চট্টগ্রাম থেকে লোকগান, পালা, পুঁথি পেরিয়ে বড় পর্দায় মালকা বানু ও মনু মিয়ার প্রেমকাহিনি আজও বেঁচে আছে মানুষের মুখে মুখে। বাস্তব জীবনের এই দুই চরিত্রকে ঘিরে নির্মিত হয়েছে দুটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র।
একটিতে অভিনয় করেন শাবানা-জাভেদ, অন্যটিতে চম্পা-ইলিয়াস কাঞ্চন।
চট্টগ্রামের লোকজ সংস্কৃতিতে এমন কিছু প্রেমকাহিনি আছে, যেগুলোর আবেদন সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়নি।
নেই তীব্র কোনো বিরহ, নেই রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি কিংবা তোলপাড় করা নাটকীয় পরিণতি। তবু প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে সেই গল্প।
তেমনই এক কাহিনি মালকা বানু ও মনু মিয়ার।
এই প্রেমকাহিনিকে উপজীব্য করে রচিত হয়েছে অসংখ্য লোকগান, পালা ও পুঁথি।
এমনকি গল্পটি জায়গা করে নিয়েছে ঢাকাই সিনেমাতেও। নির্মিত হয়েছে দুটি চলচ্চিত্র- একটি সাদাকালো, অন্যটি রঙিন। দুটিই পেয়েছে দর্শকের ভালোবাসা ও ব্যবসায়িক সাফল্য।
পর্দায় প্রথম ‘মালকা বানু’ শাবানা
মালকা বানু ও মনু মিয়ার কাহিনি প্রথমবার বড় পর্দায় আসে ১৯৭৪ সালে। ১৫ নভেম্বর মুক্তি পায় ফয়েজ চৌধুরী পরিচালিত সাদাকালো চলচ্চিত্র ‘মালকা বানু’।
সিনেমাটির নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী শাবানা। মনু মিয়ার চরিত্রে ছিলেন জাভেদ। মুক্তির পর সিনেমাটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং হয়ে ওঠে সুপারহিট।
সেই সময়ের দর্শকের কাছে মালকা বানু হয়ে ওঠেন লোককাহিনির এক পরিচিত মুখ। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক প্রেমগাথা ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা প্রান্তে।
১৭ বছর পর রঙিন পর্দায় ‘মালকা বানু’
প্রথম চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তার প্রায় দেড় যুগ পর আবারও বড় পর্দায় ফিরে আসে এই প্রেমকাহিনি। ১৯৯১ সালে নির্মিত হয় ‘রঙ্গীন মালকা বানু’।
কামরুজ্জামান পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে মালকা বানুর চরিত্রে অভিনয় করেন চম্পা এবং মনু মিয়ার ভূমিকায় দেখা যায় ইলিয়াস কাঞ্চনকে। রঙিন পর্দায় নতুন প্রজন্মের অভিনেতা-অভিনেত্রীর হাত ধরে গল্পটি আবারও দর্শকদের কাছে পৌঁছে যায়। এই চলচ্চিত্রটিও ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়।
কে ছিলেন মালকা বানু ও মনু মিয়া?
