সারা দিনের কষ্ট দূর হয়ে যায় লুং ফির ভাকে দেখে - ডোনেট বাংলাদেশ

পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সৌন্দর্য। আরও বেশি সৌন্দর্য, পাহাড়ের পেটে ঝরা ঝর্ণায়। চোখ ধাঁধানো, মন জুড়ানো। এ পথের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ঘুরে বেড়িয়েছি পুরো পাঁচ দিন। হেঁটেছি বান্দরবানের থানচি থেকে রুমা উপজেলার দুর্গম সব পাহাড়ে। দেখেছি, ছয়টি ঝর্ণার মায়াবী রূপ। পাহাড়ের চূড়ায় বসবাস করা পাহাড়িদের জীবনাচরণ দেখেছি, শুনেছি তাদের টিকে থাকার গল্প।

তবে পাহাড়ি এ পথ অনেক কঠিন। যদিও তারচেয়ে বেশি নান্দনিক। জীবনের ভয়ংকর ও রোমাঞ্চকর সময়গুলো নিয়ে এ লেখা। আজ থাকছে যার দ্বিতীয় পর্ব। চলুন, পাহাড় অভিযানের দ্বিতীয় দিন শনিবারের শুরু থেকে হেঁটে আসি।

বাকত্লাই পাড়া। নানা উৎকণ্ঠা পেরিয়ে আমরা আরামের ঘুমে। অপেক্ষা, সকাল হওয়ার। অপেক্ষা, পাহাড় টপকে আনন্দ গ্রহণের। তখন ভোর ৫টা। গাইড জোরেসোরে ডাক দিয়ে বললেন, ‘উঠে খেয়ে নিন। বের হতে হবে। আজ সারাদিন হাঁটতে হবে।’

আমরাও জানি, আজ উঁচু-নিচু মেলা পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হবে। ফলে চোখ মুছতে মুছতে উঠে বসলাম। দাঁত মেজে প্রস্তুত হলাম। সকালের নাস্তায় পাহাড়ি সবজি আর ডিম খিচুড়ি, দারুণ। পাহাড়িরা টাকার বিনিময়ে হলেও অতিথি পরায়ণ।

খাওয়া শেষে গোছগাছের পালা। কাছে থাকা থলের ওজন অনেক। পুরো পাঁচ দিনের মুখরোচক খাবার আর কাপড়চোপড়ে ভর্তি। গোছাতে গোছাতে এক সহযাত্রী বলে বসলেন, ‘আমি গেলে আপনাদের পাহাড়ি অভিযানে ঝামেলা হবে। আমার অবস্থা ভালো না। পাহাড়ে ওঠলে বুক দুরুদুরু করে, হৃদকম্পন হয়। অনেক গহিনে ঢুকে হাঁটতে না পারলে বিপদ। পরে আমাকে ফিরিয়ে আনবে কে?’

তাঁর কথায় যুক্তি ছিল। দুর্গম পাহাড়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে লোকালয়ে ফেরত পাঠানো মুশকিল। টিম মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হলো, একটি গ্রুপ শুধু বাকত্লাই ঝর্ণা দেখতে এসেছে। তারা বাকত্লাই দেখে ঢাকায় ফিরবে। তাঁকে ওই গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত করে ঢাকায় পাঠানো হবে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলো।

গোছগাছ শেষে ফিরোজা রঙের জামা-প্যান্ট আর অ্যাংলেট-নিক্যাপ পরেছি। হাতে পাহাড়ি বাঁশের লাঠি। এ লাঠিকে সঙ্গী করে থানচি ও রুমা উপজেলার অনেক পাহাড়ি পথ অতিক্রম করতে হবে। যাই হোক, একজন অনুত্তীর্ণ হলেও আমরা সাতজন সব ধরনের ঝুঁকি মেনে দুর্গম পাহাড়ে যেতে প্রস্তুত।

পাড়ার একটি দোকানে চা পান শেষে রওনা দেওয়ার পালা। সারিতে দাঁড়িয়ে সবাই ছবি তুললাম। পায়ের জন্য চিন্তা হচ্ছে, আজ কয়েকটি পাহাড় টপকাতে হবে। আর গল্প কিংবা সময়ক্ষেপণ নয়, এবার রওনা দিব। শনিবার, সকাল সাড়ে ৭টা। যাত্রার শুরুতে ফেসবুকে লিখে দিলাম, ‘পুরোপুরি নেটওয়ার্কের বাইরে যাচ্ছি! ফি আমানিল্লাহ।’

বাকত্লাই পাড়াটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উপরে। সেখানে থেকে আমাদের অভিযান শুরু। গাইড সামনে, তিনি পাহাড়ের উপর ওঠছেন তো ওঠছেনই। পেছনে আমরাও। গাইড জানিয়ে দিলেন, তাঁর নির্দেশ শিরোধার্য। মিনিট ত্রিশের মতো ওঠছি পাহাড়ে। পা লেগে গেছে সবার। মনে হচ্ছিল, কেউ নিচে থেকে পা টেনে ধরেছে। এদিকে রাতে বৃষ্টির পর পথ বেশ পিচ্ছিল। আছে জোঁকের কামড়। এভাবে এক সময় পাহাড়ের চূড়াতে ওঠে মনে হচ্ছিল, মেঘ আমাদের অনেক নিচে! চোখ ধাঁধানো দৃশ্য।

এবার পাহাড় থেকে নামার পালা। নিচে নামছি। সামনে বাঁশের লাঠি ভর দিয়ে অনেক সময় নামছি। খাড়া পাহাড়। বারবার মনে হচ্ছিল, একবার পড়ে গেলেই জীবন শেষ! এভাবে ঘণ্টারও বেশি সময় নিচের দিকে নামছি। যেন পথ শেষই হচ্ছে না। হাঁটতে হাঁটতে আমিসহ দুজনের পা পিছলে গেল। মনে হচ্ছিল, এই বোধহয় শেষবারের মতো নিশ্বাস নেওয়া!

গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এদিকে সবার কাছে থাকা পানিও শেষ। শরীর ক্লান্ত, পিপাষিত। নিচে নামছি। এমন সময় দুজন পাহাড়ি যুবকের সঙ্গে দেখা। আমাদের দেখে চোখ-মুখ বড় করে বলে উঠলেন, ‘পাহাড়িদের দেখে সাইড দিবেন।’ সালাম দিলাম, তাঁরা চলে গেলেন।

সকাল সাড়ে ৯টা। একটি পাড়া চোখে পড়ল। নাম লুয়াং মুয়াল পাড়া। এখানে পৌঁছে আগেই পাড়ার পানির পাইপে গলা ভেজালাম। মনে হলো, মন ভেজালাম। জুতা খুলে দেখি, পা রক্তাক্ত! কয়েকটি জোঁক আরামে রক্ত খাচ্ছে। গাইড আমাদের একটি ঘরের বারান্দায় বসতে দিলেন। একটি বানর ছিল সেখানে। বিশাল বড় কাঠের ঘর। সবাই বারান্দায় বসে থাকলেও আমি গেলাম ঘরের ভেতরে। বাড়ির সদস্যদের সঙ্গে কথা বললাম। তাঁরা জানালেন, এ পাড়ায় ৪৬টি পরিবার আছে। ২১০ জনের মতো বাসিন্দা হবে সব মিলিয়ে। আমাদের সেদ্ধ ভুট্টা খেতে দেওয়া হয়। ভালোই লাগল। আতিথেয়তা দেখানো লোকজনের দাবি, পাহাড়ে ওঠার সময় শক্তিবর্ধক হিসেবে সেদ্ধ ভুট্টা বেশ কাজের।

তখন সকাল প্রায় সাড়ে ১০টা। আবার প্রস্তুত হয়ে শুরু হয় হাঁটাহাঁটি। ঘণ্টা খানিকের দূরত্ব মাড়িয়ে এক পাহাড় টপকে আরেকটি পাড়ার দেখা মিলল। পাড়ার নাম ফাইনুয়াম। আগেই গাইড জানিয়ে দিলেন, ‘এ পাড়ার মধ্যে দিয়ে হাঁটার সময় কোনোদিকে না তাকাতে। কোনো শব্দ না করতে। ওঁরা আরাকান বাহিনীকে খবর দিতে পারে।’

গাইড আমাদের অপেক্ষায় রেখে পাড়ার মধ্যে আগে ঢুকলেন। হাত ইশারা করার পর আমরাও ঢুকলাম। চুপচাপ হেঁটে গেলাম। আমি অবশ্য গোপনে গোপনে পাড়াটি দেখার চেষ্টা করলাম। তাদের বাড়িঘরগুলো দারুণ। এক পোশাকহীন বৃদ্ধাকে দেখা গেল। চোখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে দেখি, অধিংকাশ ঘর থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে এ পাড়ার বাসিন্দারা।

ফাইনুয়াম পাড়া অতিক্রম করে আরেকটি পাহাড়ে ওঠলাম। এ পাহাড় উঠে আমাদের সবার শারীরিক অবস্থা কাহিল। বিশেষ করে রনী ভাই আর হাঁটতে পারছিলেন না। ১০-২০ কদম ওঠে থেমে যাচ্ছিলেন। পানি, খেঁজুর, বাদাম ও ম্যাঙ্গোবার খাচ্ছেন আর একটু একটু করে হাঁটছেন। বাকিরা সামনে চলে গেছেন। আমি আর সামনে আগাই না। রনী ভাইয়ের পেছনেই আছি, যদি কিছু ঘটে যায়!

গাইড বারবার জানাচ্ছেন, এভাবে হাঁটা যাবে না। দ্রুত হাঁটতে হবে। নতুবা ‘লুং ফির ভা সাইতার’ দেখে সালৌপি পাড়ায় পৌঁছাতে আমাদের রাত হবে। কিন্তু, সময় যত গড়াতে থাকে রনী ভাই তত অসুস্থ হতে থাকেন। মনে হচ্ছিল আমাদের কিছু যেন করার নেই। একটু পরপরই বসতে হচ্ছে। একটা সময় কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে রনী ভাই পাহাড়ের মাটিতেই পা মেলে শুয়ে পড়েন। আমার ভয় বাড়তে লাগল। এখন কী হবে, রনী ভাইকে কীভাবে নেব পুরো পাঁচদিনের হাঁটা পথে? আশপাশে কোনো মানুষজন নেই। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন দিতে হয় কি না! এদিকে মুঠোফোনে নেটওয়ার্কও নেই।

কোনো পথ না দেখে আমরা বিশ্রাম নিচ্ছি। রনী ভাই মিটমিট করে তাকানো শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে আমরা অনেকটা পথ অতিক্রম করে ফেলেছি। ভাইকে ডাক দিয়ে বললাম, ‘কোনো অসুবিধা?’ ভাই বললেন, ‘এখন হাঁটতে পারব।’ অথচ তিনি অসুস্থ! যতবার জানতে চেয়েছি সমস্যা হচ্ছে কি না, ততবার তিনি বলেছেন, ‘আর অসুবিধা হবে না। এখন পারব!’

রনী ভাইয়ের কথা শুনি আর আত্মবিশ্বাস বাড়ে। উনি ভ্রমণ পিপাসু মানুষ। ভাইয়ের বারবার পানির প্রয়োজন হচ্ছে। আমার সঙ্গে দুই লিটার পানি। দেড় লিটারেরও বেশি পানি শেষ। আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কিন্তু, পানি খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি আগেই। হঠাৎ যদি রনী ভাই পানি চেয়ে বসেন, কোথা থেকে দেব? পানি পেতে হলে আরও অনেক হাঁটতে হবে। এসব চিন্তা করি আর জানতে চাই, ‘রনী ভাই সব ঠিকঠাক তো?’

রনী ভাই বারবার বলছেন, তিনি ঠিক আছেন। কিন্তু তাঁর শরীর সে কথা বলছে না। ভাইয়ের কাছে থাকা ব্যাগের ওজন ১০ কেজিরও বেশি। এ ব্যাগের কারণে আরও বেশি ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে তাঁকে। আমাদের সঙ্গী রুবেল ভাই। চলঘুরি বাংলাদেশ টিমের অ্যাডমিন। তিনি রনী ভাইকে স্বস্তি দিতে ভাইয়ের ব্যাগটি কাঁধে নিলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর আমরা আবার হাঁটা শুরু করেছি। কিন্তু, দুটি ব্যাগ নিয়ে তিনি কিছুক্ষণ পরই ক্লান্ত হয়ে পড়েন।

কোনো উপায় না পেয়ে এবার ব্যাগটি আমি নিলাম। আমার ব্যাগের ওজনও অনেক। আমার বুকে একটি, পিঠে আরেকটি ব্যাগ নিয়ে দুটি বড় পাহাড় টপকালাম। এরপর বাধ্য হয়ে রনী ভাইয়ের ব্যাগ থেকে কিছু কাপড়-চোপড় ফেলে দিলাম। কিছু জিনিস বের করে নিলাম আমার ব্যাগে। রনী ভাইও ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। ভার কমার পর তিনি নিজের কাঁধে নিলেন ব্যাগটি। আমরা এভাবে আমরা হাঁটছি, পাহাড় টপকাচ্ছি।

