রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর এলাকায় মেট্রোরেল স্টেশনের নিচের সড়কে একটি পাইপবোমা উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। খবর পেয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বস্তুটি নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করে।
একটি ছাতার ভেতরে সুকৌশলে বোমাটি পাতা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ছাতার ভেতরে পাতা বোমা আর দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এমন ভয়াবহ ঘটনার প্রেক্ষিতে মেট্রোরেল চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ায় সময়মতো বোমাটি নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা।
আজ ২৪শে জুলাই, শুক্রবার রাতে শাপলা চত্বরের কাছে মেট্রো স্টেশনের নিচের অংশে পথচারীরা সন্দেহজনক ছাতাটি দেখতে পান। প্রথমে স্থানীয়ভাবে খবর ছড়ায় যে দুষ্কৃতকারীরা সড়ক লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করেছে। তবে পরবর্তীতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে স্পষ্ট করেন যে এটি সাধারণ কোনো পেট্রোল বোমা ছিল না।
পুলিশ সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে, উদ্ধার হওয়া বস্তুটি মূলত ছাতার ভেতরে কৌশলে সেট করা একটি পাইপবোমা। কেউ ছাতাটি খোলার চেষ্টা করলেই সরাসরি বিস্ফোরণ ঘটার মতো ভয়াবহ পরিকল্পনা নিয়ে এটি সেখানে রাখা হয়েছিল।
ডিএমপির বিশেষায়িত দল অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পাইপবোমাটি নিষ্ক্রিয় করায় সম্ভাব্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনার পেছনের অপরাধীদের শনাক্ত করতে তদন্ত জোরদার করেছে।
বাংলাদেশে পাইপবোমার ইতিহাসে জড়িয়ে আছে মুফতি হারুন ইজহার ও তার বাবার নাম
সারাদেশে আইএস জঙ্গিদের আদলে উগ্রবাদী পতাকা টাঙানোর ঘটনায় নেপথ্যের কুশীলবের নাম জানা গেছে ইতিমধ্যে। রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডের শরিয়াহ গ্র্যাজুয়েশন ইনস্টিটিউটের শিক্ষক হিসেবে কাজ করা ভয়ঙ্কর জঙ্গি এবং ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি হারুন ইজহার। আসুন তার ইতিহাস ও অতীত সম্পর্কে জানা যাক।
সময়কাল ৭ই অক্টোবর, ২০১৩। গণজাগরণ মঞ্চ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, হেফাজতের শাপলা চত্বর তাণ্ডব মিলে উত্তাল দেশ। এসময় চট্টগ্রামের লালখান বাজারস্থ জামিয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসায় এক ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে বেশ অন্তত ৮-৯ আহত হন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন মারা যান। শুরুতে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কম্পিউটারের ‘ইউপিএস’ বিস্ফোরণের হাস্যকর দাবি তুলে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরে গোয়েন্দা সংস্থা এবং বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের বিশেষজ্ঞরা সেখানে ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস তথা আইইডি বা হাতে তৈরি বোমা উৎপাদনের হদিস পান। উদ্ধার করা হয় বেশ কিছু অবিস্ফোরিত ‘পাইপবোমা’ এবং বোমা তৈরির যন্ত্রাংশ।
এ ঘটনায় জড়িত হিসেবে পরে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র্যাব নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হারকাতুল জিহাদের চার জঙ্গিকে ঢাকায় আটক করেছিল। তাদের মধ্যে ২০০৫ সালের ১৭ই আগস্টের সিরিজ বোমা হামলার এক পলাতক আসামী ছিলেন। অস্ত্র এবং বিস্ফোরকসহ দু’জনকে ঢাকার উত্তরা থেকে এবং অন্য দু’জনকে ধরা হয় আশুলিয়া থেকে। সেসময় আটক ৪ জনের কাছ থেকে এসএমজির ১,১০০ রাউন্ড গুলি, পিস্তলের ৩২টি গুলি এবং এক কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়।
হেফাজতে ইসলামের নিয়ন্ত্রণাধীন লালখান বাজারের মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে বিস্ফোরণের পর উদ্ধারকৃত বোমাগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে ‘হাতে তৈরি গ্রেনেড’ উল্লেখ করেছিল পুলিশ। তখন এ ঘটনাকে মাদ্রাসা এবং ইসলামের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের ষড়যন্ত্র দাবি করে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয় বিভিন্ন পক্ষ থেকে। তবে বোমা বিশেষজ্ঞরা পরে ‘পাইপবোমা’ শনাক্ত করেন।
২০১১ সালের জানুয়ারি মাসেও একই ধরনের ১১টি বোমা উদ্ধার করা হয়েছিল চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানা এলাকা থেকে। তখন বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানে এই প্রযুক্তির বোমা তৈরি হয়। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সর্বাধিক নাশকতা চালানোর অভিযোগ আছে জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার বিরুদ্ধে।
সেসময়কার গোয়েন্দা তথ্য থেকে আরও উঠে আসে, লস্করের সাথে জামিয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসার পরিচালক- হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির ও নেজামে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুফতি ইজহারুল ইসলাম এবং তার ছেলে মুফতি হারুন ইজহারের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। ২০১১ সালে গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মুফতি হারুন নিজে এই তথ্য দেন পুলিশকে। এর আগে ২০১০ সালের ১৫ই ডিসেম্বর হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন তার বাবা মুফতি ইজহারুল ইসলাম- যিনি উপমহাদেশের একজন শীর্ষ জঙ্গি নেতা হিসেবে কুখ্যাত।
