আওয়ামী লীগ আমলের চুক্তি: ভারত থেকে আসছে নতুন প্রজন্মের রেলকোচের প্রথম চালান

প্রকাশিতঃ আগস্ট ১৩, ২০২৬ | ৫:১২ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ভারত থেকে বাংলাদেশে আসছে নতুন প্রজন্মের ২০০ রেলকোচের প্রথম চালান। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা চুক্তির আওতায় এসব কোচ বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে যুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে ঢাকা-দিল্লির রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতির কারণে সরবরাহ প্রক্রিয়া আটকে যায়। অবশেষে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই প্রথম রেকটি ভারত থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা করছে। আজ ১২ই আগস্ট, বুধবার ভারতের কাপুরথালার রেল কোচ কারখানা থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য তৈরি প্রথম রেকটি ছাড়ার কথা রয়েছে। প্রথম রেকে থাকবে ১৯টি লিংকে হফম্যান বুশ (এলএইচবি) কোচ। দর্শনা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর এগুলো নেওয়া হবে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায়। সেখানে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কারিগরি যাচাই শেষে যাত্রীবাহী ট্রেনে যুক্ত করা হবে। বাংলাদেশ রেলওয়ের সূত্র ও সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ভারতীয় প্রতিষ্ঠান রাইটসের মাধ্যমে ২০২৪ সালে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ কেনার চুক্তি করা হয়। চুক্তিটির মূল্য প্রায় ৯১৫ কোটি ভারতীয় রুপি। পুরো চালান ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে চুক্তি হওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ে কোচ সরবরাহে অগ্রগতি দেখা যায়নি। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হলে দুই দেশের বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় প্রকল্প ও সহযোগিতার ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। সেই ধারাবাহিকতায় রেলকোচ সরবরাহের বিষয়টিও দীর্ঘ সময় ঝুলে ছিল বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে রেল যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে একাধিক প্রকল্প নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ রেলওয়ের বহর আধুনিকায়নে ভারত থেকে নতুন ব্রডগেজ কোচ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পড়ুন: ভারত থেকে ২০০ রেলকোচ ক্রয়: শেখ হাসিনা সরকারের করা চুক্তি বাতিল নয়, বাস্তবায়ন করছে বিএনপি কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক দ্রুত সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান, তাকে ফেরত পাঠানোর দাবি এবং সীমান্ত, পানি ও রাজনৈতিক ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার সংকট তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে বিভিন্ন চলমান সহযোগিতা ও প্রকল্পের ওপরও। এই পরিস্থিতিতে চুক্তি অনুযায়ী রেলকোচ সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর অবশেষে প্রথম চালানের ১৯টি কোচ বাংলাদেশে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের প্রয়োজন ও পরিচালনব্যবস্থা বিবেচনায় নিয়ে প্রথম রেকের কোচগুলো বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তিনটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শয্যাযান, তিনটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চেয়ার কোচ, ১১টি সাধারণ চেয়ার কোচ এবং দুটি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কোচ। কোচগুলোতে যাত্রীদের জন্য আধুনিক বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়েছে। রয়েছে স্টেইনলেস স্টিলের হাতল ও পাদানি, হেলানো যায় এমন আসন এবং আংশিক খোলা যায় এমন জানালা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচে ফ্যানের পাশাপাশি সমন্বিত সিসিটিভি নজরদারি ও যাত্রী সতর্কীকরণ ব্যবস্থা থাকবে। এ ছাড়া শিশু পরিচর্যার জন্য আলাদা কক্ষ এবং নামাজের কক্ষের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনায় কোচগুলোর ছাদও তুলনামূলক শক্তিশালী করা হয়েছে। ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠার ঝুঁকি কমানো এর অন্যতম উদ্দেশ্য। সংঘর্ষের ক্ষেত্রে যাত্রীদের নিরাপত্তা বাড়াতে ইউরোপীয় মান ইএন ১৫২২৭ অনুসরণ করে কোচগুলোর মূল কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন কোচগুলোর বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা বাংলাদেশের রেলওয়ের প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে। এগুলো ৪১৫ ভোল্টের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় পরিচালনার উপযোগী। ভারতীয় রেলের প্রচলিত কোচে সাধারণত ৭৫০ ভোল্টের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়। ফলে বাংলাদেশে ব্যবহারের উপযোগী করে কোচগুলোর নকশা ও কারিগরি ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। ভারত থেকে এবারই প্রথম এলএইচবি কোচ আসছে না। ২০১৫-১৬ সালে ভারতীয় রেল কোচ কারখানা বাংলাদেশ রেলওয়েকে ১২০টি ব্রডগেজ এলএইচবি যাত্রীবাহী কোচ সরবরাহ করেছিল। তবে এবারের কোচগুলো আগের তুলনায় বাংলাদেশের বাস্তবতা ও প্রয়োজন বিবেচনায় আরও কিছু পরিবর্তন ও আধুনিক সুবিধা যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে। নতুন ১৯টি কোচ কোন ট্রেনে যুক্ত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এসব কোচ দিয়ে নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হবে, নাকি পুরোনো কোনো ট্রেনের কোচ পরিবর্তন করা হবে—সেটিও নির্ধারণ করা হয়নি। বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন কোচ পাওয়ার পর বিভিন্ন রুটে নতুন রেক চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথম রেকের কোচ দিয়ে নতুন যাত্রীসেবা চালুর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। তবে যাত্রী পরিবহনে যুক্ত করার আগে কোচগুলোকে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও কারিগরি যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এরপর কোন রুটে এবং কোন ট্রেনে এগুলো চালানো হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ২০০ কোচের বড় চুক্তি ২০২৪ সালে করা চুক্তির আওতায় মোট ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ বাংলাদেশে আসার কথা। চুক্তির আওতায় কাপুরথালার রেল কোচ কারখানায় মোট সাত ধরনের কোচ তৈরি করা হচ্ছে। চলতি বছরের এপ্রিলে সংসদে রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছিলেন, ভারত থেকে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ আমদানি করা হবে। ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এসব কোচ বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সম্পাদিত সেই চুক্তির প্রথম বড় চালান এখন বাংলাদেশে আসার অপেক্ষায়। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর রেলকোচ সরবরাহ শুরু হওয়াকে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের বাস্তব সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবেও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।