এবার আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি। গাইড অন্য একজন পাহাড়িকে পেয়ে পরামর্শ নিলেন। তারপর আমরা একটি পাহাড়ের নিচে নেমে রেমাক্রি খালের দেখা পেলাম। এ খাল বেয়ে হেঁটে চলেছি। কী এক আঁকাবাঁকা ঝিরির পথ। হাঁটতে ভয় করছিল। ঝিরিতে থাকা পাথরগুলো বড্ড পিচ্ছিল। সেখানে কেউ নামতে না চাইলেও আমি নেমে স্নান করলাম। পানি খেলাম। সবাই বোতলে পানি ভরে নিলাম। ভীষণ স্রোত। এরপর ঝুটপাট গুছিয়ে আবার ঝিরিপথ ঘেঁসে পথচলা শুরু করলাম।

কিছুদূর যাওয়ার পর জানা গেল, লুং ফির ভাতে যেতে হলে আবার পাহাড় টপকাতে হবে। খালেও প্রচণ্ড স্রোত। পানি হাঁটু সমান হলেও একা একা নামতে সাহস পাচ্ছিলাম না কেউ। ফলে সবাই হাতে হাত রেখে খালটি পাড়ি দিলাম। খালটি পাহাড়ের অনেক নিচে অবস্থিত। সেখান থেকে আরেকটি বিশাল পাহাড় টপকালাম। এই পাহাড়ে ওঠছি, তো ওঠছিই! যেন পথ শেষই হচ্ছে না। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছিল। চূড়া থেকে নিচে নামতে আরও এক ঘণ্টাও বেশি সময় লাগে।

হাঁটতে হাঁটতে একটি জুম ঘরের দেখা পেলাম। গাইড জানালেন, এখানে ব্যাগ রেখে যেতে। কাছেই ঝর্ণা। কয়েকটি জুমের ধান ক্ষেত পেরিয়ে এবার খাঁড়া পাহাড় থেকে নামার পালা। পাহাড়টি থেকে যখন নিচে নামতে শুরু করি তখন সবার ভয় ধরেছিল মনে। গাছ ধরে ধরে নিচে নামতে হচ্ছিল। এভাবে নিচ পর্যন্ত নামতে নামতে সবাই ক্লান্ত হয়ে ওঠি। এখন দুপুর আড়াইটা বাজে। সকাল থেকে মোট সাত ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে এ পর্যন্ত আসতে।

অনেক ওপর থেকে লুং ফির ভা ঝর্ণার পানি পড়ার শাঁ শাঁ শব্দ হচ্ছে। আমরা এখন আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত বিশাল লুং ফির ভা সাইতারের নিচে। চারিদিকে উঁচু উঁচু পাহাড়। কাছাকাছি দুটি মুখ দিয়ে ঝর্ণার পানি বিশাল অংশ জুড়ে নানা ধাপ পেরিয়ে নিচে পড়ছিল। নিচে পড়ছিল মানে, আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে পড়ছিল। সেখান থেকে ঝর্ণাটি পাহাড় বেয়ে আরও অনেক নিচের দিকে নামছে। কত নিচে নামছে, তা দেখার চেষ্টা করেও দেখতে পারিনি। ঝর্ণার পানির ফাঁকে ফাঁকে সবুজ-শ্যামল গাছপালা। এ দৃশ্যে নিমিষেই আমাদের ক্লান্ত শরীর হয়ে ওঠে ফুরফুরে। এ এক অদ্ভুত সুন্দর মায়াবী ঝর্ণা!

এ দৃশ্য হৃদয়জুড়ে থাকবে আজীবন। ছবি তুললাম। ভিডিও করলাম। এভাবে আধা ঘণ্টার মতো আমরা লুং ফির ভা ঝর্ণার নিচে কাটালাম। ঝর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, ওপর থেকে পানির ফোটা পড়ছিল শরীরে। কিছুক্ষণ পর শুরু হয় বৃষ্টি। বৃষ্টিতে যেন ঝর্ণার মায়াবী চেহারা আরও বাড়ছিল। এবার আমাদের ফিরতে হবে। যে পথ ধরে একটু আগে নিচে নেমেছি, সে সময় শুকনো পথেই নামতে আমাদের বুক দুরুদুরু করছিল। না জানি ভেজা পথে এবার আমাদের কপালে কী আছে! রওনা দিলাম, উদ্দেশ্য সালৌপি পাড়া

পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সৌন্দর্য। আরও বেশি সৌন্দর্য, পাহাড়ের পেটে ঝরা ঝর্ণায়। চোখ ধাঁধানো, মন জুড়ানো। এ পথের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ঘুরে বেড়িয়েছি পুরো পাঁচ দিন। হেঁটেছি বান্দরবানের থানচি থেকে রুমা উপজেলার দুর্গম সব পাহাড়ে। দেখেছি, ছয়টি ঝর্ণার মায়াবী রূপ। পাহাড়ের চূড়ায় বসবাস করা পাহাড়িদের জীবনাচরণ দেখেছি, শুনেছি তাদের টিকে থাকার গল্প।

তবে পাহাড়ি এ পথ অনেক কঠিন। যদিও তারচেয়ে বেশি নান্দনিক। জীবনের ভয়ংকর ও রোমাঞ্চকর সময়গুলো নিয়ে এ লেখা। আজ থাকছে যার দ্বিতীয় পর্ব। চলুন, পাহাড় অভিযানের দ্বিতীয় দিন শনিবারের শুরু থেকে হেঁটে আসি।

বাকত্লাই পাড়া। নানা উৎকণ্ঠা পেরিয়ে আমরা আরামের ঘুমে। অপেক্ষা, সকাল হওয়ার। অপেক্ষা, পাহাড় টপকে আনন্দ গ্রহণের। তখন ভোর ৫টা। গাইড জোরেসোরে ডাক দিয়ে বললেন, ‘উঠে খেয়ে নিন। বের হতে হবে। আজ সারাদিন হাঁটতে হবে।’

আমরাও জানি, আজ উঁচু-নিচু মেলা পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হবে। ফলে চোখ মুছতে মুছতে উঠে বসলাম। দাঁত মেজে প্রস্তুত হলাম। সকালের নাস্তায় পাহাড়ি সবজি আর ডিম খিচুড়ি, দারুণ। পাহাড়িরা টাকার বিনিময়ে হলেও অতিথি পরায়ণ।

খাওয়া শেষে গোছগাছের পালা। কাছে থাকা থলের ওজন অনেক। পুরো পাঁচ দিনের মুখরোচক খাবার আর কাপড়চোপড়ে ভর্তি। গোছাতে গোছাতে এক সহযাত্রী বলে বসলেন, ‘আমি গেলে আপনাদের পাহাড়ি অভিযানে ঝামেলা হবে। আমার অবস্থা ভালো না। পাহাড়ে ওঠলে বুক দুরুদুরু করে, হৃদকম্পন হয়। অনেক গহিনে ঢুকে হাঁটতে না পারলে বিপদ। পরে আমাকে ফিরিয়ে আনবে কে?’

