১৫ দিনের সংকটের পর একদিনের স্বস্তি, আবার গ্যাস নেই!

প্রকাশিতঃ আগস্ট ২০, ২০২৬ | ৫:০৬ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

দীর্ঘ ১৫ দিন গ্যাসের সংকট চলার পর চলতি সপ্তাহের শুরুতে এক দিনের জন্য স্বস্তি পেয়েছিলেন শিল্পকারখানার উদ্যোক্তারা। ভেবেছিলেন, এবার হয়তো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। কিন্তু সেই স্বস্তি টেকেনি। পরদিন থেকেই গ্যাসের চাপ কমতে শুরু করে। গতকাল অনেক কারখানায় গ্যাস ছিল না বললেই চলে। একদিকে গ্যাসের জন্য দিনের পর দিন কারখানা চালাতে না পারা, অন্যদিকে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারার আশঙ্কা—দুই দিক থেকেই চাপে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। উৎপাদন কমে যাওয়ায় লোকসান বাড়ছে, অথচ গ্যাসের সরবরাহ কবে স্বাভাবিক হবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। এবার জানা যাচ্ছে, মেরামতের পর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল গ্যাস সরবরাহের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত থাকলেও সেখানে দেওয়ার মতো এলএনজির কার্গো নেই। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) দাপ্তরিক কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, দীর্ঘ ১৫ দিনের সংকটের পর চলতি সপ্তাহের শুরুতে এক দিন ভালোভাবে গ্যাস পাওয়া গিয়েছিল। দ্বিতীয় দিন থেকেই গ্যাস কমে যায়। গতকাল গ্যাস ছিল না বললেই চলে। বিটিএমএর ১ হাজার ৮০০ সদস্য কারখানায় একই পরিস্থিতি চলছে। গ্যাসের এই অনিশ্চয়তায় শুধু কারখানার উৎপাদনই ব্যাহত হচ্ছে না, ব্যবসায়ীদের অর্ডার নেওয়া ও উৎপাদন পরিকল্পনাও কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশের একটি সুপরিচিত ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং বিভাগের পরিচালক গতকাল পেট্রোবাংলায় গিয়ে গ্যাস-সংকট নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি প্রয়োজনে রেশনিং করে হলেও কারখানাগুলোয় গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখার অনুরোধ করেছেন। নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, হঠাৎ গ্যাসের সংকট দেখা দিলে ব্যবসায়ীদের দ্বিগুণ ক্ষতি হয়। আগে থেকে জানানো হলে তাঁরা সেভাবে অর্ডার নেওয়া ও উৎপাদন পরিকল্পনা সাজাতে পারতেন। গ্যাস-সংকটের এই নতুন পরিস্থিতির পেছনে এবার সামনে এসেছে এলএনজি সরবরাহের সমস্যা। পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মার্কিন মালিকানার এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে সরবরাহ করার মতো এলএনজি কার্গো আপাতত হাতে নেই। ফলে দেশীয় প্রতিষ্ঠান সামিটের টার্মিনাল থেকেই এখন পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এর আগে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের একটি বয়লার অগ্নিকাণ্ডের কারণে বন্ধ থাকায় গ্যাস সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। সেটি চালু করতে পুরো টার্মিনাল ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। পরে পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা জানান, এক্সিলারেট এনার্জির দুটি বয়লারই চালু করা গেছে। অর্থাৎ টার্মিনাল চালুর সক্ষমতা তৈরি হলেও গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না। কারণ, টার্মিনালে দেওয়ার মতো এলএনজি নেই। এলএনজি সরবরাহের এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কেনা কার্গো সময়মতো না আসায়। চলতি আগস্টের শুরুতে নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সরবরাহকারীদের বাইরে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ছয় কার্গো এলএনজি কেনার ক্রয়াদেশ চূড়ান্ত করেছিল সরকার। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসব কার্গো সময়মতো সরবরাহ না হওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সংকট সামাল দিতে গত সোমবার আন্তর্জাতিক খোলা বাজার থেকে আরও পাঁচ কার্গো এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে বিপি সিঙ্গাপুর ২১ দশমিক ৮৭৮ ডলার প্রতি ইউনিট দরে ২৩ ও ২৪ আগস্ট একটি কার্গো এবং ২১ দশমিক ৭৭৮ ডলার দরে ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর আরেকটি কার্গো সরবরাহে রাজি হয়েছে। তবে দরপত্রে চাওয়া বাকি তিন কার্গোর জন্য গ্রহণযোগ্য দরপ্রস্তাব পাওয়া যায়নি। সোমবার রাতে ক্রয় কমিটির বিশেষ বৈঠকে এসব প্রস্তাব অনুমোদন করে অর্থ মন্ত্রণালয়। এতে সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তির সম্ভাবনা তৈরি হলেও শিল্পকারখানার জন্য অনিশ্চয়তা কাটছে না। কারণ, যে কারখানাগুলো প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী উৎপাদন করে, তাদের কাছে গ্যাসের সরবরাহ কখন কমবে বা কখন বাড়বে—তার নিশ্চয়তা নেই। ফলে উৎপাদন বন্ধ রাখা, শ্রমিকদের বসিয়ে রাখা, অর্ডার সময়মতো দিতে না পারা এবং বাড়তি খরচ—সবকিছুর চাপই বাড়ছে। গ্যাস-সংকটের প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরও পড়ছে। কারখানায় উৎপাদন কমলে পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়, উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং ব্যবসায়ীদের বাড়তি ব্যয়ের চাপ পণ্যের দামে গিয়ে পড়ে। একই সঙ্গে শিল্পে অনিশ্চয়তা বাড়লে কর্মসংস্থান ও শ্রমিকদের আয় নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়। এদিকে নিম্নচাপের প্রভাবে সারা দেশে আকাশ মেঘলা ও বৃষ্টিপাত থাকায় বিদ্যুতের চাহিদা কমেছে। ফলে ১৩ হাজার থেকে সাড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেই আপাতত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে। গতকাল দিনের অধিকাংশ সময় লোডশেডিং ৫০০ মেগাওয়াটের কম ছিল বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। ফলে বিদ্যুৎ খাতে আপাতত কিছুটা স্বস্তি থাকলেও শিল্পকারখানার গ্যাস-সংকট কাটেনি। গ্যাসের সরবরাহ কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে জ্বালানি সচিব জিয়াউল হককে জানতে চাইলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ও আরপিজিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। গত ১৫ দিনের সংকটের পর এক দিনের স্বস্তি সাধারণ মানুষের জন্যও আশার কারণ হয়েছিল। কিন্তু সেই স্বস্তি দ্রুতই শেষ হয়েছে। এখন নতুন কার্গো আসার অপেক্ষা। শিল্পকারখানার উৎপাদন, শ্রমিকের আয় এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই গ্যাস-সংকট কবে কাটবে, তার স্পষ্ট উত্তর এখনো নেই। ফলে এক সংকট কাটতে না কাটতেই আরেক সংকট সামনে আসায় ভোগান্তির বোঝা আরও দীর্ঘ হচ্ছে।