জুলাই ২০২৪-এর গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ যে ঐক্য ও সাহসের পরিচয় দিয়েছিল, তারই সহযোদ্ধাদের আজ একই ছাত্রসমাজের একাংশ “ছাত্রলীগ” ট্যাগ দিয়ে নির্যাতন করছে। স্বার্থের সংঘাতে জুলাইয়ের আন্দোলনকারীদের উপর এই প্রতিশোধমূলক হামলা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এক ভয়ংকর ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। যে সংগঠনকে একসময় ছাত্রদের অধিকারের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো, সেই নামটিকে এখন নির্বিচারে মারধর ও হয়রানির লাইসেন্স বানানো হয়েছে।
সর্বশেষ উদাহরণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগের বাইক পুড়িয়ে ছবি তুলে ভাইরাল হওয়া প্রতীম দাসকে সম্প্রতি রাকসু সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার ও তাঁর সহযোগীদের (শিবির সমর্থিত বলে অভিযোগ) বেধড়ক মারধরের শিকার হতে হয়েছে। এ ঘটনায় “ছাত্রলীগ” ট্যাগ ব্যবহার করে হামলাকে যৌক্তিকতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
এমন ঘটনা একা রাজশাহীতে সীমাবদ্ধ নয়। সারাদেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্ররা জুলাইয়ের এক বিশেষ গোষ্ঠির হামলার শিকার হচ্ছেন। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে “ছাত্রলীগ” লেবেলটি সুবিধাজনক অস্ত্র হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে ইসলামী ছাত্র শিবির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিজেদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করছে।
আশ্চর্যের বিষয়, একসময় ছাত্র অধিকারের কথা বলা “সাধারণ ছাত্র” নামধারী সংগঠনগুলো এসব ঘটনায় নীরব ভূমিকা পালন করছে।
তোমারে বধিবে যে, বাড়িয়াছে সে তোমাদেরই সৃষ্ট বয়ানে
এইযে “ছাত্রলীগ” ট্যাগ দিয়ে হত্যা করা, মব করার ঘটনাগুলোকে সহজীকরন করা, এটার শুরুটা হয়েছিল খুবই নির্মমভাবে। আর এই নির্মমতার বলি হয়েছিল শতাধিক ছাত্রলীগ করা নেতা কর্মীরা।
আগস্ট ২০২৪-এর পর ছাত্রলীগ এর বিরুদ্ধে সমম্বিত ভাবে একটি বয়ান প্রতিষ্ঠিত করা হয়, যাহেতু জুলাই-এর ছাত্র আন্দোলন এর বিরোধীতা করেছিল ছাত্রলীগ, তাই ছাত্রলীগ জুলাই আন্দোলনের শত্রু এবং এই ছাত্রলীগ সদস্যদের খতম করা, মব করে পেটানো, হত্যা করা জুলাইয়ের চেতনার স্বার্থে “জায়েজ”।
১৫ই জুলাই, ২০২৪ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে “তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার” স্লোগান দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাস্তায় নামা কোটা বিরোধী ছাত্র আন্দোলনাকারীদের লাঠিসোটা নিয়ে হামলা করেছিল ছাত্রলীগ। সেদিনের সেই ঘটনার প্রতিশোধ শুরু হয়েছিল বিভিন্ন হলে হলে ছাত্রলীগের সদস্যদের পিটিয়ে হলছাড়া করা, চট্টগ্রামের মুরাদপুরে ছয়তলা ভবন থেকে ছাত্রলীগের সদস্যদের পিটিয়ে ছাদ থেকে ছুড়ে নীচে ফেলা, দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার ছাত্রলীগ করা মেধাবী উচ্চ শিক্ষার্থীদের ছাত্রত্ব বাতিল করা দাবীর মাধ্যমে।
এরই ধাবাহিকতায় একটি ছাত্র সংগঠন করার অভিযোগে সারাদেশব্যাপী ছাত্রলীগ করা ছাত্রদের “হত্যাযোগ্য” ও “মবযোগ্য” করার সর্বশেষ লাইসেন্স দেন ড ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার, ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে।
সন্মিলিত ভাবে চালানো এই প্রচারণা, উদাহরন আর হত্যাযোগ্য করার লাইসেন্সের ফলে সারাদেশে প্রায় হাজার হাজার ছাত্রলীগ কর্মীর ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়, তাদের পড়াশোনার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। অনেককে মব লিঞ্চিংয়ের শিকার হতে হয়, পিটিয়ে জেলে পাঠানো হয়, আর হত্যা করে হয়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হত্যা করা সাবেক ছাত্রলীগ কর্মীঃ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শামীম আহমেদ ওরফে শামীম মোল্লা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় তোফাজ্জল হোসেনকে
এসব ঘটনা এতটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে যে, জুলাই আন্দোলনে বিজয়ীরা উৎসব করে, ঔরা ফার্মিং করে যেখানে সেখানে ছাত্রলীগ পেটাতো, ধরিয়ে দিতো। আজ সেই একই “ছাত্রলীগ” ট্যাগ ব্যবহার করে যে কারো উপর হামলা চালানো খুব স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠেছে। সালাউদ্দিন আমারের মতো ব্যক্তিরা এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছেন।
সাধারণ ছাত্রদের অবস্থান!