তাঁর কথায় যুক্তি ছিল। দুর্গম পাহাড়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে লোকালয়ে ফেরত পাঠানো মুশকিল। টিম মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হলো, একটি গ্রুপ শুধু বাকত্লাই ঝর্ণা দেখতে এসেছে। তারা বাকত্লাই দেখে ঢাকায় ফিরবে। তাঁকে ওই গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত করে ঢাকায় পাঠানো হবে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলো।

গোছগাছ শেষে ফিরোজা রঙের জামা-প্যান্ট আর অ্যাংলেট-নিক্যাপ পরেছি। হাতে পাহাড়ি বাঁশের লাঠি। এ লাঠিকে সঙ্গী করে থানচি ও রুমা উপজেলার অনেক পাহাড়ি পথ অতিক্রম করতে হবে। যাই হোক, একজন অনুত্তীর্ণ হলেও আমরা সাতজন সব ধরনের ঝুঁকি মেনে দুর্গম পাহাড়ে যেতে প্রস্তুত।

পাড়ার একটি দোকানে চা পান শেষে রওনা দেওয়ার পালা। সারিতে দাঁড়িয়ে সবাই ছবি তুললাম। পায়ের জন্য চিন্তা হচ্ছে, আজ কয়েকটি পাহাড় টপকাতে হবে। আর গল্প কিংবা সময়ক্ষেপণ নয়, এবার রওনা দিব। শনিবার, সকাল সাড়ে ৭টা। যাত্রার শুরুতে ফেসবুকে লিখে দিলাম, ‘পুরোপুরি নেটওয়ার্কের বাইরে যাচ্ছি! ফি আমানিল্লাহ।’

বাকত্লাই পাড়াটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উপরে। সেখানে থেকে আমাদের অভিযান শুরু। গাইড সামনে, তিনি পাহাড়ের উপর ওঠছেন তো ওঠছেনই। পেছনে আমরাও। গাইড জানিয়ে দিলেন, তাঁর নির্দেশ শিরোধার্য। মিনিট ত্রিশের মতো ওঠছি পাহাড়ে। পা লেগে গেছে সবার। মনে হচ্ছিল, কেউ নিচে থেকে পা টেনে ধরেছে। এদিকে রাতে বৃষ্টির পর পথ বেশ পিচ্ছিল। আছে জোঁকের কামড়। এভাবে এক সময় পাহাড়ের চূড়াতে ওঠে মনে হচ্ছিল, মেঘ আমাদের অনেক নিচে! চোখ ধাঁধানো দৃশ্য।

এবার পাহাড় থেকে নামার পালা। নিচে নামছি। সামনে বাঁশের লাঠি ভর দিয়ে অনেক সময় নামছি। খাড়া পাহাড়। বারবার মনে হচ্ছিল, একবার পড়ে গেলেই জীবন শেষ! এভাবে ঘণ্টারও বেশি সময় নিচের দিকে নামছি। যেন পথ শেষই হচ্ছে না। হাঁটতে হাঁটতে আমিসহ দুজনের পা পিছলে গেল। মনে হচ্ছিল, এই বোধহয় শেষবারের মতো নিশ্বাস নেওয়া!

গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এদিকে সবার কাছে থাকা পানিও শেষ। শরীর ক্লান্ত, পিপাষিত। নিচে নামছি। এমন সময় দুজন পাহাড়ি যুবকের সঙ্গে দেখা। আমাদের দেখে চোখ-মুখ বড় করে বলে উঠলেন, ‘পাহাড়িদের দেখে সাইড দিবেন।’ সালাম দিলাম, তাঁরা চলে গেলেন।

সকাল সাড়ে ৯টা। একটি পাড়া চোখে পড়ল। নাম লুয়াং মুয়াল পাড়া। এখানে পৌঁছে আগেই পাড়ার পানির পাইপে গলা ভেজালাম। মনে হলো, মন ভেজালাম। জুতা খুলে দেখি, পা রক্তাক্ত! কয়েকটি জোঁক আরামে রক্ত খাচ্ছে। গাইড আমাদের একটি ঘরের বারান্দায় বসতে দিলেন। একটি বানর ছিল সেখানে। বিশাল বড় কাঠের ঘর। সবাই বারান্দায় বসে থাকলেও আমি গেলাম ঘরের ভেতরে। বাড়ির সদস্যদের সঙ্গে কথা বললাম। তাঁরা জানালেন, এ পাড়ায় ৪৬টি পরিবার আছে। ২১০ জনের মতো বাসিন্দা হবে সব মিলিয়ে। আমাদের সেদ্ধ ভুট্টা খেতে দেওয়া হয়। ভালোই লাগল। আতিথেয়তা দেখানো লোকজনের দাবি, পাহাড়ে ওঠার সময় শক্তিবর্ধক হিসেবে সেদ্ধ ভুট্টা বেশ কাজের।

তখন সকাল প্রায় সাড়ে ১০টা। আবার প্রস্তুত হয়ে শুরু হয় হাঁটাহাঁটি। ঘণ্টা খানিকের দূরত্ব মাড়িয়ে এক পাহাড় টপকে আরেকটি পাড়ার দেখা মিলল। পাড়ার নাম ফাইনুয়াম। আগেই গাইড জানিয়ে দিলেন, ‘এ পাড়ার মধ্যে দিয়ে হাঁটার সময় কোনোদিকে না তাকাতে। কোনো শব্দ না করতে। ওঁরা আরাকান বাহিনীকে খবর দিতে পারে।’

গাইড আমাদের অপেক্ষায় রেখে পাড়ার মধ্যে আগে ঢুকলেন। হাত ইশারা করার পর আমরাও ঢুকলাম। চুপচাপ হেঁটে গেলাম। আমি অবশ্য গোপনে গোপনে পাড়াটি দেখার চেষ্টা করলাম। তাদের বাড়িঘরগুলো দারুণ। এক পোশাকহীন বৃদ্ধাকে দেখা গেল। চোখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে দেখি, অধিংকাশ ঘর থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে এ পাড়ার বাসিন্দারা।

ফাইনুয়াম পাড়া অতিক্রম করে আরেকটি পাহাড়ে ওঠলাম। এ পাহাড় উঠে আমাদের সবার শারীরিক অবস্থা কাহিল। বিশেষ করে রনী ভাই আর হাঁটতে পারছিলেন না। ১০-২০ কদম ওঠে থেমে যাচ্ছিলেন। পানি, খেঁজুর, বাদাম ও ম্যাঙ্গোবার খাচ্ছেন আর একটু একটু করে হাঁটছেন। বাকিরা সামনে চলে গেছেন। আমি আর সামনে আগাই না। রনী ভাইয়ের পেছনেই আছি, যদি কিছু ঘটে যায়!