হারুন ইজহার (ডানে), বিএনপির প্রতিমন্ত্রী টুকুর সাথে
জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার মধ্যে আইইডি তৈরির কারিগর হিসেবে যার নাম বেশি প্রচারিত তিনি হলেন ভারতের মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের ডান হাত হিসেবে পরিচিত সৈয়দ আবদুল করিম ওরফে টুণ্ডা। লস্কর ও উগ্র জঙ্গিবাদের সমর্থক এই সন্ত্রাসী টুন্ডা ২০১৩ সালের আগস্টে নেপালে গ্রেপ্তার হন। টুণ্ডা গোপনে ভুয়া পরিচয়ে বাংলাদেশে এসেছিলে এবং জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন- এমন তথ্যও পেয়েছিল সেসময় দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
সেসময় দায়িত্বরত গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং বোমা বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, লালখান বাজারের মাদ্রাসাটির ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধারকৃত বোমাগুলো পাইপবোমা প্রযুক্তির। যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- এসব বোমা বিমানবন্দরের স্ক্যানার এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত কুকুরও শনাক্ত করতে পারে না।
বিশেষজ্ঞরা এই প্রতিবেদককে জানান, এই বোমার উপকরণের সঙ্গে কফি মিশিয়ে রঙ এবং ঘ্রাণ পরিবর্তন করে জঙ্গিরা একে শনাক্তের অযোগ্য করে তোলে। মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানে অসংখ্যবার এমন বোমা হামলার শিকার হয়ে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছিল। এসব বোমা তাদের বেশ ভুগিয়েছে। পরে আফগানিস্তানে এ ধরনের বোমা নিষ্ক্রিয় করতে ‘ওয়াটার ব্লেড স্টিংরে’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমেরিকানরা।
সেসময় দায়িত্বরত দেশের একটি নিরাপত্তা সংস্থার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পাইপবোমা স্ক্যানারে ধরা পড়ে না। প্রশিক্ষিত কুকুরও গন্ধে বিভ্রান্ত হয় বলে তারাও ব্যর্থ হয়। দেশের বিভিন্ন হার্ডওয়্যার দোকানে এই বোমা তৈরির মূল সরঞ্জাম পাইপ ও সকেট (স্যানিটারি কাজে ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়াম) পাওয়া যায়। অন্য উপকরণ যেমন- ইউরিয়া, নাইট্রিক এসিড, পটাশিয়াম ক্লোরাইড, নাইট্রোবেঞ্জিন, কার্বন টেট্রাক্লোরাইড এবং চিনির মতো সহজলভ্য জিনিস দিয়ে এই শক্তিশালী বোমা তৈরি করা সম্ভব। স্ক্যানার ও প্রশিক্ষিত কুকুর এই বোমার অবস্থান নির্ণয়ে ব্যর্থ হলে তা হবে ভয়ঙ্কর।
২০১৩ সালের সেই বিস্ফোরণের পর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) তাদের প্রতিবেদনে লেখে: ‘বিস্ফোরণের পর মাদ্রাসার ছাত্রাবাস থেকে ৪টি অবিস্ফোরিত হ্যান্ড গ্রেনেডসদৃশ বোমা, ২৫০টি জিআই পাইপের টুকরো, ১০০টি মার্বেল, একটি তার প্যাঁচানো মোবাইল সেট, ২০০ গ্রাম জিআই তার, প্যাঁচানো স্প্রিং এবং দুটি স্লাইডরেঞ্জ উদ্ধার করা হয়েছে।’
পুলিশ প্রথমে উদ্ধারকৃত বোমাকে পুরনো ভার্সনের হাতে তৈরি গ্রেনেডসদৃশ বললেও হাতে তৈরি গ্রেনেডের সঙ্গে জিআই তার ও মোবাইল ফোন সংযুক্তির বিষয়টি আমলে নিয়ে বিশেষজ্ঞরা একে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে ব্যবহৃত পাইপবোমা হিসেবে শনাক্ত করতে সমর্থ হন।
তৎকালীন সিএমপির গোয়েন্দা শাখার উপপরিদর্শক ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্য সন্তোষ চাকমা ২০১১ সালে হাটহাজারী থেকে উদ্ধারকৃত বোমার সঙ্গে মুফতি হারুন ইজহারের মালিকানাধীন লালখান বাজারের মাদ্রাসার ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধারকৃত বোমার মিল থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন।
বোমা বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলো আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে আইইডি তৈরি করছে। মোটা লোহার পাইপের ভেতর বিস্ফোরক রেখে এই বোমা তৈরি হয়। বিস্ফোরণ ঘটাতে বোমার বাইরে রাখা হয় গ্রেনেডের মতো পিনের বিশেষ আংটা। এ ধরনের বোমাকে প্রেসার রিলিজ বোমাও বলা হয়। এই বোমার বাইরে থাকা বিশেষ আংটা ছুড়ে মারার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। বাইরে শক্ত লোহার আবরণ থাকায় এর ধ্বংস ক্ষমতা বাড়ে। আর বোমার ভেতরে বিস্ফোরক ও ধারালো বস্তু থাকায় সেসব স্প্লিন্টার ছুটে গিয়ে মানুষকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক বোমা বিশেষজ্ঞ বলেন, এ ধরনের বোমায় ইনিশিয়েটরের পাশাপাশি ব্যবহৃত হয় ব্যাটারি। আবার ব্যাটারির পরিবর্তে সরাসরি মোবাইল ফোনও ব্যবহৃত হয়। বিস্ফোরককে অ্যাক্টিভেট করতে ব্যাটারি বা মোবাইল ফোন যুক্ত করা হয়। বিশেষ করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে জঙ্গিরা হাতবোমা তৈরির জন্য এ রকম প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
বাংলাদেশে জেএমবির কুখ্যাত জঙ্গি জাহেদুল ইসলাম ওরফে বোমারু মিজান প্রথম এই প্রযুক্তির বোমা তৈরি করেছিল বলে গোয়েন্দা তথ্য আছে। এরপর মাসুম নামের আরেক জেএমবি জঙ্গি বোমা তৈরিতে হাত পাকায়। হেফাজত নিয়ন্ত্রিত লালখান বাজারস্থ মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণে নিহত নূরুন্নবীও তাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