কিছুদিন আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জুলাই যোদ্ধা নিজ এলাকায় গেলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সদস্যরা তাঁকে হেনস্তা করেন। জোর করে “জয় বাংলা” স্লোগান দিতে বলা হয়। ছাত্রটি স্লোগান দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” বলেন এবং নিজ থেকেই “জুলাইCDI” বলেন। এ ঘটনায় সারাদেশে ছাত্রদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সবাই জোরপূর্বক স্লোগান দেওয়া ও হেনস্তার প্রতিবাদ জানান।
এই সাধারণ ছাত্র কারা, যারা বিশেষ বিশেষ ঘটনায় প্রতিবাদী হয় আর বাকি সময় ঔরা ফার্মিং আর লাইফ হ্যাক নিয়ে ব্যাস্ত থাকে?
এরা ছাত্রসমাজের সেই অংশ যারা একটা ভয়ংকর বয়ান-কে হাতিয়ার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছিল।
কি সেই হাতিয়ার?
মত ও চেতনার মিল না হলে, সে ছাত্রলীগ। আর ছাত্রলীগ মবযোগ্য বা হত্যাযোগ্য হিসাবে বিবেচিত হবে।
এই যে ভয়ংকর এক সংস্কৃতি সৃষ্টি করলো জুলাইয়ের আন্দোলনাকারী ছাত্ররা, তার প্রয়োগ আজ তাদের উপরেই হচ্ছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাকসু সাধারন সম্পাদক ও জঙ্গিভাবাপন্ন সালাউদ্দিন আম্মার সাধারণ ছাত্রদের সৃস্টি করা সেই কালচারাল বয়ান এক্সারসাইজ করেছে মাত্র।
জুলাই আন্দোলনকারী ছাত্রদের সৃস্টি করা এই কালচারাল বয়ান এর প্রয়োগ আরও হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র শক্তি কিছুদিন আগে রোজার মাসে সেহেরির সময় “ছাত্রলীগ” ট্যাগ দিয়ে পিটিয়ে এক ছাত্রকে শাহবাগ থানার সামনে ছেড়ে যায়। “ছাত্রলীগ” ট্যাগ দিয়ে ইমি তো জেল খেটেই আসলো।
যেখনই কোন ছাত্র বিশেষ কোন গোষ্ঠির স্বার্থে আঘাত করবে বা বিরোধিতা করবে বা পথের কাঁটা হবে, তখন তখনই জুলাইয়ের সৃষ্ট করা সেই কালচারাল বয়ান এর চর্চা হবে, তারপর ট্যাগ দেয়া হবে, এরা তো ‘ছাত্রলীগ’। এটাই জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন।
জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনকারীরা কোন দাবিতে, কোন ছাত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে আন্দোলন করেছিল, সেগুলো সব অতীত।
জুলাই বিজয়ীদের অধিকার দিয়েছে মব করে, হত্যা করে জুলাইয়ের চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করার।
জুলাই একটা বিশেষ শ্রেনীকে অধিকার দিয়েছে “ছাত্রলীগ” ট্যাগ দেয়ার, আর তাকে হত্যাযোগ্য করার। এটাই জুলাইয়ের একমাত্র অর্জন কারো কারো জন্য।