গাইড বারবার জানাচ্ছেন, এভাবে হাঁটা যাবে না। দ্রুত হাঁটতে হবে। নতুবা ‘লুং ফির ভা সাইতার’ দেখে সালৌপি পাড়ায় পৌঁছাতে আমাদের রাত হবে। কিন্তু, সময় যত গড়াতে থাকে রনী ভাই তত অসুস্থ হতে থাকেন। মনে হচ্ছিল আমাদের কিছু যেন করার নেই। একটু পরপরই বসতে হচ্ছে। একটা সময় কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে রনী ভাই পাহাড়ের মাটিতেই পা মেলে শুয়ে পড়েন। আমার ভয় বাড়তে লাগল। এখন কী হবে, রনী ভাইকে কীভাবে নেব পুরো পাঁচদিনের হাঁটা পথে? আশপাশে কোনো মানুষজন নেই। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন দিতে হয় কি না! এদিকে মুঠোফোনে নেটওয়ার্কও নেই।

কোনো পথ না দেখে আমরা বিশ্রাম নিচ্ছি। রনী ভাই মিটমিট করে তাকানো শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে আমরা অনেকটা পথ অতিক্রম করে ফেলেছি। ভাইকে ডাক দিয়ে বললাম, ‘কোনো অসুবিধা?’ ভাই বললেন, ‘এখন হাঁটতে পারব।’ অথচ তিনি অসুস্থ! যতবার জানতে চেয়েছি সমস্যা হচ্ছে কি না, ততবার তিনি বলেছেন, ‘আর অসুবিধা হবে না। এখন পারব!’

রনী ভাইয়ের কথা শুনি আর আত্মবিশ্বাস বাড়ে। উনি ভ্রমণ পিপাসু মানুষ। ভাইয়ের বারবার পানির প্রয়োজন হচ্ছে। আমার সঙ্গে দুই লিটার পানি। দেড় লিটারেরও বেশি পানি শেষ। আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কিন্তু, পানি খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি আগেই। হঠাৎ যদি রনী ভাই পানি চেয়ে বসেন, কোথা থেকে দেব? পানি পেতে হলে আরও অনেক হাঁটতে হবে। এসব চিন্তা করি আর জানতে চাই, ‘রনী ভাই সব ঠিকঠাক তো?’

রনী ভাই বারবার বলছেন, তিনি ঠিক আছেন। কিন্তু তাঁর শরীর সে কথা বলছে না। ভাইয়ের কাছে থাকা ব্যাগের ওজন ১০ কেজিরও বেশি। এ ব্যাগের কারণে আরও বেশি ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে তাঁকে। আমাদের সঙ্গী রুবেল ভাই। চলঘুরি বাংলাদেশ টিমের অ্যাডমিন। তিনি রনী ভাইকে স্বস্তি দিতে ভাইয়ের ব্যাগটি কাঁধে নিলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর আমরা আবার হাঁটা শুরু করেছি। কিন্তু, দুটি ব্যাগ নিয়ে তিনি কিছুক্ষণ পরই ক্লান্ত হয়ে পড়েন।

কোনো উপায় না পেয়ে এবার ব্যাগটি আমি নিলাম। আমার ব্যাগের ওজনও অনেক। আমার বুকে একটি, পিঠে আরেকটি ব্যাগ নিয়ে দুটি বড় পাহাড় টপকালাম। এরপর বাধ্য হয়ে রনী ভাইয়ের ব্যাগ থেকে কিছু কাপড়-চোপড় ফেলে দিলাম। কিছু জিনিস বের করে নিলাম আমার ব্যাগে। রনী ভাইও ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। ভার কমার পর তিনি নিজের কাঁধে নিলেন ব্যাগটি। আমরা এভাবে আমরা হাঁটছি, পাহাড় টপকাচ্ছি।

এবার আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি। গাইড অন্য একজন পাহাড়িকে পেয়ে পরামর্শ নিলেন। তারপর আমরা একটি পাহাড়ের নিচে নেমে রেমাক্রি খালের দেখা পেলাম। এ খাল বেয়ে হেঁটে চলেছি। কী এক আঁকাবাঁকা ঝিরির পথ। হাঁটতে ভয় করছিল। ঝিরিতে থাকা পাথরগুলো বড্ড পিচ্ছিল। সেখানে কেউ নামতে না চাইলেও আমি নেমে স্নান করলাম। পানি খেলাম। সবাই বোতলে পানি ভরে নিলাম। ভীষণ স্রোত। এরপর ঝুটপাট গুছিয়ে আবার ঝিরিপথ ঘেঁসে পথচলা শুরু করলাম।

কিছুদূর যাওয়ার পর জানা গেল, লুং ফির ভাতে যেতে হলে আবার পাহাড় টপকাতে হবে। খালেও প্রচণ্ড স্রোত। পানি হাঁটু সমান হলেও একা একা নামতে সাহস পাচ্ছিলাম না কেউ। ফলে সবাই হাতে হাত রেখে খালটি পাড়ি দিলাম। খালটি পাহাড়ের অনেক নিচে অবস্থিত। সেখান থেকে আরেকটি বিশাল পাহাড় টপকালাম। এই পাহাড়ে ওঠছি, তো ওঠছিই! যেন পথ শেষই হচ্ছে না। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছিল। চূড়া থেকে নিচে নামতে আরও এক ঘণ্টাও বেশি সময় লাগে।

হাঁটতে হাঁটতে একটি জুম ঘরের দেখা পেলাম। গাইড জানালেন, এখানে ব্যাগ রেখে যেতে। কাছেই ঝর্ণা। কয়েকটি জুমের ধান ক্ষেত পেরিয়ে এবার খাঁড়া পাহাড় থেকে নামার পালা। পাহাড়টি থেকে যখন নিচে নামতে শুরু করি তখন সবার ভয় ধরেছিল মনে। গাছ ধরে ধরে নিচে নামতে হচ্ছিল। এভাবে নিচ পর্যন্ত নামতে নামতে সবাই ক্লান্ত হয়ে ওঠি। এখন দুপুর আড়াইটা বাজে। সকাল থেকে মোট সাত ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে এ পর্যন্ত আসতে।