আবদুল করিম টুণ্ডার প্রযুক্তিতে উদ্ভাবিত এই আইইডি প্রযুক্তির বোমা তৈরির ক্ষেত্রে ভারতে নব্বইয়ের দশকে বেশ কুখ্যাতি অর্জন করেন লস্কর-ই-তৈয়বার নেতা আবদুল করিম। বোমা বানাতে গিয়ে বাঁ-হাতের খানিকটা উড়ে গেলে তিনি নামের পাশে টুণ্ডা বিশেষণ যোগ করেন। দিল্লি পুলিশের বরাতে জানা যায়, দুই দশকের বেশি সময় ধরে ভারতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন টুণ্ডা। ৪৩টি বিস্ফোরণের ঘটনায় সরাসরি অভিযুক্ত টুণ্ডার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আশির দশকে তিনি পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর কাছে বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ নেন।
এই টুণ্ডা বাংলাদেশে এসেও জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গেছেন। আর এসব তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায় গ্রেপ্তারের পর আটক মুফতি হারুনের দেওয়া তথ্যে। ২০১১ সালের ৫ই নভেম্বর গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি ঢাকার গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে স্বীকার করেন, লস্করের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে। ২০১৩ সালের বিস্ফোরণের পর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা দুই আর দুই-এ চার মেলান। লস্কর-ই-তৈয়বার সঙ্গে যোগাযোগ থাকার সুবাদে তাদের শেখানো প্রযুক্তি ব্যবহার করে চট্টগ্রামের সেই হেফাজতি মাদ্রাসায় বোমা তৈরি করা হচ্ছিল।
বিশ্ব গণমাধ্যমগুলো বলছে, বাংলাদেশ ২০২৪-এর ৫ই আগস্টের পর আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের হাব হয়ে উঠেছে
লালখান বাজার মাদ্রাসায় গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত থাকায় ২০১৩ সালের অক্টোবরে ইজহারপুত্র মুফতি হারুনকে গ্রেপ্তার হন। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে হেফাজতে ইসলামের নেতা মুফতি হারুনের বিরুদ্ধে খোদ হেফাজতে্ ইসলামের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। তিনি দীর্ঘদিন কারাগারে বন্দি ছিলেন। তার পিতা মুফতি ইজহারও পরে একই অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। তিনিও দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দারা তাকে সাংবাদিকদের সামনে নিয়ে এলে তিনি দুই আঙুল তুলে ভি-চিহ্ন দেখিয়ে বলেন, আমি মহাজোটের প্রতিষ্ঠাতা।
লালখান বাজার মাদ্রাসায় গ্রেনেড বিস্ফোরণের পরপরই পালিয়ে যান মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী। ২ বছর পলাতক থাকার পর পুনরায় লালখান বাজার মাদ্রাসায় ফেরেন। গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঘটনায় দায়ের করা তিন মামলায় মুফতি ইজহার ও তার ছেলে হারুন ইজহারসহ বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। বিস্ফোরক, এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন ও একটি হত্যাসহ তিনটি মামলায় জামিন না নেয়ায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয় মুফতি ইজহারের বিরুদ্ধে।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মুফতি ইজাহারুল ইসলামের পরিচালনাধীন লালখান বাজারে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত জামিয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসায় গড়ে উঠেছিল আন্তঃদেশীয় জঙ্গিদের ঘাঁটি। যেখান থেকে ২০০৯ সালের শেষ দিকে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস ও ভারতীয় হাইকমিশনার হামলার ছক তৈরি হয়েছিল।
এ হামলা পরকিল্পনা করেছিল নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামী জঙ্গি সংগঠন লস্কর ই-তৈয়বা। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ইজহারুল ইসলামের ছেলে হারুন ইজহার। ফের সেখান থেকেই বড় ধরনের জঙ্গি হামলার ছক কষা হয়েছিল বলে পুলিশ ও গোয়েন্দারা জানান।
২০০৯ সালের শেষ দিকে খবর পাওয়া যায়, যে কোনো সময় ঢাকাস্থ দুটি দূতাবাসে জঙ্গি হামলা হতে পারে। এ তথ্যের ভিত্তিতে ও একটি টেলিফোন কলের সূত্র ধরে জানা গেছে, হামলার ছক মুফতি ইজহারের মাদ্রাসায় বসেই করা হয়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত আন্তঃদেশীয় কয়েকজন জঙ্গি মুফতি ইজহারুলের মাদ্রাসায় অবস্থান করছিলেন।
এ তথ্য পেয়েই গোয়েন্দা পুলিশ ওই মাদ্রাসায় অভিযান চালায়, গ্রেপ্তার করা হয় ইজহারপুত্র হারুন ইজহার এবং দক্ষিণ ভারতীয় সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার সদস্য ভারতীয় নাগরিক শহিদুল, সালাম, সুজন ও আল আমিন ওরফে মইফুলকে।
সূত্র জানায়, ২০০৯ সালের ওই অভিযানকালে গোয়েন্দা পুলিশ হারুন ইজহারের কক্ষ থেকে একটি ল্যাপটপ জব্দ করে। ওই ল্যাপটপে মার্কিন ও ভারতীয় হাইকমিশনার হামলার তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়। পুলিশের অভিযান শুরুর আগে সেখান থেকে পালিয়ে যান লস্কর-ই-তৈয়বার অন্যতম শীর্ষনেতা টি নাসির ও সরফরাজ।
ওই বছরের ৬ই নভেম্বর কুমিরা সীমান্ত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে দুই ভারতীয় জঙ্গি গ্রেপ্তার হয়। তারা ভারতের বেঙ্গালুরু কম্পিউটার সিটিতে বোমা হামলাসহ বেশ কয়েকটি বড় সন্ত্রাসী হামলায় জড়িত। তারা ছিলেন ভারতে মোস্ট ওয়ান্টেড। গ্রেপ্তার এড়াতে দুই জঙ্গি দুবাই হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয় মুফতি ইজহারের মাদ্রাসায়।
