ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস।

প্রকাশিতঃ জুলাই ১, ২০২৩ | ৪:৪৮ অপরাহ্ণ
হাফিজ সরকার

আজ ৩০ জুন, একটি স্বাধীন সার্বভৌম সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠার, ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস। ১৬৮ বছর আগে চা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জন্য এদিন হবিগঞ্জের চা বাগানে কর্মরত সাঁওতালরা বিদ্রোহ করেছিল। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন সাওতাল সম্প্রদায়ের চারভাই সিদু-কানহু-চান্দ ও ভাইরোর নেতৃত্বে সর্বাত্বক যুদ্ধ ঘোষণা করে। এ যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সৈন্য ও তাদের দোসর অসৎ ব্যবসায়ী, মুনাফাখোর ও মহাজনদের অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্যাতনের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করা এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা। ভারতের ভাগলপুর, মুর্শিদাবাদ ও বীরভূম জেলার প্রায় দেড় হাজার বর্গমাইল এলাকা দামিন-ই-কোহ্ বা ‘পাহাড়ের ওড়না’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। ভাগলপুরের ভগনা ডিহি গ্রামের সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব এই চার ভাইয়ের নেতৃত্বে দামিন-ই-কোহ্ অঞ্চলে সংঘটিত হয় সাঁওতাল বিদ্রোহ। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন ভগনা ডিহি গ্রামে ৪০০ গ্রামের প্রতিনিধি ১০ হাজার সাঁওতাল কৃষকের বিরাট জমায়েত হয়। এই জমায়েতে সিধু-কানু ভাষণ দেন। এই সভায় সিদ্ধান্ত হয়, অত্যাচারী শোষকদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সবাইকে এক হয়ে লড়তে হবে। এখন থেকে কেউ জমির কোনো খাজনা দেবে না এবং প্রত্যেকেরই যত খুশি জমি চাষ করার স্বাধীনতা থাকবে। আর সাঁওতালদের সব ঋণ এখন বাতিল হবে। তাঁরা মুলুক দখল করে নিজেদের সরকার কায়েম করবে। ১০ হাজার সাঁওতাল কৃষক সেদিন শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েছিলেন। ভগনা ডিহি গ্রামের ওই সভার শপথ ছিল বিদ্রোহের শপথ। বিদ্রোহের মূল দাবি ছিল, ‘জমি চাই, মুক্তি চাই।’ সাঁওতালরাই প্রথম জঙ্গল কেটে বন সাফ করে সাঁওতাল জনপদ গড়ে তোলে। মাটিকে বাসযোগ্য করে তোলার পাশাপাশি তারা এলাকায় চা শিল্প ও কৃষিজ পণ্য ধান, ভুট্টা, নানা ধরনের সবজি আর সোনালী ফসল চাষের গোড়াপত্তন করে। এখনও তারা নিরবচ্ছিন্ন শ্রম দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে চা শিল্প। এই চা জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রেখে চললেও সাঁওতালদের ভাগ্য ফেরেনি আজও। এখনও তারা ৬৯ টাকা দৈনিক মজুরীতে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে। এতে তাদের বেঁচে থাকাটাই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। সম্ভব হচ্ছেনা সন্তানদের লেখাপড়া করানো। আবার কাজ না পেয়ে অনেকেই বেকার জীবন যাপন করছেন। যে ভূমিতে বসবাস করেন তাতে নেই তাদের মালিকানাও। স্বপন সাঁওতাল জানান, সাঁওতালরাই এই উপমহাদেশে পতিত জমি ও জঙ্গল পরিস্কার করে কৃষির প্রচলন করে। ব্রিটিশ আমলে এদেশে যে চা শিল্প গড়ে উঠে তা সাঁওতালদেরই পরিশ্রমের ফসল। কিন্তু কোনসময়ই সাঁওতালরা তাদের অবদানের স্বীকৃতি ও অধিকার পায়নি। আমরা ছিলাম ভারতের উড়িষ্যা প্রদেশের সাঁওতাল পরগনার বাসিন্দা। ভারত বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে যে সাঁওতালরা রয়েছেন তারা অত্যন্ত সহজ সরল। আমরা চাই আমাদের শ্রমের যেন সঠিক মুল্যায়ন হয়। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট, মাধবপুর ও বাহুবল উপজেলার চা বাগানগুলোতে সাঁওতালদের বসবাস। তারা ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহের চেতনা এখনও লালন করে দিবসটি পালন করেন। সাঁওতাল বিদ্রোহের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো ১. ১৮৫৫ খ্রি. ৩০শে জুন প্রায় ত্রিশ হাজার সাঁওতাল কৃষকের বীরভূমের ভগনাডিহি থেকে সমতলভূমির উপর দিয়ে কলিকাতাভিমুখে পদযাত্রা- ভারতের ইতিহাসে এটাই প্রথম গণ পদযাত্রা। ২. ৭ জুলাই দিঘি থানার মহেশলাল দারোগাসহ ১৯ জনকে হত্যার মধ্যে দিয়ে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠে। ৩. ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে জমিদার-মহাজন-সুদখোর ও নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাঁওতাল কৃষকরা সঙ্গে নিয়েছিলেন- কুমার, তেলী, কর্মকার, চামার, ডোম, মোমিন সম্প্রদায়ের গরিব মুসলমান ও গরির হিন্দু জনসাধারণ। ৪. সাঁওতাল বিদ্রোহ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে শুধুমাত্র প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামই নয়- ব্যাপক কৃষক সম্প্রদায়ের দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে, বাঁচার অধিকারের দাবীতে কৃষক সমাজের প্রথম গণসংগ্রাম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ৫. বিদ্রোহকে নির্মুল করার জন্য কোম্পানীর বড় কর্তারা ৩৭শ, ৭ম, ৩১শ রেজিমেণ্ট, হিল রেঞ্জার্স, ৪৩, ৪২ ও ১৩ রেজিমেণ্ট প্রভৃতিকে ব্যবহার করেছিলো। ৬. সাঁওতাল নেতাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য সেদিন কমিশনার প্রধান নায়কের জন্য দশ হাজার টাকা, সহকারী নায়কের প্রত্যেকের জন্য পাঁচ হাজার টাকা এবং বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় নায়কদের জন্য এক হাজার টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করেছিলেন। ৭. ১৮০৪ খ্রি. ১০ নং রেগুলেশনের ৩ ধারা অনুযায়ী ১০ই নভেম্বর, সামরিক আইন জারি করা হয়। ৮. সিদু-কানুকে ষড়যন্ত্র করে ধরিয়ে দেওয়া এবং হত্যার পরই স্তমিত হয়ে পড়ে বিদ্রোহ। এই ইতিহাসখ্যাত আন্দোলনে আদিবাসী সাঁওতাল নারীদের অংশগ্রহণ ছিলো অত্যন্ত স্বতস্ফূর্তভাবে। অধিকার আদায়ের আন্দোলনে আদিবাসী নারীরা ঘরের কোণে লুকিয়ে থাকেনি, তারাও হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলো। ২৩.৭. ১৮৫৫’র Hindu Intelligence পত্রিকাতে এক সাঁওতাল প্রধানের স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার কথা কারণ হিসেবে উল্লেখিত হয়েছে। এ থেকে সাঁওতাল নারীদের উপর প্রচলিত নির্যাতন/সহিংসতার যেমন প্রমাণ মেলে; তেমিন এটি যে বিদ্রোহের পিছনে একটি কারণ ছিলো সেটিও বোঝা যায়। ১. বিদ্রোহে নারীদের অংশগ্রহণ ছিলো প্রত্যক্ষভাবে, পুরুষের সহযোগী বা সশস্ত্র ভূমিকার প্রমাণ মেলে- ‘তাহাদিগের স্ত্রীলোকেরাও অস্ত্র ধরিয়া নিবিড় অরণ্য হইতে বহিস্কৃত হইয়াছে। ২. বারো জন সাঁওতাল পুরুষ ও ১০০ জন নারীর এক দল মহারাজপুর নামক গ্রামে প্রবেশ করে পুরুষরা