আত্রাইয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় জরিমানা আদায় অনাদায়ে সমাজচ্যুতের হুমকি

প্রকাশিতঃ আগস্ট ৯, ২০২৬ | ৬:১৪ অপরাহ্ণ
নাসির উদ্দিন, উপজেলা সংবাদদাতা, আত্রাই, নওগাঁ

নওগাঁর আত্রাইয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় জরিমানা আদায়,অনাদয়ে দেওয়া হয় সমাজচ্যুত্যে হুমকি। তালাকের পর একই ছেলের সঙ্গে মেয়েকে পারিবারিকভাবে পুনরায় বিয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে গ্রাম্য বৈঠক বসিয়ে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজন মাতব্বরের বিরুদ্ধে। জরিমানার টাকা দিতে না পারলে দ্বিগুণ টাকা দিতে হবে এবং সমাজ থেকে বের করে দেওয়া হবে বলেও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বৈঠক চলাকালে মেয়ের পরিবারকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করার অভিযোগও উঠেছে। পরে অন্যের কাছ থেকে ধার করে ওই রাতেই ৩০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন বলে দাবি করেছেন মেয়ের মা। গত সোমবার (৩ আগস্ট) দিবাগত রাতে উপজেলার সাহাগোলা ইউনিয়নের ঝনঝনিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঝনঝনিয়া গ্রামের এক মেয়ের সঙ্গে ওই ছেলের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের তালাক হয়। এরপর গত শনিবার মেয়েটির পরিবারের পক্ষ থেকে তালাকপ্রাপ্ত সেই ছেলের সঙ্গেই পুনরায় বিয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, দ্বিতীয়বার বিয়ের বিষয়টি গ্রামের কয়েকজনকে না জানানোয় স্থানীয় মাতব্বররা বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তোলেন। এরই জেরে সোমবার (৩ আগস্ট) রাতে গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে মেয়ের পরিবারকে ডেকে গ্রাম্য বৈঠকে বসানো হয়। বৈঠকের সভাপতি আফাজ। এছাড়া বৈঠকে শিপন, রাসেল, আনোয়ার, জিল্লু, সাত্তার, রফিকুলসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। মেয়ের মা মমতা আক্তার বলেন, “গত শনিবার (১ আগস্ট) আমার মেয়েকে পারিবারিকভাবে ওই ছেলের সাথেই আমরা দ্বিতীয়বার বিয়ে দেওয়ার পর সোমবার রাতে গ্রামবাসী আমাদের ডেকে বৈঠকে বসেন। এ সময় রাসেল ও শিপন আমাদেরকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। একপর্যায়ে আমাদের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা চান।” তিনি আরও বলেন, “আমি গরিব মানুষ হওয়ায় টাকা দিতে পারব না বললে পরবর্তীতে আমাকে দ্বিগুণ টাকা দিতে হবে এবং সমাজ থেকে বের করে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেন। পরে আমি অন্যের কাছ থেকে হাওলাত নিয়ে ওই রাতেই ৩০ হাজার টাকা পরিশোধ করি।” এ বিষয়ে শিপনের সাথে মুঠো ফোনে অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে, তিনি বলেন গ্রামে আসেন আমি সকলের সামনে বিষয়টি বলবো। মেয়ের পরিবারের অভিযোগ, বৈঠকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানার সিদ্ধান্ত দেওয়ার পর তা রাতের মধ্যেই পরিশোধ করতে বলা হয়। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে পরবর্তীতে দ্বিগুণ টাকা দিতে হবে এবং পরিবারটিকে সমাজ থেকে বের করে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। এ বিষয়ে বৈঠকে উপস্থিত আনোয়ার বলেন, “বৈঠকে ছেলে পক্ষের কোনো দোষ পাওয়া যায়নি। মেয়ে পক্ষের দোষ পাওয়া গেছে। তাই সমাজের আয় এবং যুব উন্নয়ন ফান্ডের নামে তাদের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।” গ্রাম্য বৈঠকের সভাপতি আফাজ বলেন, “গ্রামের সকলে উপস্থিত থেকে এই সালিশ করা হয়েছে। সেখানে ওই পরিবারকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।” গ্রাম্য সালিশে এভাবে জরিমানা করার আইনগত এখতিয়ার আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আফাজ বলেন, “আইনগতভাবে এটি লেন্দি বিষয়। তাই সমাজের সকলে বসে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” সাহাগোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম মামুনুর রশিদ বলেন, “গ্রাম্য সালিশের বিষয়ে আমার কোনো কিছুই জানা নেই। আমাকে কেউ কিছু বলেওনি। ৫ আগস্টের পর থেকে ইউনিয়নের বিভিন্ন জায়গায় কিছু চক্র বা মহল এ ধরনের কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।” এ বিষয়ে আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, “গ্রামে এ ধরনের গ্রাম্য সালিশ করার কোনো সুযোগ নেই। গ্রাম আদালতেই ব্যবস্থা নিতে পারে। যদি কেউ কোনো অভিযোগ দেয়, তাহলে আমি ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”