এর আগে রাউজান রাবার বাগান গোদারপাড় এলাকায় পাহাড়ের চূড়ায় হুজির প্রশিক্ষণকালে অভিযান চালিয়ে জিহাদি বই ও বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করে র্যাব। এ ঘটনায় বিস্ফোরক ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। দুটি মামলায় মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীসহ আটজনকে আসামি করা হয়।
২০১০ সালের ১৫ই ডিসেম্বর হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগের র্যাব-৭ এর হাতে দুই সহযোগীসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মুফতি ইজহারুল ইসলাম। হরকাতুল জিহাদের (হুজি) তৎকালীন আমির মাওলানা ইয়াহিয়া ওরফে বর্দ্দা (৪৬) এবং তার দুই সহযোগী মো. বাহাউদ্দিন (২২) ও ইয়ার মোহাম্মদকে (৫০) গ্রেপ্তার করে র্যাব।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইয়াহিয়া জানান, বৃহত্তর চট্টগ্রামে হুজির আধিপত্য বিস্তারের জন্য মুফতি ইজহারুল ইসলামের লালখান বাজার মাদ্রাসায় সাংগঠনিক অফিস খোলা হয়েছে। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে প্রয়াত কবি শামসুর রাহমানের প্রাণনাশের চেষ্টার অভিযোগে আটক হওয়া কয়েকজন জঙ্গি জানায়- তারা মুফতি ইজহারুল ইসলামের লালখান বাজার মাদ্রাসাতেই প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
মানিকগঞ্জ পৌরসভার শ্রী শ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়ী মন্দিরে ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলাকালে এক নারী ভক্তের স্বর্ণের চেইন চুরির চেষ্টার অভিযোগে দুই মুসলিম নারীকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে।
ঘটনাটি জানাজানি হলে মন্দির এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে স্থানীয়রা ওই দুই নারীকে আটক করে পিটুনির পর সদর থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন।
গত ২২শে জুলাই, বুধবার দুপুরে মহানামযজ্ঞ অনুষ্ঠান চলাকালে এ ঘটনা ঘটে।
আটক দুই নারী হলেন, হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার হালুয়াপাড়া এলাকার জুনাইদ হোসেনের স্ত্রী বিলকিস আক্তার (২০) এবং লাখাই উপজেলার মৌশাদিয়া এলাকার শাকির হোসেনের স্ত্রী মিনা আক্তার (১৯)।
স্থানীয়রা জানান, দুই মুসলিম নারী শাঁখা ও সিঁদুর পরে হিন্দু ধর্মাবলম্বী সেজে মন্দিরে প্রবেশ করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ভক্তদের সঙ্গে প্রসাদ গ্রহণের সময় তারা মিশে যান। একপর্যায়ে এক নারী ভক্তের গলায় থাকা স্বর্ণের চেইন চুরি করার চেষ্টা করলে উপস্থিত লোকজন বিষয়টি টের পেয়ে তাদের হাতেনাতে আটক করেন।
এরপর ঘটনাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে মন্দির এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। স্থানীয়রা দুই নারীকে পিটুনির পর মানিকগঞ্জ সদর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন।
মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক গৌরাঙ্গ চন্দ্র সরকার বলেন, মন্দিরে মহানামযজ্ঞ উপলক্ষে শত শত ভক্তের সমাগম হয়েছিল। অনুষ্ঠান চলাকালে এক নারী ভক্তের গলার স্বর্ণের চেইন চুরির চেষ্টা করা হলে উপস্থিত লোকজন দুই নারীকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেন বলেন, মন্দিরে ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলাকালে চুরির অভিযোগে দুই নারীকে আটক করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ দেননি। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং ঘটনার বিস্তারিত জানতে দুই নারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ হাউজিং এলাকায় বাজার থেকে পরিবারের সঙ্গে বাসায় ফেরার পথে পুলিশের এক উপপরিদর্শককে (এসআই) ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে গেছে এক দুর্বৃত্ত। হামলায় গুরুতর আহত ওই পুলিশ কর্মকর্তার পিঠে ৪৩টি সেলাই দিতে হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে এটি ছিনতাইয়ের ঘটনা নয়, বরং পূর্ব শত্রুতার জের ধরে পরিকল্পিত হামলা হতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে কাদেরাবাদ হাউজিংয়ের সি ব্লকের ৪ নম্বর সড়কে, নিজের বাসার অদূরে এ ঘটনা ঘটে।
আহত এসআই ওসমান গণি পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সদস্য। বর্তমানে তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন শাখায় দায়িত্ব পালন করছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর-আদাবর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, প্রাথমিক তদন্তে এটি ছিনতাইয়ের ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না।
ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে এবং ঘটনাস্থলের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে পুলিশের ধারণা, পূর্ব শত্রুতার জের ধরে হামলার ঘটনাটি ঘটতে পারে।
পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে কাঁচাবাজার শেষে বাসায় ফিরছিলেন এসআই ওসমান গণি। বাসার কাছাকাছি পৌঁছালে পেছন থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর পিঠে আঘাত করে দ্রুত পালিয়ে যায়।
ছুরিকাঘাতে আহত হওয়ার পরও এসআই ওসমান গণি হামলাকারীকে ধাওয়া করার চেষ্টা করেন। তবে দুর্বৃত্ত অন্ধকারের সুযোগে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হামলায় তার পিঠে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং চিকিৎসকরা সেখানে ৪৩টি সেলাই দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এসি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ভুক্তভোগীর ধারণা, পূর্বের কোনো শত্রুতার জের ধরে এই হামলা হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
পুলিশ জানিয়েছে, হামলার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
জামায়াতের ইসলামীর আমির, ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী রাজাকার মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ও সাঁথিয়া আসনের (পাবনা-১) জামায়াত ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেনের জুমা পড়ানোর কেন্দ্র করে পাবনার সাঁথিয়া পৌর এলাকায় একটি মসজিদের হট্টগোল ও মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এসময় জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীদের হামলায় অনেক মুসল্লি আহত হন।
আজ ২৪শে জুলাই, শুক্রবার জুমার জামাতের ঠিক আগ মুহূর্তে পৌর এলাকার ‘আফতাবনগর বাজার জামে মসজিদের’ ভেতরে এই হামলার ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাঁথিয়া থানার ওসি আনিসুর রহমান।
তবে এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপিকে দায়ী করেন জামায়াত-শিবিরের নেতারা। বিএনপি এতে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে এমপি মোমেনের বিরুদ্ধে উল্টো মসজিদের ক্ষমতা প্রদর্শনের অভিযোগ তোলে।
স্থানীয়রা জানান, রাজাকার নিজামীর ছেলে ও জামায়াতের সংসদ সদস্য মোমেন গত শুক্রবার সাঁথিয়া পৌর এলাকার আফতাবনগর বাজার জামে মসজিদে জুমা পড়ানোর নামে মসজিদের ভেতরে রাজনীতি ঢোকানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও মুসল্লিদের আপত্তির মুখে তা সম্ভব হয়নি। মসজিদের ভেতরে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি ঢোকানোর এই অপচেষ্টা রুখে দেন তারা।
পরে আজ (শুক্রবার) আবার তিনি সেখানে জুমা পড়াতে এলে খুতবা শুরুর সময় আবারও মুসল্লিরা বাধা দেন। এসময় মসজিদের ভেতরে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীদের সাথে স্থানীয়দের হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটে। ঝামেলার আশঙ্কায় আগেই উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিলে মসজিদের নির্ধারিত ইমামের ইমামতিতে জুমার নামাজ শেষ হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেনের পিতা- একই দলের নেতা রাজাকার মতিউর রহমান নিজামীকে জুতাপেটা করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ছাত্রসমাজ
বর্তমানে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
এ ঘটনায় এনসিপির সাঁথিয়া উপজেলার সদস্যসচিব ও শিবির কর্মী ফারুক হোসেন বলেন, আমরা এমপির সঙ্গে নামাজ পড়তে যাই। তখন বিএনপির কর্মীরা আমাদের ওপর হামলা করে। পুলিশের ভূমিকা ছিল রহস্যজনক।
তার দাবি, এই হামলায় আহত হয়েছেন এনসিপির সাঁথিয়া পৌরসভার সভাপতি আবু দাউদ ফকির, উপজেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মেহেদী হাসান, শিবিরের সাবেক উপজেলা সভাপতি শিখন মোল্লা, পৌর যুব জামায়াতের সেক্রেটারি সাদ্দাম ফকির, জামায়াত নেতা কুতুবউদ্দিন মোল্লা, মাইকেল হোসেন সাদ্দামসহ বেশ কয়েকজন।
তবে এই আহতরা কোথাও চিকিৎসা নিয়েছেন, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং মুসল্লিদের অনেককেই স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক ও ফার্মেসিতে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।
সাঁথিয়া পৌর বিএনপির সভাপতি মো. করিম জানান, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্য জামায়াত এমপি গত শুক্রবারেও নামাজ পড়াতে চাইলে মুসল্লিদের আপত্তির মুখে ব্যর্থ হয়। আজ আবার সন্ত্রাসী নিয়ে এসেছিলো। এসে ইমাম থেকে মাইক্রোফোন কেড়ে নিয়ে মিনিট দশেক বক্তব্য দেন, কেউ কিচ্ছু বলেনি। পরে তিনি খুতবা পড়িয়ে নামাজও পড়াবেন বলে ঘোষণা দিলে মুসল্লিরা আপত্তি করেন। তখন জামায়াত-শিবির ও এনসিপির কর্মীরা হামলা করে। মুসল্লিরা প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। পরে পুলিশ সবাইকে থামালে মসজিদের ইমাম দিয়েই নামাজ সম্পন্ন হয়।
অভিযোগ করে বিএনপির এই নেতা বলেন, এমপি নিজের ইচ্ছায় ক্ষমতা দেখাতে আজকে জুমার মত পবিত্র দিনে ঝামেলাটা করলেন। মসজিদভিত্তিক রাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিৎ।
পাল্টা অভিযোগ করে জামায়াতের সংসদ সদস্য মোমেন বলেন, আমি ক্ষমতা দেখাতে সেখানে নামাজ পড়াতে যাইনি। ‘স্থানীয়দের’ দাবিতে গিয়েছি। গত জুমাতেও তারা দাবি জানালে বিএনপির লোকজন ঝামেলা করবে জেনে যাইনি। আজ ঝামেলা হবে না জানিয়ে ‘স্থানীয়রা’ আমাকে আমন্ত্রণ জানালে সেখানে যাই। কিন্তু খুতবার সময় বিএনপির নেতাকর্মীরা ঝামেলা শুরু করে। এটি অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ঘটনা।
তিনি আরও বলেন, ঝামেলাটি তারা পূর্বপরিকল্পিতভাবে করেছে। গোপীনাথপুরের বিএনপি নেতা করিম, সেক্রেটারি সিরাজরা বহিরাগতদের এনে ঝামেলাটি করে। আমাদের নেতাকর্মীদের মারধর করে।
নামাজ পড়ে জামায়াতের এক কর্মীর দোকানে আক্রমণ, লুটপাট ও মারধরও করার অভিযোগ তুলে পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ বলেও দাবি করেন মোমেন।
সাঁথিয়া থানার ওসি আনিসুর রহমান বলেন, এমপির নামাজ পড়ানো কেন্দ্র করে ঝামেলা হতে পারে, খবর ছিল পুলিশের কাছে। তাই পুলিশ মোতায়েন হয়। এরপরও নামাজের আগ মুহূর্তে মসজিদের ভেতরে কথা কাটাকাটি ও হালকা ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। মারধর বা আহতের ঘটনা ঘটেনি। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
জামায়াতের সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের বেশ কিছু আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনার মধ্যেই এবার ফরিদপুর সদর উপজেলার আলিয়াবাদ ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ওবায়দুর রহমান ও এক নারীর আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ওই নেতাকে দলীয় প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব ধরনের পদ থেকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি।
২৩শে জুলাই, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোদাররেস আলী ইছা এবং সদস্য সচিব এ কে এম কিবরিয়া স্বপনের স্বাক্ষরিত এক বহিষ্কারাদেশে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। পরে বিষয়টি দলীয় সূত্রেও নিশ্চিত করা হয়েছে।
এর আগে এক নারীর সঙ্গে ওবায়দুর রহমানের ৫ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডের একটি অশ্লীল ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তা মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।
জেলা বিএনপির ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে আলিয়াবাদ ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ওবায়দুর রহমানকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। দলীয় সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তার সঙ্গে দলীয় সম্পর্ক না রাখার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. ওবায়দুর রহমানের মোবাইলে ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে ফরিদপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এ কে এম কিবরিয়া স্বপন বলেন, ওবায়দুর রহমানের একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় বৃহস্পতিবার রাতে জেলা বিএনপির এক সভায় তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
প্রাথমিকভাবে বহিষ্কারের আদেশের চিঠির একটি কপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করা হয়।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি কোনো ধরনের অনৈতিক বা দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেয় না। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পটুয়াখালীতে রশিতে বেঁধে অন্যের দুটি পোষা কুকুরকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে এলাকার প্রভাবশালী দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে এলাকাজুড়ে।
গতকাল ২৩শে জুলাই, বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে পটুয়াখালী সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাদুরা বাজার-সংলগ্ন খেজুরতলা স্ট্যান্ড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত মনজু হাওলাদার খেজুরতলা স্ট্যান্ড এলাকার রশিদ হাওলাদারের ছেলে এবং আরেক অভিযুক্ত জহির হাওলাদার একই এলাকার নুর ইসলাম হাওলাদারের ছেলে। তারা দুজনই স্থানীয় জামায়াতের রাজনীতির সমর্থক বলে জানান স্থানীয়রা।
পটুয়াখালী সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আমাদেরকে বিষয়টি জানিয়েছেন। আমরা এ বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছি, পরবর্তীতে আপনাদের জানানো যাবে।
ভিডিওতে দেখা যায়, দুটি পোষা কুকুরকে রশি দিয়ে বেঁধে এক ব্যক্তি মোটা গাছের গুঁড়ির মতো লাঠি দিয়ে কুকুর দুটির মাথায় বেধড়ক পেটাচ্ছেন। পাশে আরেকজনকে সহযোগিতা করতে দেখা যায়। রশিতে বাঁধা কুকুর দুটি প্রাণ বাঁচাতে ছটফট করে করুণ চিৎকার করছিল। নির্মম পিটুনিতে মাথা ফেটে মগজ বেরিয়ে গেলে ধুঁকতে ধুঁকতে কুকুর দুটি মারা যায়।
অবলা প্রাণির ওপর এমন নির্মম নিপীড়ন ও হত্যার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই তুমুল ক্ষোভে ফেটে পড়েন সংবেদনশীল মনের মানুষেরা। জড়িত দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর কঠোর সাজার দাবি জানান তারা।
স্থানীয়রা জানায়, খেজুরতলা এলাকার দোকানদার জাহাঙ্গীর প্যাদা দীর্ঘদিন ধরে কুকুর দুটিকে মায়া ও ভালোবাসায় পুষছিছিলেন নিজের পরিবারের সদস্যের মতো করে। শুক্রবার স্থানীয় মনজু হাওলাদারের ৬টি হাঁসকে কোনো এক কুকুর কামড়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। মনজুর দাবি- এটা জাহাঙ্গীরের পোষা কুকুর দুটির কাজ। এ নিয়ে জাহাঙ্গীরের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়। ক্ষতিপূরণ দিতে না পারায় তার সামনেই কুকুর দুটিকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
জাহাঙ্গীর প্যাদা বলেন, ওরা আমার পালা কুকুর। ৪ বছর ধরে পালি, ভ্যাক্সিনও দেয়া আছে যেন মানুষের ক্ষয়ক্ষতি না করে। কাল সকালে নাকি মনজু হাওলাদারের হাঁস কামড়াইছে কোনো কুকুরে। কিন্তু সেসময় আমার কুকুর বাড়িতেই ঘুমাইয়া আছিল। পরে তারা আমার কাছে হাঁসের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৩ হাজার টাকা দাবি করে। আমার কাছে এত টাকা না থাকায় দিতে পারিনি। মিথ্যা অপবাদ দিয়া চোখের সামনে মনজু ও জহির আমার কুকুরগুলারে রশিতে বাইন্ধা পিটাইয়া মারছে। আমি কিছু কইতে পারি নাই তাদের ভয়ে। তারা এখানে খুব পেশীশক্তি দেখায়।
তিনি আরও বলেন, চোখের সামনে পোষা কুকুর দুইটারে তারা পিটাইয়া মারছে, খুব কষ্ট হইতেছে। ওরা আমার সন্তানের মতো ছিল। বিচার চাইয়া লাভ হইবে কী বলেন? আমরা কি তাদের সাথে পারমু? তারা খুব শক্তিশালী আর আমি একা মানুষ।’
আদালত সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রকাশ্যে কুকুর বা অন্য কোনো প্রাণী পিটিয়ে হত্যা করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের ঘটনা প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯-এর আওতায় বিচার্য।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, এভাবে কুকুর পিটিয়ে মারতে পারলে ভবিষ্যতে তারা বড় অপরাধও করতে পারবে। আমরা এদের বিচার চাই।
তবে এ বিষয়ে অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব না হওয়ায় তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পটুয়াখালী সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রওজাতুন জান্নাত বলেন, আমি ইতোমধ্যে সদর থানার ওসিকে জানিয়েছি। তাকে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছি। এ ঘটনায় যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা আয়োজনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেই ঘটনার প্রায় ১০ দিন পর কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের একযোগে সাতজন শিক্ষককে বদলি করা হয়েছে। কলেজটির ইতিহাসে একসঙ্গে এতসংখ্যক শিক্ষকের বদলির ঘটনা এবারই প্রথম।
তবে এই বদলিকে নিয়মিত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি রক্ষায় শিক্ষকদের ‘বলির পাঁঠা’ বানানোর চেষ্টা হিসেবে দেখছেন কলেজের অনেক শিক্ষক।
২৩শে জুলাই, বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সরকারি কলেজ-২ শাখার উপসচিব মো. আ. কুদ্দুস স্বাক্ষরিত পৃথক প্রজ্ঞাপনে সাত শিক্ষককে দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে বদলি করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে আগামী ২৯শে জুলাইয়ের মধ্যে তাদের বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যাদের যেখানে বদলি করা হয়েছে
উপাধ্যক্ষ এ কে এম জহিরুল আলমকে চৌদ্দগ্রামের চিওড়া সরকারি কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে
গণিত বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুল মালেককে কক্সবাজার সরকারি কলেজ
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কনক বড়ুয়াকে নোয়াখালীর হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজে
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উল্লাহ মজুমদারকে লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজে
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ নূর উল্লাহকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর সরকারি কলেজে
হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. আল-আমিনকে সিলেটের বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজে
ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মহসীনকে বরগুনা সরকারি কলেজে
কলেজ সূত্র বলছে, বদলি হওয়া শিক্ষকদের সবাই সরাসরি পরীক্ষা পরিচালনার মূল দায়িত্বে ছিলেন না। উপাধ্যক্ষ এ কে এম জহিরুল আলম পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন না। গণিত বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুল মালেক জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের অনীহার কারণে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন। কনক বড়ুয়া পরীক্ষা কমিটির আহ্বায়ক এবং মোহাম্মদ মহসীন শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক ছিলেন।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৩ই জুলাই। টানা ভারী বর্ষণে কুমিল্লা শহরের পাশাপাশি কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজও পানিতে তলিয়ে যায়। জলাবদ্ধতার মধ্যেই এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষার্থীদের অনেকেই কোমরসমান পানি পেরিয়ে কেন্দ্রে পৌঁছান। পরে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু ডিঙি নৌকার ব্যবস্থা করে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে পৌঁছে দেন।
নৌকায় চড়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনও সমালোচনার মুখে পড়েন।
এরপর ১৮ই জুলাই কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী কলেজ পরিদর্শনে গিয়ে জলাবদ্ধতা এবং পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কলেজ শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এই ঘটনার কারণে সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই সাত শিক্ষককে একযোগে বদলির আদেশ জারি হওয়ায় কলেজজুড়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলেজের একাধিক শিক্ষক বলেন, এই বদলি মূলত প্রশাসনিক নয়, বরং মন্ত্রণালয়ের সমালোচনা প্রশমনের জন্য শিক্ষকদের দায়ী করার চেষ্টা। তাদের ভাষ্য, পরীক্ষা স্থগিত বা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত কলেজের একার ছিল না।
শিক্ষামন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি রক্ষায় বলির পাঁঠা হলেন বদলি হওয়া শিক্ষকেরা- ক্ষোভ জানিয়েছেন কলেজের কয়েকজন শিক্ষক।