মালকা বানু ও মনু মিয়া নিছক লোককাহিনির কাল্পনিক চরিত্র ছিলেন না। চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও বাঁশখালী এলাকায় এখনো তাদের স্মৃতিচিহ্ন ছড়িয়ে আছে।
গবেষক শামসুল আরেফীনের মতে, এই কাহিনি টিকে থাকার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে রচিত লোকগান ও পালার। বিশেষ করে চট্টগ্রামে বিয়ের অনুষ্ঠানে নারীদের কণ্ঠে দীর্ঘদিন ধরে গাওয়া হয়ে আসছে ‘মালকার গীত’। আর সেই গান থেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্মের মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে মালকা বানু ও মনু মিয়াকে ঘিরে কৌতূহল।
মনু মিয়ার অস্তিত্বেরও রয়েছে দৃশ্যমান প্রমাণ। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার শোলকাটা গ্রামে এখনো রয়েছে তার নির্মিত একটি মসজিদ। অন্যদিকে মালকা বানুর স্মৃতিও ধরে রেখেছে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর সরল ইউনিয়ন। সেখানে রয়েছে মালকা বানুর মসজিদ ও দিঘি।
নদীর ওপারে যেতে চাননি বালিকা মালকা
প্রচলিত নানা কাহিনি অনুযায়ী, মালকা বানু ছিলেন মনু মিয়ার দ্বিতীয় স্ত্রী। তার প্রথম স্ত্রী খোরসা বানুর কোনো সন্তান ছিল না।
কথিত আছে, বালিকা মালকা বানুকে বিয়ে করার পর তাকে নৌকায় করে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন মনু মিয়া। কিন্তু নদীপথে নৌকায় চড়ে যেতে রাজি ছিলেন না মালকা। বালিকার সেই আবদার পূরণ করতে মনু মিয়া নাকি এক অভিনব সিদ্ধান্ত নেন।
প্রমত্তা শঙ্খ নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করে বালিকা মালকাকে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি। কথিত আছে, তার সেই উদ্যোগেই শঙ্খের অপর পারে আনোয়ারায় পৌঁছান মালকা ।
এর আগে আয়োজন করা হয় জমকালো বিয়ের। হীরে, জহরত, মণিমুক্তায় সাজানো হয় বালিকা মালকাকে। সেই বিয়েকে ঘিরে মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে নানা গল্প, আর জন্ম নেয় অসংখ্য গান ও পালা।
‘মালকা বানুর দেশে রে...’
মালকা বানুর কাহিনি নিয়ে রচিত লোকগানের মধ্যে একটি গান আজও চট্টগ্রামের মানুষের কাছে পরিচিত ‘মালকা বানুর দেশে রে, বিয়ার বাইদ্য আল্লা বাজে রে।’
বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে লোকজ আসর- বিভিন্ন আয়োজনে এই গান একসময় ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। গানের সুরে, পালার কথায় আর মানুষের স্মৃতিতে ধীরে ধীরে অমর হয়ে ওঠে মালকা ও মনুর গল্প।
সুখের হয়নি সেই দাম্পত্য
তবে লোকমুখে যে প্রেমকাহিনি এতটা রোমান্টিক, বাস্তব জীবনে সেই দাম্পত্যের পরিণতি ছিল খুব একটা সুখের নয়।
প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, মালকা বানু ও মনু মিয়ার সংসারে কোনো সন্তান জন্ম নেয়নি। পরবর্তী সময়ে মনু মিয়ার মৃত্যু হলে মাল্কা বানু বাবার বাড়িতে ফিরে যান। জীবনের বাকি সময় সেখানেই কাটান তিনি।
বাস্তব জীবনে তাদের সম্পর্কের নানা ঘটনা হয়তো সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে। রয়ে গেছে কেবল কিছু স্মৃতিচিহ্ন, লোকগান আর মানুষের মুখে মুখে ফিরে বেড়ানো গল্প।
লোককাহিনি থেকে সিনেমার পর্দায়
মালকা বানু ও মনু মিয়ার প্রেমকাহিনির সবচেয়ে বড় বিস্ময় সম্ভবত এখানেই- বাস্তব জীবনের একটি সাধারণ প্রেম ও দাম্পত্যের গল্প কীভাবে সময় পেরিয়ে লোককথায় পরিণত হলো।
চট্টগ্রামের বিয়ের আসরে গাওয়া ‘মালকার গীত’ থেকে সেই গল্প পৌঁছেছে পালা ও পুঁথিতে। এরপর ১৯৭৪ সালে শাবানা-জাভেদের হাত ধরে সাদাকালো পর্দায় এবং ১৯৯১ সালে চম্পা-ইলিয়াস কাঞ্চনের অভিনয়ে রঙিন পর্দায় পেয়েছে নতুন জীবন।
মালকা বানু ও মনু মিয়ার জীবনে হয়তো ছিল না রূপকথার মতো পরিণতি। কিন্তু তাদের গল্পের পরিণতি হয়েছে অন্যভাবে- মানুষের স্মৃতিতে, লোকসংস্কৃতিতে এবং বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তারা হয়ে উঠেছেন চিরচেনা দুই নাম।