ঢাকাবাসীর মলমূত্রে যে পয়ঃবর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে তার বেশিরভাগই যাচ্ছে আশপাশের নদী ও খালবিলে। নিরুপায় হয়ে পয়ঃবর্জ্যের পাইপে কলাগাছ ঢুকিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে ঢাকা উত্তর সিটি এলাকায়। রাজধানীর যখন এ অবস্থা, তখন উত্তরের জনপদ নীলফামারীর সৈয়দপুরে দেখা গেছে অন্যরকম এক চিত্র। মানববর্জ্য সেখানে হয়ে উঠেছে সম্পদ। বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে নিরাপদ জৈব সার। এ সারে কৃষিতে ফলছে সোনা। শুধু সৈয়দপুর নয়; টাঙ্গাইলের সখীপুরেও মানববর্জ্য থেকে নিরাপদ জৈব উপাদানসমৃদ্ধ সার তৈরি হচ্ছে। এ পদ্ধতি দেশের অন্য সব পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
শিল্পে সমৃদ্ধ ঘন বসতিপূর্ণ প্রথম শ্রেণির সৈয়দপুর পৌরসভা। নীলফামারীর এ শহরে কয়েক বছর আগে রাস্তায় বর্জ্যের দুর্গন্ধে টেকা যেত না। সমন্বিত স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও পরিচ্ছন্ন শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে সৈয়দপুর পৌরসভা ওয়াটার এইড বাংলাদেশের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা নিয়ে ২০১৮ সাল থেকে পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার স্থাপনের কাজ শুরু করে। ২০২১ সাল থেকে পয়ঃবর্জ্য শোধন শুরু হয়।
গত মঙ্গলবার সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পৌরসভার ১৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটি পাড়া-মহল্লার বাড়ি থেকে গৃহস্থালি ও মানববর্জ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পয়ঃবর্জ্য খালি করতে পৌরসভায় লিখিত আবেদন করলেই বাসার সামনে চলে যায় বিশাল ট্যাঙ্কিসহ গাড়ি। ৩৩ হাজার পরিবার ও ৬টি হাট-বাজারের মানববর্জ্য গাড়িতে সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেগুলো নেওয়া হয় শহরের সুরকী মহল্লার শোধনাগারে। ১৭০ শতক জমির ওপর গড়ে ওঠা ফেইকাল স্ল্যাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে ৫টি ধাপের মাধ্যমে কো-কম্পোজ জৈব সারে রূপান্তরিত করা হয়।
এখন কৃষকদের মাঝে বিক্রি হচ্ছে এই সার। বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করে জাতীয় পদক পাওয়া সৈয়দপুরের কৃষি উদ্যোক্তা আহসানুল হক বাবু তাঁর ড্রাগন ফলের বাগানসহ অন্যান্য খামারে ব্যবহার করছেন এ সার। ফলনও পাচ্ছেন ভালো। তিনি এ পর্যন্ত আড়াই টন সার কিনেছেন।
ওয়াটার এইডের প্রোগ্রাম অফিসার ইঞ্জিনিয়ার মো. শাখাওয়াত হোসাইন বলেন, সৈয়দপুর পৌরবাসীর কঠিন বর্জ্য ও মল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি সমন্বিত উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থার শহর গড়ে তোলার জন্য আমরা কাজ করছি। সেসঙ্গে সৈয়দপুর পৌরসভাকে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি। যাতে করে পৌরসভা অন্তর্ভুক্তিমূলক স্যানিটেশন ব্যবস্থানায় এগিয়ে যায়। সৈয়দপুর ও সখীপুর একটি মডেল। সরকার এই মডেল সব পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে ব্যবহার করতে পারে।
এ সার ব্যবহারে মাঠপর্যায়ে সচেতনতামূলক কাজ করছে সমাজ কল্যাণ সংস্থা (এসকেএস) ফাউন্ডেশন। সংস্থার প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর নজরুল ইসলাম তপাদার বলেন, এই সার সৈয়দপুরের ১৩২টি পারিবারিক পুষ্টিবাগান ও ৭৪ জন কৃষক ব্যবহার করছেন। বছরে এ প্লান্ট থেকে ৩৭৯ টন সার উৎপাদন সম্ভব। এখন পর্যন্ত ৩৫ টন সার উৎপাদন হয়েছে, এর মধ্যে প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে ২৯ টন।
সৈয়দপুর পৌর মেয়র রাফিকা আক্তার জাহান বলেন, ঢাকার মানুষ টয়লেট ফ্লাস করার পর হয়তো জানে না যে তাদের পয়ঃবর্জ্য কোথায় যাচ্ছে। কিন্তু সৈয়দপুরের মানুষ জানে তাঁদের পয়ঃবর্জ্য ট্যাঙ্ক থেকে প্লান্টে গিয়ে সার উৎপাদন হচ্ছে।
একইভাবে টাঙ্গাইলের সখীপুর পৌরসভায় কো-কম্পোস্ট প্লান্ট তৈরি করে মানববর্জ্য থেকে তৈরি করছে জৈব সার। ওয়াটার এইড বাংলাদেশের সহায়তায় ওই প্লান্ট থেকে বছরে উৎপাদন হচ্ছে ২৪ টন। এই সারের নাম দেওয়া হয়েছে ‘সখী কম্পোস্ট’। পৌরসভার ৫৮ শতাংশ মানববর্জ্য নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) গবেষণায় জানিয়েছে, এ জৈব সারে কোনো ক্ষতিকারক জীবাণু নেই, বরং কৃষিজমিতে পুষ্টিগুণ বেড়েছে। উৎপাদনও লাভজনক। জমিতে ব্যবহার করলে মাটি বিষাক্ত হয় না। মাটির গুণ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম বলেন, বর্জ্য নিয়ে সভ্য দুনিয়ায় এখন দুটি কথা খুব চালু আছে। প্রথমটি, ‘আজকের বর্জ্য আগামীকালের সম্পদ’। দ্বিতীয়টি, ‘আবর্জনাই নগদ অর্থ’। সৈয়দপুর ও সখীপুরে তৈরি সার সম্পূর্ণ প্যাথোজেনমুক্ত বলে তা পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে এমন পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে।
ঢাকাও এ পথে হাঁটতে পারে : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের একটি গবেষণায় জানান, একজন ব্যক্তি দৈনিক ৯১ লিটার পয়ঃবর্জ্য নিঃসরণ করেন। ঢাকা ওয়াসার আওতাধীন জনসংখ্যা ১ কোটি হিসাবে রাজধানীতে দৈনিক ৯১০ মিলিয়ন লিটার পয়ঃবর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং বাসাবাড়িতে সেপটিক ট্যাঙ্ক না থাকায় দৈনিক ৯০০ মিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য সরাসরি মিঠাপানির উৎসে চলে যায়।
ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, খালের দায়িত্ব নিয়েই দেখেছি, দূষিত পানি প্রথমে নালা, পরে খালে ও নদীতে মিশে দূষিত করছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবাইকে নিয়ে সামাজিক আন্দোলন করছি। বাসাবাড়ি থেকেই এটা শুরু করতে হবে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে পয়ঃবর্জ্য সঠিক ব্যবস্থাপনায় কাজ করা হবে।