গ্রামের প্রজাদের প্রহার করতে থাকে এবং স্ত্রীলোকেরা লুটপাট করে। ৩. যানারোহী এক সান্তাল সরদার ঐ দলের সঙ্গে ছিল, গুলি দ্বারা তাহার পঞ্চত্ব লাভ হইয়াছে তাহার মৃত্যুর পরে প্রকাশ যে ঐ সরদার পুরুষ নহে, রমণী পুরুষ বেশে আসিয়াছিল। ৪. সিদু-কানুর বোন ফুলমনির লাশ উদ্ধার করা হয় রেললাইনের ধার থেকে। শোনা যায়, ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের পর ব্রিটিশ সেপাইরা তাকে হত্যা করে সেখানে ফেলে যায়। এই ফুলমনিকে নিয়ে আদিবাসী সাঁওতালদের গান রয়েছে। বিদ্রোহের পরবর্তীকালে ভাগলপুর ও বীরভূমের কিছু অংশ নিয়ে ৫, ৫০০ বর্গ মাইল জুড়ে এবং প্রথমে দেওঘর ও পরে দুমকায় প্রধান কার্যালয় নির্দিষ্ট করে সাঁওতাল পরগণা জেলা গঠিত হয়, সেটি বিদ্রোহ প্রশমনের পর প্রশাসনিক ক্ষেত্রে একটি বিশিষ্ট পরিবর্তন। এই পরগণাকে অনিয়ন্ত্রিত (নন- রেগুলেটেড) একটি জেলা ঘোষণা করা হয়। সাঁওতাল বিদ্রোহের ফলাফল সাঁওতাল জাতির ইতিহাসে সিধো-কানুর নেতৃত্বে সাঁওতাল যুদ্ধই ছিলো সর্বাধিক বৃহত্তম এবং গৌরবের বিষয়। তাদের এই বিদ্রোহই ভারতবর্ষে স্বাধীনতার বীজ বপন করে গিয়েছিল। এই যুদ্ধের ফলাফল হলো এই যে, ইংরেজ সরকার সাঁওতালদের অভিযোগ সম্পর্কে তদন্তের ব্যবস্থা করলেন। ম্যাজিট্রেট এডন সাহেব সাঁওতালদের আবেদন শুনলেন। যুদ্ধের পরে সাঁওতালদের সমস্যা বিবেচনা করে আদিবাসী সাঁওতালদের জন্য একটি জেলা বরাদ্দ করা হলো। এই জেলার নাম হলো ডুমকা। এটাই সাঁওতাল পরগনা নামে পরিচিত। এখানে সাঁওতাল মানঝি্, পরানিক, পরগনা জেলার শাসন পরিচালনার জন্য দারোগা, পুলিশ ও বিভিন্ন সরকারি কমকর্তা-কর্মচারী ক্ষমতা প্রাপ্ত হলো। সাঁওতালদের বিচার সালিশ তাদের আইনে করার জন্য সরকার ক্ষমতা প্রদান করলেন। খাজনা, কর প্রভৃতি তাদের হাতে অর্পণ করা হলো। তারা জেলা প্রশাসক বা ডিসির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতে থাকলো। ১৮৮৫ সালে বেঙ্গল টেনান্সি এ্যাক্ট অনুযায়ী আদিবাসীরা তাদের জমি সরকারি অনুমতি ছাড়া বিক্রি করতে পারতো না। এই আইন এখন পর্যন্ত কার্যকর আছে। গতকাল গেল হুল দিবস। নানা জায়গায় বিশেষত আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে সরকারের বিভিন্ন পৃষ্ঠোপোশকতায় পালিত হচ্ছে সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৬৮ বছর পূর্তি। ব্রিটিশ ভারত থেকে কাগজে কলমে বিদায় নিয়েছে ৭৬ বছর। এক সময়ের পূর্ব পাকিস্থান ৫২ বছর হ\'ল স্বাধীন বাংলাদেশ। অথচ এই উপমহাদেশে আদিবাসীদের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। বস্তার থেকে মালকানগিড়ি সাম্রাজ্যবাদের মদতপুষ্ঠ বেনিয়া পুঁজিপতিদের হাতে লুন্ঠন হচ্ছে ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদ। সেখানকার হাজার হাজার বছরের অধিবাসীদের উচ্ছেদ করে গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশেও চলছে একই কাণ্ড। এখানকার গাইবান্দা সাহেবগঞ্জের ২০১৬ সালের নভেম্বর মাস থেকে চিনি কলের নামে উচ্ছেদ ও হত্যার ঘটনা সবার জানা। কাজেই শুধু হুল দিবসে সাঁওতাল বিদ্রোহের স্মৃতিচারণা নয়, আজকের সংগ্রামরত আদিবাসী জনতার সংগ্রামের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে দিয়েই প্রকৃত সিধু- কানু- তিলকা মাঝির আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধা জানানো হবে।