অটিজম নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে যা করা উচিত
অনলাইন নিউজ ডেক্স

আজ ২ এপ্রিল। ১৮তম বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। যা পুরো মাসজুড়ে চলবে। মাসটি মূলত শুধু যে অটিজম সচেতনতা বৃদ্ধি করে তা নয় , বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু এবং বয়স্কদের সমাজে গ্রহণ করার জন্য জোর দেওয়া হয়। অটিস্টিক শিশু বা ব্যক্তিদের জীবনধারা সম্পর্কে জানতে, প্রত্যেকের নিজস্ব বোধগম্যতা বৃদ্ধি করতে, তাদেরকে সমাজে অন্তর্ভুক্তি করতে এবং তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে এ মাসটিতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়।পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ৩৬ জন শিশুর মধ্যে একজনের অটিজম আছে, যা আগের চুয়াল্লিশ জনের মধ্যে একজনের চেয়ে বেশি। প্রায় ১০০ জন ছেলের মধ্যে চারজন এবং ১০০ জন মেয়ের মধ্যে একজন অটিজমের আক্রান্ত। মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের অটিজমের প্রবণতা প্রায় চার গুণ বেশি। সিডিসির পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে যে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD) মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের মধ্যে ৪.৩ গুণ বেশি দেখা যায়। চাইল্ড মাইন্ড ইনস্টিটিউটের মতে, \"মেয়েরা প্রায়শই রোগ নির্ণয়ের বাইরে থাকে কারণ তারা অটিজমের স্টেরিওটাইপগুলোতে খাপ খায় না এবং তারা ছেলেদের তুলনায় লক্ষণগুলো আরও ভালোভাবে লুকিয়ে রাখে।এ দিনটি অটিজম আক্রান্ত শিশু ও ব্যক্তিদের অধিকারের স্বীকৃতি দেয় এবং তাদের প্রতি সচেতনতা ছড়িয়ে দেয়। এ অবস্থা সাধারণত শৈশবকালে শুরু হয় এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার হল একটি মানসিক বিকাশগত সমস্যা যেখানে আচরণগত এবং যোগাযোগে সমস্যা হয়; যা একজন শিশু বা ব্যক্তির সামাজিক মিথস্ক্রিয়া বা ইন্টারেকশন নেভিগেট করার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে এবং পুনরাবৃত্তিমূলক এবং সীমাবদ্ধ আচরণের কারণও হয়।\"অটিজম\" শব্দটির প্রথম ঐতিহাসিক আবির্ভাব ঘটে ১৯১১ সালে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ইউজেন ব্লিউলারের মাধ্যমে, যিনি এই শব্দটি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কিছু লক্ষণ বর্ণনা করেছিলেন যেগুলোকে সিজোফ্রেনিয়ার সাধারণ লক্ষণ হিসেবে চরম সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হিসেবে বিবেচনা করা হত। সেই ক্রমানুসারে, ১৯৪৩ সালে, যখন শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ লিও ক্যানার তার \"অটিস্টিক ডিসর্টেন্সেস অফ অ্যাফেক্টিভ কন্টাক্ট\" প্রবন্ধে অটিজমকে একটি সামাজিক ও মানসিক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন এবং ১৯৪৪ সালে হ্যান্স অ্যাসপারগার তার \"অটিজম সাইকোপ্যাথোলজি আর্টিকেল\" প্রকাশ করেছিলেন যেখানে তিনি অটিজমকে স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তার একটি ব্যাধি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন যাদের সামাজিক এবং যোগাযোগ দক্ষতায় অসুবিধা হয়। এই প্রবন্ধগুলি ১৯৮০ সালে অটিজমকে স্কিজোফ্রেনিয়া থেকে আলাদা একটি মানসিক বিকাশ জনিত সমস্যা হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল।অটিজমের উপর ক্রমাগত অনুসন্ধান এবং গবেষণার মাধ্যমে, \"জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ\" \"রেজোলিউশন ৬২/১৩৯\" অনুসারে প্রতি বছর ২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস নির্ধারণ করে এবং ২০০৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর গৃহীত হয়, যাতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত শিশু বা ব্যক্তিদের সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করা যায়, সুস্থতা এবং অন্তর্ভুক্তি উন্নত করার নতুন উপায় খুঁজে বের করার গবেষণাকে সমর্থন করা যায়। অবশেষে, অটিজমের ধারণাটি ২০১৩ সালে \"আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন\" দ্বারা \"ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল অফ মেন্টাল ডিসঅর্ডারস\" এর পঞ্চম সংস্করণে বিকশিত হয়েছিল, অটিজম এবং সম্পর্কিত অবস্থার সমস্ত উপশ্রেণী বা সাব ক্যাটাগরিকে একটি একক বিভাগে একত্রিত করে, যার মধ্যে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, তীব্রতা এবং লক্ষণগুলির উপস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত ছিল।অটিজম সম্পর্কে মানুষকে শিক্ষিত করা এবং এর অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৭ সালের এপ্রিলে প্রথম অটিজম সচেতনতা মাস পালিত হয়েছিল। তারপর থেকে প্রতি বছর নতুন নতুন লক্ষ্য নিয়ে দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে।আমাদের শিশুদের পাঠক্রমে অটিজমের একটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে সচেতনতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে স্কুলে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা সম্ভব যেখানে সাধারণ অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরাও এসে অটিজম এবং এটি কীভাবে মানুষকে প্রভাবিত করে সে সম্পর্কে জানাতে পারবে।সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ বিষয়ে যারা কাজ করে অভিজ্ঞ, তাদের অভিজ্ঞতা শোনানোর ব্যবস্থা করা যায়। একটি অটিস্টিক শিশু বা ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের আমন্ত্রণ জানানোর মাধ্যমে সমাজের অটিজমের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভবপর হবে। সরাসরি অভিজ্ঞতার কথা শুনে শিক্ষার্থীরা আরো বেশি উপকৃত হবে। ক্লাসরুমে একটি স্নায়ু বৈচিত্র নিশ্চিতকারী শ্রেণিকক্ষ পরিবেশ বা নিউরোডাইভারসিটি এনহান্সিং এনভারমেন্ট তৈরি করা সম্ভব, যেখানে যেসব শিশু রেগুলার স্কুলে যাবে তাদের কোনো সমস্যা হলে এখানে এসে বিশ্রাম নেবে। সংবেদনশীল বান্ধব স্থান বা সেঞ্চুরি ফ্রেন্ডলি স্পেস এর পক্ষে সবাইকে এখন আমাদের কথা বলতে হবে যাতে অন্যান্য শিক্ষার্থীরা তাদের বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুটির জন্য সহানুভূতি অনুভব করে। অবশ্যই প্রতিটি ক্লাসে অটিজম সচেতনতা দিবস উদযাপন করার পরিকল্পনা থাকতে হবে, সেটা পোস্টার লাগানো বা গল্প শেয়ার করার মাধ্যমেও হতে পারে। অর্থাৎ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের ইনক্লুসিভ শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে হবে। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপেই হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বের কাছাকাছি নিয়ে আসা এবং তাদের প্রতিভাকে কাজে লাগানো।লেখক: ডা. সেলিনা সুলতানাকনসালটেন্ট, নিউরোডেভলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার এবং চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট এন্ড পেডিয়াট্রিক ডিপার্টমেন্ট, বেটার লাইফ হসপিটাল।