এক শিক্ষক বলেন, “জলাবদ্ধতার বিষয়টি জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন থেকে শুরু করে সরকারের দায়িত্বশীল সব মহল জানতেন। যদি শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরীক্ষা স্থগিতের নির্দেশ দিত, আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তা বাস্তবায়ন করতাম। কিন্তু কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এখন সেই ব্যর্থতার দায় আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে তাদের ভাবমূর্তি রক্ষায়।”
আরেক শিক্ষক বলেন, “৫ই আগস্টের পর সারাদেশে শিক্ষকদের ওপর নেমে এসেছে নির্যাতন-নিপীড়নের খড়গ। শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করা, অপমান-অপদস্থ এবং ভুয়া মামলার ঘটনার শিক্ষক হাজার হাজার শিক্ষক। ভেবেছিলাম এসব থেমে যাবে এই সরকারের সময়। কিন্তু এখনো শিক্ষক নির্যাতন চলছে। এভাবে শিক্ষাদান সম্ভব নয়।”
এদিকে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রয়োজন মনে করলে যে কাউকে যে কোনো সময় বদলি করতে পারে। এটি প্রশাসনিক ক্ষমতার মধ্যেই পড়ে।
তবে একসঙ্গে সাতজন শিক্ষককে বদলি করা কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়। এর বেশি মন্তব্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”
এ ঘটনায় শিক্ষা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকের প্রশ্ন, জলাবদ্ধতার মতো পরিস্থিতিতে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত যদি কেন্দ্রীয়ভাবে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে শুধু কলেজের শিক্ষকদের বদলি করে দায় নির্ধারণ কতটা যৌক্তিক—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি কালভার্টের সংযোগ সড়ক নির্মাণের মাত্র তিন মাসের মধ্যেই ধসে পড়েছে।
এতে প্রকল্পের নির্মাণমান নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্পটি এত অল্প সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দায়িত্বশীলদের গাফিলতি ও নিম্নমানের নির্মাণকাজের অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্র এবং বিএডিসি কার্যালয় থেকে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নলছিটি উপজেলার মোল্লারহাট ইউনিয়নের মালুহার এলাকায় সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় একটি কালভার্ট নির্মাণের জন্য ২৪ লাখ ৭৬ হাজার ৫৪০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
দরপত্রের মাধ্যমে কাজটি পায় দিনাজপুরের রামনগর এলাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তারমিন এন্টারপ্রাইজ। পরে প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব সাব-ঠিকাদার হিসেবে ঝালকাঠি সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এজাজ হাসানকে দেয়।
প্রকল্পটির কাজ ২০২৫ সালের মার্চ মাসে শুরু হয়ে জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে কাজ সম্পন্ন হতে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সময় লাগে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের প্রায় পুরো অর্থ, প্রায় ২৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, বিল হিসেবে উত্তোলন করে নেয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কালভার্টের দুই পাশের সংযোগ সড়কের মাটি দেবে গিয়ে ইট ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে সড়কটি দিয়ে যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। পথচারীরাও দুর্ভোগের মধ্যে চলাচল করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সংযোগ সড়ক নির্মাণের আগে যথাযথভাবে মাটি ভরাট ও কম্প্যাকশন করা হয়নি। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই মাটি বসে গিয়ে পুরো সংযোগ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তাদের আরও অভিযোগ, কালভার্টটির নির্মাণকাজেও প্রয়োজনীয় ফিনিশিং না দিয়ে কেবল রঙ করে কাজ শেষ দেখানো হয়েছে।
একাধিক বাসিন্দা জানান, নির্মাণকাজ চলাকালেই তারা কাজের মান নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। কিন্তু তাদের অভিযোগ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এখন কয়েক মাসের মধ্যেই সড়ক ধসে পড়ায় তাদের আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
এদিকে প্রকল্পটির সাব-ঠিকাদার এবং ঝালকাঠি সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এজাজ হাসান নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, নির্ধারিত নিয়ম মেনেই কাজ করা হয়েছে।
তার দাবি, টানা বর্ষণের কারণে সংযোগ সড়ক ধসে পড়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে বিএডিসি ঝালকাঠি জেলা কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী মো. জামাল উদ্দিন বলেন, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কী কারণে সংযোগ সড়ক ধসে পড়েছে, তা তদন্ত করা হবে।
নির্মাণকাজে কোনো ধরনের ত্রুটি পাওয়া গেলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
তবে সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কীভাবে প্রকল্পের প্রায় পুরো বিল উত্তোলন করেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের দাবি, সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্পের গুণগত মান নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত সংযোগ সড়ক দ্রুত পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।