ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলাতে মাদকাসক্ত চার ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। হরিণাকুণ্ডু থানা পুলিশ সুত্র জানায় শুক্রবার ১৩ আগষ্ট থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জুলফিকার আলী এর নির্দেশে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ভবানীপুর পুলিশ ক্যাম্প ও তার সঙ্গীয় ফোর্সসহ এসআই(নিঃ) ফররুখ আহমেদের নেতৃত্বে হরিণাকুণ্ডু উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে, ০১। বিরামপুর গ্রামের সানোয়ার হোসেনের পুত্র সাজেদুল ইসলাম(২৬), ০২। ধুলিয়া গ্রামের শরিফুল হকের পুত্র শাহিন হোসেন(২০), ০৩। শিংগা গ্রামের ডাবলুর ছেলে রাফায়েত আহমেদ (১৯), ০৪। ভবানীপুর গ্রামের নূর ইসলামের ছেলে লিয়ন আহম্মেদকে মাদক সেবন করা কালে গ্রেফতার করেন।
অভিযান কালে সরাসরি সামারী ট্রাইল কোর্ট পরিচালনা করে ডোপটেষ্টের মাধ্যমে আসামীদের নানাধরণের সাজা দেন বিজ্ঞ আদালত। হরিণাকুন্ডু থানার প্রসিকিউশন নং-৪২/২৬, এবং ৪৩/২৬, মূলে আসামী সাজেদুল ইসলাম, রাফায়েত হোসেন,মোঃ শাহিন হোসেন-কে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৬০০০ টাকা জরিমানা অনাদায় আরো ১৫ দিন বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। অপরদিকে আসামি লিওন হোসেনকে-পাঁচ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও চার হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো দশ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন।
শুক্রবার (১৪ আগষ্ট) ২০২৬ ইং তারিখ সকাল সাড়ে ১১টায় আসামীদের আইনি প্রক্রিয়ায় শেষে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়। অভিযান অব্যাহত আছে বলে হরিণাকুণ্ডু থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জুলফিকার আলী জানান,অপরাধী যেই হোক না কেনো তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র (বৈছা) আন্দোলন কেন্দ্রিক রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার ট্রাক চালক হোসেন হত্যা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি পিছিয়ে আগামী ১লা সেপ্টেম্বর ধার্য করেছেন আদালত।
আজ ১৩ই আগস্ট, বৃহস্পতিবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক রবিউল আলম এ আদেশ দেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, এই মামলায় চারজন আসামি অন্য মামলায় গ্রেপ্তার থাকায় তাদের আদালতে উপস্থিত করা হয়নি। তাদের এই মামলায় উপস্থিতিতের জন্য পি. ডব্লিউ আবেদন করা হয়েছে।
এ কারণে চার্জগঠন শুনানির তারিখ পিছিয়ে আগামী ১ সেপ্টেম্বর দিন নির্ধারণ করেন আদালত, বলেন তিনি।
মামলা সূত্রে জানা যায়, বৈছা আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ১৯শে জুলাই মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকায় গুলিতে নিহত হন মো. হোসেন। তিনি পেশায় ট্রাকচালক ছিলেন। সেদিন তিনি গাবতলীতে ট্রাক রেখে বাসায় ফিরছিলেন। চাঁদ উদ্যান এলাকায় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যান।
এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ৩১শে আগস্ট নিহত ব্যক্তির মা রীনা বেগম বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। ২০২৫ সালের ২৩শে নভেম্বর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার উপ-পরিদর্শক আকরামুজ্জামান আদালতে শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
এ মামলায় শেখ হাসিনাসহ ২০ জন পলাতক রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে গত ২৬ জানুয়ারি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
শেখ হাসিনা ছাড়াও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনান, আসিফ আহম্মেদ, তারেকুজ্জামান রাজিব, শেখ বজলুর রহমান, নুর মোহাম্মদ সেন্টু রয়েছেন পলাতক আসামির মধ্যে।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও সাবেক সংসদ সদস্য সাদেক খানসহ চারজন এ মামলায় কারাগারে আছেন। এছাড়া জামিনে রয়েছেন ১০ জন।
চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি থানার অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি লালদীঘি পূর্ব কর্পোরেট শাখার ভল্ট থেকে গ্রাহকের ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা উধাও হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ব্যাংকটির সিনিয়র কর্মকর্তা ও ক্যাশ ইনচার্জ মো. কামরুল হোসেন (৪১) এবং তার সহযোগী মো. জাফরুল্লাহ তানভীর (২৫)-কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশ ও ব্যাংক সূত্র জানায়, গত ৯ই আগস্ট দিনের নিয়মিত লেনদেন শেষে ভল্টে থাকা নগদ অর্থের হিসাব মেলাতে গিয়ে বড় ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়ে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের নথিপত্র ও হিসাব যাচাই করে কর্মকর্তারা ভল্টে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঘাটতি শনাক্ত করেন।
