৪টি রাফায়েল কেনার বিষয়েও আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে ভারতীয় বিমানবাহিনী ২৬০টিরও বেশি সুখোই-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমান পরিচালনা করছে, পাশাপাশি মিরাজ-২০০০ ও মিগ-২৯-এর মতো পুরোনো যুদ্ধবিমানও এখনও বহরে রয়েছে। সূত্র: এনডিটিভি, জাগোনিউজ