ঈদের মতো ভিড় টার্মিনালে, রিকুইজিশনে বাস সংকট


ঈদের মতো ভিড় টার্মিনালে, রিকুইজিশনে বাস সংকট
ভোট দিতে লাখো মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে যাচ্ছেন। ঈদযাত্রার মতো যাত্রীর ঢল নেমেছে রাজধানীর বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল এবং রেল স্টেশনে। নির্বাচনী দায়িত্বের জন্য প্রশাসন বাস রিকুইজিশন করায়, যানবাহনের তীব্র সংকটে আজ মঙ্গলবার দিনভর ভুগেছেন যাত্রীরা। নির্বাচন উপলক্ষে এবার তিন দিনের ছুটি। আজ ছিল শেষ কর্ম দিবস। তবে দুপুর থেকেই বাস টার্মিনাল, রেল স্টেশনে মানুষের ঢল নামে। একদিকে বাস সংকট, অন্যদিকে যাত্রীর ঢল। এই সুযোগে বাসগুলোতে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ ভাড়া নেওয়া হয়েছে। ট্রেনে বাড়তি ভাড়া না থাকলেও, তিল ধারনের ঠাঁই গতকাল সোমবার রাত থেকে ঢাকার কমলাপুর স্টেশন ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলোতে। আজ মঙ্গলবার দুপুর দেড়টায় ছেড়ে যাওয়া ময়মনসিংহ-নেত্রকোনার মোহনগঞ্জগামী মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসে তিল ধারনের ঠাঁই ছিল না। প্রতি ট্রেনেই শত শত যাত্রী ছাদে উঠেন। রেল নিরাপত্তা বাধা দিয়েও যাত্রীদের ঠেকাতে পারেনি। দুপুরে জামালপুরগামী ট্রেনে ১০ মিনিটের মধ্যে টিকিট শেষ হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে যাত্রীদের। জামালপুর মেলানন্দের বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, ‘চারদিনের ছুটি দিয়েছে। ভোটার হওয়ার পরে কোনোবারই ভোট দেওয়ার সুযোগ হয়নি। তাই পরিবার নিয়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য এসেছি। তবে ১০ মিনিটের মধ্যেই কাউন্টারে বলছে টিকিট নেই।’ মহাখালী বাস টার্মিনালে আজ বিকেল সাড়ে পাঁচটায় গিয়ে দেখা যায়, ইউনাইটেড পরিবহন এবং বিলাস পরিবহনের সামনে কয়েক হাজার যাত্রী টিকিটের লাইনে রয়েছেন। কেউ কেউ আট ঘণ্টা ধরে অপেক্ষায় ছিলেন টিকেটের জন্য। কাউন্টার থেকে কর্মীরা মাইকে বারবার ক্ষমা প্রার্থনা করছিলেন, যাতে ভিড় উত্তেজিত না হয়। মাইকে বারবার ঘোষণা দেওয়া, যানজটের কারণে গাজীপুর থেকে বাস ঢাকায় ফিরতে পারছে না। কোম্পানিগুলো অধিকাংশ বাস নির্বাচনের ডিউটির জন্য জেলা প্রশাসন রিকুইজিশন করেছে। তাই যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত বাস নেই। যাত্রীদের অনুরোধ করা হচ্ছে, তারা যেন ফিরে যান কিংবা বিকল্প ব্যবস্থা করেন। মহাখালী টার্মিনালে ভিড় করা যাত্রীদের গন্তব্য ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, নরসিংদী এবং উত্তরবঙ্গের জেলাগুলো। মাহমুদ আলম নামে এক তরুণ জানালেন, তিনি জামালপুর-৩ আসনের ভোটার। ভোট দিতে বাড়ি যাচ্ছে। আগের নির্বাচনগুলোতে ভোট দিতে গিয়েছিলেন কিনা- প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কখনও যাইনি। ২০১৩ সালে ভোটার হয়েছিল। কিন্তু জীবনে কখনও ভোট দেইনি। এবার প্রথম ভোট দেব। এজন্যই যাচ্ছি। কিন্তু বাস নেই। ছয় ঘণ্টা ধরে বসে আছি।’ এই আলাপচারিতা চলার সময় ইউনাইটেড পরিবহনের কাউন্টার থেকে মাইকে ঘোষণা আসে, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট পর্যন্ত একটি বাস যাচ্ছে। যারা দাঁড়িয়ে যেতে রাজি, তাঁরা চাইলে বাসটিতে ময়মনসিংহ যেতে পারেন। ৩০-৩৫ জন যাত্রী বাসটির উদ্দেশ্যে ব্যাগ-বোচকা নিয়ে দৌড়ানো শুরু করেন। ৩২০ টাকার ভাড়া নেওয়া হয় ৩৫০ টাকা। তারপরও আসন পাননি যাত্রীরা। দাঁড়িয়ে পরিবহনের বাড়তি ভাড়া নেওয়া হয়। তারপরও জায়গা হয়নি শামীম ইসলাম নামে এক যুবকের। তিনি বলেন, দাঁড়িয়েই যেতে চান। কিন্তু বাসের ভেতরে পা ফেলার জায়গা নেই। স্ত্রী-সন্তানকে এই পরিস্থিতিতে যাওয়া সম্ভব না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার বারবার আহ্বান জানিয়েছে ভোটাররা যেন ভোট দেন। কিন্তু গ্রামে ফেরার কোনো ব্যবস্থাই করেনি। কীভাবে লাখ লাখ মানুষ ভোট দেবে। দায় স্বীকার করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবীর খান। তিনি বলেছেন, ‘সত্যি বলতে এত মানুষ গ্রামে যাবেন ভাবনায় ছিল না। তাই প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। এখন চেষ্টা চলছে ভোগান্তি লাঘবের। আসলে ভাবতেই পারিনি ঈদের মত যাত্রীর ঢল নামবে, এত মানুষ ভোট দিতে যাবে। এ কারণে প্রস্তুতি ছিল না। মঙ্গলবার বিকেল থেকে চেষ্টা করছি, কীভাবে সমাধান করায়। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা টার্মিনালে যাচ্ছেন। একটা উপায় বের করার চেষ্টা করছি। রিকুইজিশন করা বাসগুলো নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত যাত্রী পরিবহনে দেওয়া যায় কিনা- চেষ্টা করছি। বাড়তি ভাড়া কেউ যেন নিতে না পারে, এই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ শুধু মহাখালী নয়, গাবতলী টার্মিনালেও যাত্রীর ঢল নামে। এই টার্মিনালেও বাড়তি ভাড়া নেওয়া হয়। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ভোটার আব্দুল কুদ্দুস। বেসরকারি একটি ব্যাংকে কর্মরত এ ভোটার জানান, ‘নির্বাচনী প্রতিটি দলকে সহনশীল আচরণ করতে হবে। যেই বিজয়ী হোক, পরাজিত দলতে তাকে গ্রহণ করতে হবে।’ এদিকে, বাসে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া নেওয়ায় গাবতলী বাস স্ট্যান্ডে অভিযান চালিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সংস্থাটির উপ–পরিচালক বিকাশ চন্দ্র দাসের নেতৃত্বে এ অভিযান চালানো হয়। এসময় মানিকগঞ্জগামী সেলফি পরিবহনে ১৮৮ টাকার জায়গায় ৪০০ টাকা ভাড়া নেওয়ায় ৫০ হাজার, জলঢাকাগামী রানী পরিবহনে ৯৫০ টাকার জায়গায় ১২০০ টাকা নেওয়ায় ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।