অনেক ওপর থেকে লুং ফির ভা ঝর্ণার পানি পড়ার শাঁ শাঁ শব্দ হচ্ছে। আমরা এখন আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত বিশাল লুং ফির ভা সাইতারের নিচে। চারিদিকে উঁচু উঁচু পাহাড়। কাছাকাছি দুটি মুখ দিয়ে ঝর্ণার পানি বিশাল অংশ জুড়ে নানা ধাপ পেরিয়ে নিচে পড়ছিল। নিচে পড়ছিল মানে, আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে পড়ছিল। সেখান থেকে ঝর্ণাটি পাহাড় বেয়ে আরও অনেক নিচের দিকে নামছে। কত নিচে নামছে, তা দেখার চেষ্টা করেও দেখতে পারিনি। ঝর্ণার পানির ফাঁকে ফাঁকে সবুজ-শ্যামল গাছপালা। এ দৃশ্যে নিমিষেই আমাদের ক্লান্ত শরীর হয়ে ওঠে ফুরফুরে। এ এক অদ্ভুত সুন্দর মায়াবী ঝর্ণা!

এ দৃশ্য হৃদয়জুড়ে থাকবে আজীবন। ছবি তুললাম। ভিডিও করলাম। এভাবে আধা ঘণ্টার মতো আমরা লুং ফির ভা ঝর্ণার নিচে কাটালাম। ঝর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, ওপর থেকে পানির ফোটা পড়ছিল শরীরে। কিছুক্ষণ পর শুরু হয় বৃষ্টি। বৃষ্টিতে যেন ঝর্ণার মায়াবী চেহারা আরও বাড়ছিল। এবার আমাদের ফিরতে হবে। যে পথ ধরে একটু আগে নিচে নেমেছি, সে সময় শুকনো পথেই নামতে আমাদের বুক দুরুদুরু করছিল। না জানি ভেজা পথে এবার আমাদের কপালে কী আছে! রওনা দিলাম, উদ্দেশ্য সালৌপি পাড়া

সারা দিনের কষ্ট দূর হয়ে যায় লুং ফির ভাকে দেখে

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ১৮ নভেম্বর, ২০২১ | ৬:৫৫ 60 ভিউ

পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সৌন্দর্য। আরও বেশি সৌন্দর্য, পাহাড়ের পেটে ঝরা ঝর্ণায়। চোখ ধাঁধানো, মন জুড়ানো। এ পথের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ঘুরে বেড়িয়েছি পুরো পাঁচ দিন। হেঁটেছি বান্দরবানের থানচি থেকে রুমা উপজেলার দুর্গম সব পাহাড়ে। দেখেছি, ছয়টি ঝর্ণার মায়াবী রূপ। পাহাড়ের চূড়ায় বসবাস করা পাহাড়িদের জীবনাচরণ দেখেছি, শুনেছি তাদের টিকে থাকার গল্প। তবে পাহাড়ি এ পথ অনেক কঠিন। যদিও তারচেয়ে বেশি নান্দনিক। জীবনের ভয়ংকর ও রোমাঞ্চকর সময়গুলো নিয়ে এ লেখা। আজ থাকছে যার দ্বিতীয় পর্ব। চলুন, পাহাড় অভিযানের দ্বিতীয় দিন শনিবারের শুরু থেকে হেঁটে আসি। বাকত্লাই পাড়া। নানা উৎকণ্ঠা পেরিয়ে আমরা আরামের ঘুমে। অপেক্ষা, সকাল হওয়ার। অপেক্ষা, পাহাড় টপকে আনন্দ গ্রহণের। তখন ভোর ৫টা। গাইড জোরেসোরে ডাক দিয়ে বললেন, ‘উঠে খেয়ে নিন। বের হতে হবে। আজ সারাদিন হাঁটতে হবে।’ আমরাও জানি, আজ উঁচু-নিচু মেলা পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হবে। ফলে চোখ মুছতে মুছতে উঠে বসলাম। দাঁত মেজে প্রস্তুত হলাম। সকালের নাস্তায় পাহাড়ি সবজি আর ডিম খিচুড়ি, দারুণ। পাহাড়িরা টাকার বিনিময়ে হলেও অতিথি পরায়ণ। খাওয়া শেষে গোছগাছের পালা। কাছে থাকা থলের ওজন অনেক। পুরো পাঁচ দিনের মুখরোচক খাবার আর কাপড়চোপড়ে ভর্তি। গোছাতে গোছাতে এক সহযাত্রী বলে বসলেন, ‘আমি গেলে আপনাদের পাহাড়ি অভিযানে ঝামেলা হবে। আমার অবস্থা ভালো না। পাহাড়ে ওঠলে বুক দুরুদুরু করে, হৃদকম্পন হয়। অনেক গহিনে ঢুকে হাঁটতে না পারলে বিপদ। পরে আমাকে ফিরিয়ে আনবে কে?’ তাঁর কথায় যুক্তি ছিল। দুর্গম পাহাড়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে লোকালয়ে ফেরত পাঠানো মুশকিল। টিম মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হলো, একটি গ্রুপ শুধু বাকত্লাই ঝর্ণা দেখতে এসেছে। তারা বাকত্লাই দেখে ঢাকায় ফিরবে। তাঁকে ওই গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত করে ঢাকায় পাঠানো হবে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলো। গোছগাছ শেষে ফিরোজা রঙের জামা-প্যান্ট আর অ্যাংলেট-নিক্যাপ পরেছি। হাতে পাহাড়ি বাঁশের লাঠি। এ লাঠিকে সঙ্গী করে থানচি ও রুমা উপজেলার অনেক পাহাড়ি পথ অতিক্রম করতে হবে। যাই হোক, একজন অনুত্তীর্ণ হলেও আমরা সাতজন সব ধরনের ঝুঁকি মেনে দুর্গম পাহাড়ে যেতে প্রস্তুত। পাড়ার একটি দোকানে চা পান শেষে রওনা দেওয়ার পালা। সারিতে দাঁড়িয়ে সবাই ছবি তুললাম। পায়ের জন্য চিন্তা হচ্ছে, আজ কয়েকটি পাহাড় টপকাতে হবে। আর গল্প কিংবা সময়ক্ষেপণ নয়, এবার রওনা দিব। শনিবার, সকাল সাড়ে ৭টা। যাত্রার শুরুতে ফেসবুকে লিখে দিলাম, ‘পুরোপুরি নেটওয়ার্কের বাইরে যাচ্ছি! ফি আমানিল্লাহ।’ বাকত্লাই পাড়াটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উপরে। সেখানে থেকে আমাদের অভিযান শুরু। গাইড সামনে, তিনি পাহাড়ের উপর ওঠছেন তো ওঠছেনই। পেছনে আমরাও। গাইড জানিয়ে দিলেন, তাঁর নির্দেশ শিরোধার্য। মিনিট ত্রিশের মতো ওঠছি পাহাড়ে। পা লেগে গেছে সবার। মনে হচ্ছিল, কেউ নিচে থেকে পা টেনে ধরেছে। এদিকে রাতে বৃষ্টির পর পথ বেশ পিচ্ছিল। আছে জোঁকের কামড়। এভাবে এক সময় পাহাড়ের চূড়াতে ওঠে মনে হচ্ছিল, মেঘ আমাদের অনেক নিচে! চোখ ধাঁধানো দৃশ্য। এবার পাহাড় থেকে নামার পালা। নিচে নামছি। সামনে বাঁশের লাঠি ভর দিয়ে অনেক সময় নামছি। খাড়া পাহাড়। বারবার মনে হচ্ছিল, একবার পড়ে গেলেই জীবন শেষ! এভাবে ঘণ্টারও বেশি সময় নিচের দিকে নামছি। যেন পথ শেষই হচ্ছে না। হাঁটতে হাঁটতে আমিসহ দুজনের পা পিছলে গেল। মনে হচ্ছিল, এই বোধহয় শেষবারের মতো নিশ্বাস নেওয়া! গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এদিকে সবার কাছে থাকা পানিও শেষ। শরীর ক্লান্ত, পিপাষিত। নিচে নামছি। এমন সময় দুজন পাহাড়ি যুবকের সঙ্গে দেখা। আমাদের দেখে চোখ-মুখ বড় করে বলে উঠলেন, ‘পাহাড়িদের দেখে সাইড দিবেন।’ সালাম দিলাম, তাঁরা চলে গেলেন। সকাল সাড়ে ৯টা। একটি পাড়া চোখে পড়ল। নাম লুয়াং মুয়াল পাড়া। এখানে পৌঁছে আগেই পাড়ার পানির পাইপে গলা ভেজালাম। মনে হলো, মন ভেজালাম। জুতা খুলে দেখি, পা রক্তাক্ত! কয়েকটি জোঁক আরামে রক্ত খাচ্ছে। গাইড আমাদের একটি ঘরের বারান্দায় বসতে দিলেন। একটি বানর ছিল সেখানে। বিশাল বড় কাঠের ঘর। সবাই বারান্দায় বসে থাকলেও আমি গেলাম ঘরের ভেতরে। বাড়ির সদস্যদের সঙ্গে কথা বললাম। তাঁরা জানালেন, এ পাড়ায় ৪৬টি পরিবার আছে। ২১০ জনের মতো বাসিন্দা হবে সব মিলিয়ে। আমাদের সেদ্ধ ভুট্টা খেতে দেওয়া হয়। ভালোই লাগল। আতিথেয়তা দেখানো লোকজনের দাবি, পাহাড়ে ওঠার সময় শক্তিবর্ধক হিসেবে সেদ্ধ ভুট্টা বেশ কাজের। তখন সকাল প্রায় সাড়ে ১০টা। আবার প্রস্তুত হয়ে শুরু হয় হাঁটাহাঁটি। ঘণ্টা খানিকের দূরত্ব মাড়িয়ে এক পাহাড় টপকে আরেকটি পাড়ার দেখা মিলল। পাড়ার নাম ফাইনুয়াম। আগেই গাইড জানিয়ে দিলেন, ‘এ পাড়ার মধ্যে দিয়ে হাঁটার সময় কোনোদিকে না তাকাতে। কোনো শব্দ না করতে। ওঁরা আরাকান বাহিনীকে খবর দিতে পারে।’ গাইড আমাদের অপেক্ষায় রেখে পাড়ার মধ্যে আগে ঢুকলেন। হাত ইশারা করার পর আমরাও ঢুকলাম। চুপচাপ হেঁটে গেলাম। আমি অবশ্য গোপনে গোপনে পাড়াটি দেখার চেষ্টা করলাম। তাদের বাড়িঘরগুলো দারুণ। এক পোশাকহীন বৃদ্ধাকে দেখা গেল। চোখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে দেখি, অধিংকাশ ঘর থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে এ পাড়ার বাসিন্দারা। ফাইনুয়াম পাড়া অতিক্রম করে আরেকটি পাহাড়ে ওঠলাম। এ পাহাড় উঠে আমাদের সবার শারীরিক অবস্থা কাহিল। বিশেষ করে রনী ভাই আর হাঁটতে পারছিলেন না। ১০-২০ কদম ওঠে থেমে যাচ্ছিলেন। পানি, খেঁজুর, বাদাম ও ম্যাঙ্গোবার খাচ্ছেন আর একটু একটু করে হাঁটছেন। বাকিরা সামনে চলে গেছেন। আমি আর সামনে আগাই না। রনী ভাইয়ের পেছনেই আছি, যদি কিছু ঘটে যায়! গাইড বারবার জানাচ্ছেন, এভাবে হাঁটা যাবে না। দ্রুত হাঁটতে হবে। নতুবা ‘লুং ফির ভা সাইতার’ দেখে সালৌপি পাড়ায় পৌঁছাতে আমাদের রাত হবে। কিন্তু, সময় যত গড়াতে থাকে রনী ভাই তত অসুস্থ হতে থাকেন। মনে হচ্ছিল আমাদের কিছু যেন করার নেই। একটু পরপরই বসতে হচ্ছে। একটা সময় কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে রনী ভাই পাহাড়ের মাটিতেই পা মেলে শুয়ে পড়েন। আমার ভয় বাড়তে লাগল। এখন কী হবে, রনী ভাইকে কীভাবে নেব পুরো পাঁচদিনের হাঁটা পথে? আশপাশে কোনো মানুষজন নেই। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন দিতে হয় কি না! এদিকে মুঠোফোনে নেটওয়ার্কও নেই। কোনো পথ না দেখে আমরা বিশ্রাম নিচ্ছি। রনী ভাই মিটমিট করে তাকানো শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে আমরা অনেকটা পথ অতিক্রম করে ফেলেছি। ভাইকে ডাক দিয়ে বললাম, ‘কোনো অসুবিধা?’ ভাই বললেন, ‘এখন হাঁটতে পারব।’ অথচ তিনি অসুস্থ! যতবার জানতে চেয়েছি সমস্যা হচ্ছে কি না, ততবার তিনি বলেছেন, ‘আর অসুবিধা হবে না। এখন পারব!’ রনী ভাইয়ের কথা শুনি আর আত্মবিশ্বাস বাড়ে। উনি ভ্রমণ পিপাসু মানুষ। ভাইয়ের বারবার পানির প্রয়োজন হচ্ছে। আমার সঙ্গে দুই লিটার পানি। দেড় লিটারেরও বেশি পানি শেষ। আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কিন্তু, পানি খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি আগেই। হঠাৎ যদি রনী ভাই পানি চেয়ে বসেন, কোথা থেকে দেব? পানি পেতে হলে আরও অনেক হাঁটতে হবে। এসব চিন্তা করি আর জানতে চাই, ‘রনী ভাই সব ঠিকঠাক তো?’ রনী ভাই বারবার বলছেন, তিনি ঠিক আছেন। কিন্তু তাঁর শরীর সে কথা বলছে না। ভাইয়ের কাছে থাকা ব্যাগের ওজন ১০ কেজিরও বেশি। এ ব্যাগের কারণে আরও বেশি ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে তাঁকে। আমাদের সঙ্গী রুবেল ভাই। চলঘুরি বাংলাদেশ টিমের অ্যাডমিন। তিনি রনী ভাইকে স্বস্তি দিতে ভাইয়ের ব্যাগটি কাঁধে নিলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর আমরা আবার হাঁটা শুরু করেছি। কিন্তু, দুটি ব্যাগ নিয়ে তিনি কিছুক্ষণ পরই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। কোনো উপায় না পেয়ে এবার ব্যাগটি আমি নিলাম। আমার ব্যাগের ওজনও অনেক। আমার বুকে একটি, পিঠে আরেকটি ব্যাগ নিয়ে দুটি বড় পাহাড় টপকালাম। এরপর বাধ্য হয়ে রনী ভাইয়ের ব্যাগ থেকে কিছু কাপড়-চোপড় ফেলে দিলাম। কিছু জিনিস বের করে নিলাম আমার ব্যাগে। রনী ভাইও ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। ভার কমার পর তিনি নিজের কাঁধে নিলেন ব্যাগটি। আমরা এভাবে আমরা হাঁটছি, পাহাড় টপকাচ্ছি। এবার আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি। গাইড অন্য একজন পাহাড়িকে পেয়ে পরামর্শ নিলেন। তারপর আমরা একটি পাহাড়ের নিচে নেমে রেমাক্রি খালের দেখা পেলাম। এ খাল বেয়ে হেঁটে চলেছি। কী এক আঁকাবাঁকা ঝিরির পথ। হাঁটতে ভয় করছিল। ঝিরিতে থাকা পাথরগুলো বড্ড পিচ্ছিল। সেখানে কেউ নামতে না চাইলেও আমি নেমে স্নান করলাম। পানি খেলাম। সবাই বোতলে পানি ভরে নিলাম। ভীষণ স্রোত। এরপর ঝুটপাট গুছিয়ে আবার ঝিরিপথ ঘেঁসে পথচলা শুরু করলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর জানা গেল, লুং ফির ভাতে যেতে হলে আবার পাহাড় টপকাতে হবে। খালেও প্রচণ্ড স্রোত। পানি হাঁটু সমান হলেও একা একা নামতে সাহস পাচ্ছিলাম না কেউ। ফলে সবাই হাতে হাত রেখে খালটি পাড়ি দিলাম। খালটি পাহাড়ের অনেক নিচে অবস্থিত। সেখান থেকে আরেকটি বিশাল পাহাড় টপকালাম। এই পাহাড়ে ওঠছি, তো ওঠছিই! যেন পথ শেষই হচ্ছে না। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছিল। চূড়া থেকে নিচে নামতে আরও এক ঘণ্টাও বেশি সময় লাগে। হাঁটতে হাঁটতে একটি জুম ঘরের দেখা পেলাম। গাইড জানালেন, এখানে ব্যাগ রেখে যেতে। কাছেই ঝর্ণা। কয়েকটি জুমের ধান ক্ষেত পেরিয়ে এবার খাঁড়া পাহাড় থেকে নামার পালা। পাহাড়টি থেকে যখন নিচে নামতে শুরু করি তখন সবার ভয় ধরেছিল মনে। গাছ ধরে ধরে নিচে নামতে হচ্ছিল। এভাবে নিচ পর্যন্ত নামতে নামতে সবাই ক্লান্ত হয়ে ওঠি। এখন দুপুর আড়াইটা বাজে। সকাল থেকে মোট সাত ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে এ পর্যন্ত আসতে। অনেক ওপর থেকে লুং ফির ভা ঝর্ণার পানি পড়ার শাঁ শাঁ শব্দ হচ্ছে। আমরা এখন আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত বিশাল লুং ফির ভা সাইতারের নিচে। চারিদিকে উঁচু উঁচু পাহাড়। কাছাকাছি দুটি মুখ দিয়ে ঝর্ণার পানি বিশাল অংশ জুড়ে নানা ধাপ পেরিয়ে নিচে পড়ছিল। নিচে পড়ছিল মানে, আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে পড়ছিল। সেখান থেকে ঝর্ণাটি পাহাড় বেয়ে আরও অনেক নিচের দিকে নামছে। কত নিচে নামছে, তা দেখার চেষ্টা করেও দেখতে পারিনি। ঝর্ণার পানির ফাঁকে ফাঁকে সবুজ-শ্যামল গাছপালা। এ দৃশ্যে নিমিষেই আমাদের ক্লান্ত শরীর হয়ে ওঠে ফুরফুরে। এ এক অদ্ভুত সুন্দর মায়াবী ঝর্ণা! এ দৃশ্য হৃদয়জুড়ে থাকবে আজীবন। ছবি তুললাম। ভিডিও করলাম। এভাবে আধা ঘণ্টার মতো আমরা লুং ফির ভা ঝর্ণার নিচে কাটালাম। ঝর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, ওপর থেকে পানির ফোটা পড়ছিল শরীরে। কিছুক্ষণ পর শুরু হয় বৃষ্টি। বৃষ্টিতে যেন ঝর্ণার মায়াবী চেহারা আরও বাড়ছিল। এবার আমাদের ফিরতে হবে। যে পথ ধরে একটু আগে নিচে নেমেছি, সে সময় শুকনো পথেই নামতে আমাদের বুক দুরুদুরু করছিল। না জানি ভেজা পথে এবার আমাদের কপালে কী আছে! রওনা দিলাম, উদ্দেশ্য সালৌপি পাড়া

দৈনিক ডোনেট বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ: