ভূমিকম্পের প্রস্তুতি কতদূর

প্রকাশিতঃ মার্চ ৪, ২০২৩ | ৫:৩২ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

তুরস্কের ভয়াবহ ভূমিকম্প নাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশকে। যে কোনো সময় প্রাকৃতিক এ দুর্যোগটির আঘাতের শঙ্কা থাকলেও মোকাবিলায় নেই প্রস্তুতি। সরকারি তরফে ‘মোটামুটি প্রস্তুত’ বলা হলেও, কিতাবের সেই ‘কাজির গরু’ বাস্তবে খুঁজে পাওয়া যায়নি। যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাও লেজেগোবরে। জোড়াতালি দিয়ে চলছে ঘূর্ণিঝড় গবেষণা কেন্দ্র। যন্ত্রপাতি থাকলেও ব্যবহার না করায় অকেজো হয়ে পড়ছে। দুর্যোগে উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য জরুরি পরিচালন কেন্দ্র তৈরি হলেও জনবল নিয়োগ হয়নি। ঢাকায় ৬ লাখ ভবনের ৬৬ শতাংশই নিয়ম মেনে হয়নি, নতুন ভবনগুলোতেও উপেক্ষিত নীতিমালা। দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না বিল্ডিং কোড। এ অবস্থায় ভূতত্ত্ব ও নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করছেন, শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানলে বাংলাদেশে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি তুরস্ককেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। এজন্য পরিকল্পিতভাবে ভবন তৈরির পাশাপাশি প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। ভূমিকম্প গবেষণা কেন্দ্র চলছে জোড়াতালি দিয়ে : গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মিনায়নমারে সৃষ্ট ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে কক্সবাজার। ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ইলেকট্রনিক অ্যাসিস্ট্যান্ট জসিম উদ্দিনের বরাত দিয়ে এ সংবাদ বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করে। তৃতীয় শ্রেণির এক কর্মচারীর দেওয়া তথ্য কেন সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করেছে, তা খুঁজতে সরেজমিন রাজধানীর আগারগাঁও আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে অচলাবস্থা। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংস্থাটির ১০টি ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র আছে। সারাদেশ থেকে পাওয়া তথ্য পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার জন্য ঢাকা কার্যালয়ে দায়িত্বে মাত্র একজন আবহাওয়াবিদ ও একজন সহকারী আবহাওয়াবিদ। তবে দু’জন সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। এ জন্য মাঝেমধ্যে তথ্য সরবরাহ করেন ইলেকট্রনিক অ্যাসিস্ট্যান্ট, অফিস সহকারী বা ওয়্যারলেস অপারেটরের মতো তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক আজিজুর রহমান জানান, সারাদেশে তাঁদের ১ হাজার ১৯২ জনবল থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ৭০০ জন। এজন্য রাতদিন কাজ করেও মাঝেমধ্যে সমস্যায় পড়তে হয়। সরঞ্জাম আছে, জনবল নেই : দুর্যোগে উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য রাজধানীর গুলশান ২ নম্বরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন কার্যালয়, অর্থাৎ নগর ভবনের দ্বিতীয় তলায় প্রায় ২০ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে আরবান রিজিলিয়েন্স প্রকল্পের আওতায় জরুরি পরিচালন কেন্দ্র (ইওসি) করা হয়েছে। উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম গত বছর ৩১ অক্টোবর এটি উদ্বোধন করেন। তবে এখন পর্যন্ত জনবল নিয়োগ হয়নি। সেন্টারের জন্য কেনা ১৯টি ভিন্ন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় ৮৭ ধরনের সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ পরিচালনায় ৯ জন থাকার কথা, বাস্তবে কেউই নেই। প্রকল্পের পরিচালক আরিফুর রহমান বলেন, প্রাথমিক কাজ চালিয়ে নিতে সিটি করপোরেশনের তথ্যপ্রযুক্তি ও পরিকল্পনা বিভাগের কর্মীদের যুক্ত করা হয়েছে। মূল জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। এদিকে, সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর উদ্ধার কার্যক্রমে যেসব সরঞ্জাম কেনা হয়েছিল, তাও ব্যবহার না করায় অকেজো হতে বসেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, সরকার বিভিন্ন সময় ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীকে প্রচুর সরঞ্জাম কিনে দিয়েছে। আমি এবং প্রয়াত অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী এ ধরনের বিভিন্ন কমিটিতে কাজ করেছি। অন্তত ২০০ কোটি টাকার সরঞ্জাম বিভিন্ন কমিটিকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যবহার না হওয়ায় সেসব নষ্ট হওয়ার পথে। তিনি আরও বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর প্রস্তুতি কিছুটা ভালো হয়েছিল। সে সময় অনেক সরঞ্জাম কেনা, সেগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু বিগত ১০ বছরে বড় কোনো দুর্যোগ না হওয়ায় আমরা প্রায়ই ভুলে গেছি। শুধু ভূমিকম্প নিয়ে সরকারের একটি আলাদা প্রতিষ্ঠান থাকা উচিত বলে মনে করেন এ অধ্যাপক। সংগঠন ‘মৃত’ : ২০০১ সালে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীকে সভাপতি ও অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারীকে মহাসচিব করে প্রতিষ্ঠা হয় বাংলাদেশ ভূমিকম্প সোসাইটি। সংগঠনটি ভূমিকম্প নিয়ে নানা গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও সভা-সেমিনার করে। কিন্তু ২০১৫ সালে হঠাৎ এক যুগ্ম সচিব দায়িত্ব নেন। পরে তিনি সংগঠনের মহাসচিবও হন। ওই যুগ্ম সচিব এখন অবসরে। সংগঠনটিরও নেই কোনো হদিস। অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, সংগঠনটি ভালোভাবেই চলছিল। কিন্তু এখন এটি মৃত। প্রতিশ্রুতি-পরিকল্পনা থাকলেও অগ্রগতি নেই : ২০১৫ সালে নেপালে ভূমিকম্পের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিলের বৈঠকে ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। পরে চীনের সহায়তায় ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার কাজ চলছে ধীরে। এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান বলেন, সেন্টারটি নির্মাণে চীনের সঙ্গে ২০১৬ সালে চুক্তি হয়। কিন্তু এটি নির্মাণে আমাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ যেমন গতিহীন, চীনা কর্তৃপক্ষও তেমনি স্থবির। বারবার চিঠি দেওয়ার পরও তারা সাড়া দেয় একটু একটু করে। ব্যক্তি মালিকানাধীন ভবন চিহ্নিত করতে পারেনি রাজউক : ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৯ সালে আরবান রিজিলিয়েন্স প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। উদ্দেশ্য ছিল, রাজধানীর বর্তমান ভবনগুলো ভূমিকম্প সহনশীল কিনা তা অত্যাধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা করা, মাটির গুণগত মান পরীক্ষা করে ভবন নির্মাণের অনুমোদন, ব্যত্যয় রোধে ভবন নির্মাণের নকশা অনলাইনে প্রকাশ, ভূমিকম্প বিষয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ, বিল্ডিং কোড অনুযায়ী বাড়ি নির্মাণে বাধ্য এবং ভবন নির্মাণ সংশ্লিষ্ট সব উপকরণ পরীক্ষার জন্য রিসার্চ ট্রেনিং টেস্টিং ল্যাবলেটরি স্থাপন করা। এ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও রাজউকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আবদুল লতিফ হেলালী বলেন, চলতি বছরের অক্টোবরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। প্রকল্পের দ্বিতীয় ফেজ (পর্যায়) দরকার। তিনি আরও বলেন, রাজধানীতে ভূমিকম্পে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের একটি তালিকা করা হয়েছে। প্রাথমিক সমীক্ষায় স্কুল-কলেজ, হাসপাতালসহ সরকারি ৩ হাজার ২৫২টি ভবন চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ৫৭৯টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এবং ২২টি ভবন ভেঙে ফেলতে হবে। ২২৯টি ভবন সংস্কার করে ভূমিকম্প সহনশীল উপযোগী করতে হবে। তবে এখনও রাজধানীর ব্যক্তি মালিকানাধীন ভবন চিহ্নিত করার কাজ শুরু করা যায়নি। প্রকল্পের দ্বিতীয় ফেজে এটি করা হবে। ৯০ শতাংশ ভবনের সমীক্ষা এখনও বাকি। বিশ্বব্যাংকের কাছে দ্বিতীয় ফেজের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এটি অনুমোদিত হলে আগামী অক্টোবর থেকে ভূমিকম্পে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবনের সমীক্ষা শুরু হবে। রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন) উজ্জ্বল মল্লিক জানান, ভবনগুলো বিল্ডিং কোড মেনে নির্মাণ করা হচ্ছে কিনা, তা তদারকির মতো জনবল তাদের নেই। বিষয়টি তদারকিতে বিল্ডিং রেগুলেশন অথরিটি হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। বুয়েট শিক্ষক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, বাংলাদেশে ভূমিকম্প সহনশীলতা বিষয়ে নজরদারির জন্য যেসব সংস্থা রয়েছে, তাদের সক্ষমতা কম। এ জন্য প্রয়োজনে আউটসোর্স বা দেশের প্রচলিত ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মের মাধ্যমে ভবনগুলোর সহনশীলতা পরীক্ষা করিয়ে সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যদিও রাজউক এতে আগ্রহী নয়। তারা আসলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেন, আমাদের উদ্ধারকারীরা তুরস্কে কাজ করছেন। ভূমিকম্প-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক জোটে যোগ দিচ্ছি, যাতে আমরাও সবার সহযোগিতা পাই। উদ্ধার তৎপরতায় সিটি করপোরেশনগুলোকে পৃথক অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। এসব অঞ্চলে ৩৬ হাজার প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য ২০১৯ সালে ২২০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়। জুনের মধ্যে আরও যন্ত্রপাতি আসবে। অনুসন্ধান, উদ্ধারকাজ ও দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রম শক্তিশালী করতে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।