তদন্তে অর্থ সরানোর ক্ষেত্রে অভিনব কৌশলের তথ্যও উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এক হাজার টাকার নোটের বড় বান্ডিলের ভেতরে ১০০ টাকা বা তার চেয়ে কম মূল্যমানের নোট ঢুকিয়ে বান্ডিল তৈরি করা হতো। এভাবে ভল্টে পর্যাপ্ত টাকা রয়েছে—এমন একটি দৃশ্য তৈরি করে দীর্ঘ সময় ধরে ঘাটতি আড়াল করার চেষ্টা করা হয়।
পুলিশের অনুসন্ধান ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভল্ট থেকে সরিয়ে নেওয়া অর্থের একটি অংশ দিয়ে হাটহাজারীর উত্তর বুড়িশ্চর এলাকায় ‘ইশরাত অ্যাগ্রো’ নামে একটি গরুর খামার গড়ে তোলা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
খামারটিতে বর্তমানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি গরু রয়েছে। গ্রেপ্তার তানভীর খামারটির দায়িত্বে ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ঘটনার পর অগ্রণী ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার মোস্তাক আহমেদ বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন।
মামলার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের আদালতে হাজির করা হলে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়।
কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইকবাল হোসেন জানান, ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত মূল অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তাদের কাছ থেকে আলামত হিসেবে দুই জোড়া মোবাইল ফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের তথ্যসহ ৬৪ জিবির একটি পেনড্রাইভ জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ভল্টের বিপুল পরিমাণ অর্থ কীভাবে সরানো হলো, ঘটনায় আর কেউ জড়িত কি না এবং আত্মসাৎ করা অর্থের পুরোটা কোথায় সরানো হয়েছে—এসব বিষয় সামনে রেখে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
ফেনীর সোনাগাজীতে স্কুলছাত্রীকে মারধোর করে কানের দুল ও টাকা ছিনিয়ে নিল যুবদলকর্মীরা। বুধবার বিকালে স্কুল ছুটির পর মতিগঞ্জ আর.এম হাটকে উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে। জরুরি সেবা ৯৯৯ এ ফোন দিয়ে প্রাণে রক্ষা পায় ওই তরুণী। বিষয়টি তদন্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সোনাগাজী থানার ওসি।
জানা যায়, বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, মতিগঞ্জ আর.এম হাটকে উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে স্কুলের এক ছাত্রীকে টিনশেড একটি ঘরে আটকে রেখে মারধোর এবং দাবি করে ২ যুবক। অপর এক যুবক মেয়েটির পক্ষে কথা বলেন। তার নাম মিরাজুল ইসলাম। তাকেও এক পর্যায়ে মারধোর ওই ২ যুবক।
মিরাজ বলেন, তার সহপাঠী (ভুক্তভোগী ছাত্রী) স্কুল ছুটির পর কথা বলছিলেন। এমন সময় উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহবায়ক মেজবাউল রোমান এর সহযোগী স্থানীয় যুবদলকর্মী অয়ন (২১) ও মেহেদি (২২) তাদের নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। দুজনকে মারধোর করে টাকা দাবি করে এবং তাদের মোবাইলে ভিডিও ধারন করে। এক পর্যায়ে স্কুল ছাত্রী কানের দুল এবং উভয়ের কাছে থাকা টাকা ছিনিয়ে নেয়।
এব্যারে উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহবায়ক মোজবাউল রোমান বলেন, তারা দলীয়কর্মী। এ কারণে সম্পর্ক আছে, তবে তাদের ব্যক্তিগত অপরাধের দায় নিবে না যুবদল।
সোনাগাজী মডেল থানার ওসি আবুল হাসিম বলেন, জরুরি সেবা ৯৯৯ এ ফোন দেওয়ার পর পুলিশ পৌঁছার আগেই উভয় পক্ষ পালিয়ে যায়। ভাইরাল হওয়া ভিডিও তদন্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ফুরসন্দি ইউনিয়নের ধনঞ্জয়পুর গ্রামে সামাজিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে স্থানীয় বিএনপির দু’পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত প্রায় ১০ জন আহত হয়েছে।
