জাপানের অর্থে নির্মিত, সেই জাপানকে হটিয়ে বন্দর-বোয়িং-জ্বালানি চুক্তির মতো থার্ড টার্মিনালও চায় যুক্তরাষ্ট্র!

প্রকাশিতঃ আগস্ট ২, ২০২৬ | ৪:৪১ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

জাপানের অর্থায়নে নির্মাণাধীন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনায় যুক্ত হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সিকিউরিপোর্ট। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তা চলতি সপ্তাহে ঢাকা সফরে আসছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সফরকালে সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকেরও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারের পতন পরবর্তী দুই সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি নিরসনের নামে যথেষ্ট পরিমাণ রুট না থাকা সত্ত্বেও মার্কিন সংস্থা থেকে ২৫টি বোয়িং বিমান ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে। চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনায়র দায়িত্ব মার্কিন প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে এখনো সরকার কিছু খোলাসা করেনি। বন্দর আদৌ বাংলাদেশের হাতে আছে নাকি বিদেশি বেনিয়াদের হাতে চলে গেছে, পরিস্কার নয়। এছাড়াও শেখ হাসিনার সরকারের সময় কাতারের সাথে স্বল্পমূল্যে এলএনজি সরবরাহের ১৫ বছরের যে চুক্তি করা হয়েছিল, সেটি বাতিল করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন করে উচ্চমুল্যে এলএনজি সরবরাহে ১৩ বছরের চুক্তি করেছে বর্তমান সরকার। আর এবার তৃতীয় টার্মিনালও চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকার যখন তৃতীয় টার্মিনালটি নির্মাণ করছিল, তখন থেকেই জাপানের সাথে প্রাথমিক আলোচনা চলছিল টার্মিনাল পরিচালনার ব্যাপারে। জাপানি একটি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে সরকারের আলোচনা শেষ পর্যায়ে ছিল। ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টার্মিনালের উন্নয়ন কাজ থশকে যায়। কিন্তু তখন থেকেই সিকিউরিপোর্ট টার্মিনাল পরিচালনায় আগ্রহ দেখানো শুরু করে জাপানের সাথে আলোচনা-পরিস্থিতি ডিঙিয়ে। সে সময় তারা একটি ধারণাপত্রও জমা দেয়। যদিও এখন পর্যন্ত টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হয়নি। বিএনপি সরকারের লক্ষ্য আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই তৃতীয় টার্মিনাল চালু করা। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী ডিসেম্বরের মধ্যেই তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। তবে সিকিউরিপোর্টের আগ্রহের বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য জানাতে পারেননি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সিকিউরিপোর্টের শীর্ষ কর্মকর্তা অ্যান্ডরিক সিকিউরার ঢাকায় এসে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। প্রতিষ্ঠানটি মূলত বিমানবন্দর নিরাপত্তা, ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা সেবা দিয়ে থাকে। সিকিউরিপোর্টের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারকে সীমান্ত নিরাপত্তা, বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা এবং স্মার্ট ইমিগ্রেশন প্রযুক্তি সরবরাহ করে আসছে তারা। এছাড়া অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচার, মাদক পাচারসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সমাধান প্রদানও তাদের অন্যতম কার্যক্রম। সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশে সিকিউরিপোর্ট মূলত তৃতীয় টার্মিনালের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাপনা, যাত্রীদের তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় কাজ করতে আগ্রহী। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে একই ধরনের সেবা দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। অন্যদিকে, জাপানের অর্থায়নে নির্মাণাধীন এই টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব শুরু থেকেই জাপানি কনসোর্টিয়ামের হাতে যাওয়ার আলোচনা চলছিল। ওই কনসোর্টিয়ামে রয়েছে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো কর্পোরেশন, সোজিৎজ কর্পোরেশন এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট কর্পোরেশন। মার্চ ও এপ্রিল মাসে কনসোর্টিয়ামের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের একাধিক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার বৈঠক হয়েছে। ৩১শে জুলাই তাদের দরপত্র জমা দেওয়ার কথা ছিল। এরপরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে বেবিচক। এদিকে শুধু সিকিউরিপোর্ট নয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডানাটাও তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রম পরিচালনায় আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বাংলাদেশে নিযুক্ত আমিরাতের রাষ্ট্রদূত এ আগ্রহের বিষয়টি তুলে ধরেন। ডানাটা বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, কার্গো, ক্যাটারিং ও ভ্রমণসেবা পরিচালনা করছে। এর আগে যুক্তরাজ্য ও তুরস্কের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও একই ধরনের আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। ফলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা ও সংশ্লিষ্ট সেবা কার্যক্রম ঘিরে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা আরও জোরালো হচ্ছে। এখন সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকেই নজর সংশ্লিষ্ট সবার।