আজ ১৩ই আগস্ট, বৃহস্পতিবার সকালে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানায়, সামাজিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ওই গ্রামের জাহিদ বিশ্বাস ও শাহাবুর রহমানের সমর্থকদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিলো। এরই জের ধরে বৃহস্পতিবার সকালে ধনঞ্জয়পুর গ্রামের দুই পক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে আহত হয় অন্তত ১০ জন।
খবর পেয়ে সদর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আহতদের উদ্ধার করে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতাল ও স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
ঝিনাইদহ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আসাদউজ্জামান বলেন, কয়েকদিন যাবত এলাকায় উত্তেজনা চলছিলো। সকালে খবর পাওয়ার সাথে সাথে সেখানে পুলিশ পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে নেওয়া হয়। এলাকায় এখন পরিস্থিত স্বাভাবিক রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা রেলকোচের ছাদ আরও শক্তপোক্ত করেছে ভারত। ভিড়ের সময়ে যাত্রীরা ট্রেনের ছাদে উঠে ভ্রমণ করেন—বাংলাদেশ রেলওয়ের এমন বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই ছাদের কাঠামো শক্তিশালী করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় রেলওয়ে।
বাংলাদেশের জন্য মোট ২০০টি এলএইচবি (লিঙ্কে হফম্যান বুশ) কোচ তৈরি করছে ভারত। এর মধ্যে প্রথম চালানের ১৯টি কোচ প্রস্তুত করেছে পাঞ্জাবের কাপুরথালার রেল কোচ ফ্যাক্টরি (আরসিএফ)।
এসব কোচের মধ্যে রয়েছে তিনটি এসি স্লিপার কার, তিনটি এসি চেয়ার কার, ১১টি নন-এসি চেয়ার কার এবং দুটি পাওয়ার কার।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, বাংলাদেশের যাত্রীদের প্রয়োজন ও বাংলাদেশ রেলওয়ের চাহিদা বিবেচনা করে এসব কোচে বেশ কিছু বিশেষ সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।
ভারতীয় রেলওয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভিড়ের সময় যাত্রীরা ছাদে ভ্রমণ করলে যে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, তা বিবেচনায় নিয়ে কোচের ছাদের কাঠামো আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
শুধু ছাদ নয়, বাংলাদেশের যাত্রীদের জন্য তৈরি এসব কোচে রাখা হয়েছে শিশু পরিচর্যার জন্য আলাদা কক্ষ এবং নামাজের স্থান। যাত্রীদের আরামের জন্য রয়েছে উন্নতমানের রিক্লাইনিং চেয়ার, স্টেইনলেস স্টিলের আর্মরেস্ট ও ফুটরেস্ট। চেয়ারে একাধিক অবস্থানে হেলানোর সুবিধাও রাখা হয়েছে।
নিরাপত্তার জন্য কোচগুলোতে থাকছে সিসিটিভি নজরদারি, যাত্রী অ্যালার্ম সিস্টেম এবং আংশিক খোলা যায় এমন জানালা।
প্রথম চালানের ১৯টি কোচ কারখানা থেকে বের হওয়ার পর বাংলাদেশে সরবরাহের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নতুন এসব কোচের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রীসেবায় আধুনিক সুবিধা যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের একটি পরিচিত বাস্তবতা—ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠা—নিয়েও ভারতীয় নির্মাতাদের বিশেষ প্রস্তুতির বিষয়টি সামনে এসেছে।
কক্সবাজারে মাদক মামলার তদন্ত ও আসামি শনাক্তকরণে ভয়াবহ গাফিলতির অভিযোগ সামনে এসেছে। ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় প্রকৃত আসামি নিজের পরিচয় গোপন করে পরিচিত এক ব্যক্তির নাম-ঠিকানা ব্যবহার করেছিলেন। সেই আসামি পরে জামিনে বেরিয়ে পালিয়ে যান। অথচ তার দেওয়া পরিচয়েই আদালতে মামলা চলে এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয় নিরপরাধ এক দিনমজুরের।
পুলিশের সাম্প্রতিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ওই ‘সোনা মিয়া’ আসলে মো. রমজান। আর বর্তমানে কারাগারে থাকা সোনা মিয়া এই মামলার আসামিই নন।
ঘটনাটি যেন বাস্তবের ‘আয়নাবাজি’—একজনের অপরাধের দায় গিয়ে পড়েছে আরেকজনের ঘাড়ে।
২০২০ সালের ২ মার্চ কক্সবাজার সদর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মামলার এজাহারে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে ‘সোনা মিয়া’ নামের একজনকে দেখানো হয়।
তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ডিবি পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ওই বছরের সেপ্টেম্বরে আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি।
তারপরও মামলার আসামির তালিকা থেকে তার নাম বাদ পড়েনি।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি ছিলেন মো. রমজান। তিনি নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়ে অন্য একজনের জন্মনিবন্ধনের তথ্য ব্যবহার করেছিলেন।
তদন্তে জানা যায়, রমজান ও প্রকৃত সোনা মিয়া একসময় রোহিঙ্গা শিবিরে এবং পরে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে বসবাস করতেন। সেই সুবাদে রমজান সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধনের তথ্য সম্পর্কে জানতে পারেন।
পুলিশের প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই তথ্য ব্যবহার করেই রমজান নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দেন।
মামলার পরবর্তী সময়ে তিনি জামিনে বেরিয়ে পালিয়ে যান। প্রকৃত রমজান থেকে যান আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিপরীতে তার দেওয়া পরিচয় বহনকারী সোনা মিয়ার নামেই চলতে থাকে মামলা।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আদালত এই মামলায় পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মামলার নথিতে থাকা ‘সোনা মিয়া’ও। পলাতক সোনা মিয়ার বিরুদ্ধে জারি হয় সাজা পরোয়ানা।
এরপর র্যাব-১৫ রামু থেকে সোনা মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।
কিন্তু কারাগারে যাওয়ার পর ওই ব্যক্তি আদালতে আবেদন করে জানান—তিনি এই মামলার আসামি নন। জীবনে কখনো ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হননি, এমনকি এই মামলায়ও তাকে কখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি।
আদালত বিষয়টি তদন্তের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন।
গত ৫ জুলাই কক্সবাজার সদর থানা-পুলিশ আদালতে যে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়, তাতে দুই ব্যক্তির পরিচয় ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে স্পষ্ট অমিল পাওয়া যায়।
২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি, অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে রমজানের বয়স তখন ছিল ২৫ বছর। তার মায়ের নাম সোনারা বেগম, স্ত্রীর নাম আয়েশা। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং ওজন ৫০ কেজি। দুই গাল ও ডান বাহুতে ক্ষতচিহ্ন ছিল।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া প্রকৃত সোনা মিয়ার বয়স ৩৪ বছর। তার মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন, স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে। উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি এবং ওজন ৪২ কেজি।
তার শরীরে শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে ডান বাহু, পেটের বাঁ পাশ ও পিঠের মাঝখানে তিল থাকার তথ্য রয়েছে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মো. আলী জেলা কারাগারে গিয়ে দুই সময়ের বন্দীর সংরক্ষিত ছবি, শনাক্তকরণ চিহ্ন ও আঙুলের ছাপ যাচাই করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
একই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আরেক আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও পুলিশ জানতে পারে, তিনি বর্তমানে কারাগারে থাকা সোনা মিয়াকে চেনেন না।
তদন্তে আরও উঠে আসে, বর্তমান সোনা মিয়া আগে কখনো গ্রেপ্তার হননি কিংবা কারাগারে বন্দী ছিলেন না।
সব মিলিয়ে পুলিশের তদন্তে নিশ্চিত করা হয়েছে—কারাগারে থাকা সোনা মিয়া এই মামলার আসামি নন; মামলার প্রকৃত আসামি রমজান।
ঘটনাটি সামনে আসার পর তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় আসামির পরিচয় যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল মন্নানের মতে, তদন্ত থেকে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত তদন্ত কর্মকর্তার চরম গাফিলতি ছিল। অন্য ব্যক্তির জন্মনিবন্ধনের তথ্য যাচাই না করেই অভিযোগপত্র দেওয়ার কারণেই প্রকৃত আসামি রমজান পালিয়ে যেতে পেরেছেন এবং নিরপরাধ সোনা মিয়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হয়ে কারাগারে বন্দী হয়েছেন।
তিনি ঘটনাটির তদন্ত দাবি করেছেন।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, কারাগারে থাকা সোনা মিয়া প্রকৃত আসামি নন এবং প্রকৃত আসামি রমজান—এ বিষয়ে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিবেদনটির ওপর আদালতের কোনো আদেশ এখনো পাওয়া যায়নি।
এদিকে কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের দাবি, তার স্বামী খেটে খাওয়া মানুষ এবং কখনো কোনো অপরাধ করেননি। রমজানের সঙ্গে তার পরিচয়ের কারণেই আজ তার স্বামীকে রমজানের অপরাধের খেসারত দিতে হচ্ছে।
একজনের পরিচয় চুরি করে আরেকজন পালিয়ে গেলেন। সেই পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে মামলা হলো, সাজা হলো মৃত্যুদণ্ড। আর শেষ পর্যন্ত যার নাম ব্যবহার করা হয়েছিল, সেই নিরপরাধ মানুষটিই এখন কারাগারে।
এই ঘটনায় শুধু একজন নিরপরাধ মানুষের জীবনে নেমে আসা বিপর্যয়ই নয়, প্রশ্ন উঠেছে তদন্তের মান, আসামি শনাক্তকরণ এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় পরিচয় যাচাইয়ের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও।
দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকার মধ্যেই নেপালে ফিরেছেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা।
বিদেশে চিকিৎসা শেষে প্রায় ছয় মাস পর ১৩ই আগস্ট, বৃহস্পতিবার দেশে ফেরেন নেপালি কংগ্রেসের এই প্রবীণ নেতা। তার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে রাজধানী কাঠমান্ডুতে সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়।
কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরমুখী সড়কে শত শত সমর্থক সারিবদ্ধ হয়ে দেউবাকে স্বাগত জানান। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় তিনি হাত নেড়ে ও হাসিমুখে সমর্থকদের অভিবাদনের জবাব দেন।
৮০ বছর বয়সী দেউবা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চিকিৎসার জন্য নেপাল ছাড়েন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তিনি অস্বীকার করে আসছেন।
গত এপ্রিলে অর্থপাচারের অভিযোগে দেউবার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে নেপাল পুলিশ। একই ধরনের মামলায় তার স্ত্রী ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরজু রানা দেউবার বিরুদ্ধেও পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
তবে দেউবার দেশে ফেরার পর তাকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা হবে কি না, তা নিয়ে নেপালে ব্যাপক আলোচনা ছিল।
নেপাল পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে বলেছেন, দেউবার মামলা ও তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি অর্থপাচার তদন্ত বিভাগের আওতাধীন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিমানবন্দর ও তার যাত্রাপথে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এর আগে নেপালের সুপ্রিম কোর্ট দেউবা দম্পতিকে গ্রেপ্তার না করার বিষয়ে অন্তর্বর্তী আদেশ দিয়েছিল বলে দেশটির সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে নেপালে তরুণদের নেতৃত্বে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাময়িক নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ থেকে শুরু হলেও পরে আন্দোলনটি দুর্নীতি, অর্থনৈতিক দুর্দশা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভে রূপ নেয়।
আন্দোলনের সময় বিভিন্ন সরকারি ও রাজনৈতিক স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। দেউবার বাসভবনও হামলার শিকার হয়। তার বাসভবন থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্ধারের দাবি এবং এ-সংক্রান্ত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে দেউবা এসব ভিডিওকে ভুয়া বলে দাবি করেছেন। তিনি ঘটনাটিকে ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে এর পেছনে কারা রয়েছে, তা জানেন না বলে তদন্ত কমিশনের কাছে দেওয়া বক্তব্যে জানিয়েছেন। দেউবার বাড়ি ও অন্যান্য সম্পত্তি থেকে কথিত অর্থ উদ্ধারের বিষয়টি আরও তদন্তের সুপারিশ করেছে সংশ্লিষ্ট কমিশন।
তরুণদের আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বালেন্দ্র শাহের নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে। এরপর দেশটির একাধিক হেভিওয়েট রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়।
এর আগে গত মার্চে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখককে ২০২৫ সালের তরুণদের আন্দোলন দমনে সহিংসতার অভিযোগে স্বল্প সময়ের জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
এদিকে দেউবার দেশে ফেরার সময়টি নেপালি কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) থেকে তার দলের তিন দিনব্যাপী একটি জাতীয় সম্মেলন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে দেউবার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগের আইনি চাপের মধ্যেই দেউবার দেশে ফেরা নেপালের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে তার সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতি প্রবীণ এই নেতার রাজনৈতিক প্রভাব এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি—এমন বার্তাও দিচ্ছে।