ঢাকায় গুলি করে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে হত্যা
অনলাইন নিউজ ডেক্স
ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় স্টার কাবাব হোটেলের পেছনের গলিতে গতকাল বুধবার রাত সোয়া ৮টার দিকে।
এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা সুফিয়ান বেপারি মাসুদ (৫০) গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তিনি কারওয়ান বাজার ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। তাঁর পাঁজরে গুলি লেগেছে। তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
মুছাব্বিরের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর। মাসুদের বাড়ি কেরানীগঞ্জ। মুছাব্বির স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন তিনি।
গতকাল রাতে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করেছে পুলিশ। এতে দেখা গেছে, গুলির পর অন্ধকার গলি থেকে দুই যুবক দৌড়ে স্টার কাবাব-সংলগ্ন কারওয়ান বাজার এলাকার প্রধান সড়ক হয়ে পালিয়ে যায়। তাদের মধ্যে একজনের মুখমণ্ডল মাফলার দিয়ে ঢাকা ছিল। পুলিশের ধারণা, হত্যার সঙ্গে জড়িত ওই দুই যুবক ঘটনাস্থলে ওত পেতে ছিল। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মুছাব্বির ও মাসুদ স্টার কাবারের পেছনের গলি হয়ে আবাসিক এলাকার দিকে দৌড়াচ্ছিলেন।
নতুন বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৯টি আলোচিত হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ভোটের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যখন জনমনে উদ্বেগ, ওই সময় ঢাকায় হত্যার শিকার হলেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুছাব্বির।
মুছাব্বির খুন হওয়ার খবরে গতকাল রাতে কারওয়ান বাজারে সার্ক ফোয়ারা মোড় অবরোধ করেন তাঁর সমর্থকরা। টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন তারা। হত্যার বিচার চেয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন। এতে যান চলাচল ব্যাহত হয়। আশপাশের সড়কে যানজট তৈরি হয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে সেনাবাহিনী তাদের এক পাশে সরিয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। পরে আবার বিক্ষোভকারীরা সড়কে উঠে এসেছে। তাদের ঘিরে রেখেছিল সেনাবাহিনী ও পুলিশ।
রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান বলেন, ঘটনাস্থল থেকে তিন রাউন্ড গুলির খোসা জব্দ করা হয়েছে। সিসি ফুটেজে সন্দেহভাজন দুজনকে দেখা গেছে। আমরা ধারণা করছি, তারা আগে থেকে ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থান করছিল।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের এডিসি ফজলুল করিম বলেন, স্টার কাবাবের পাশের গলিতে দুজনকে গুলি করা হয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় মুছাব্বিরকে উদ্ধার করে পাশের বিআরবি হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর পেটে গুলি লেগেছিল।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৬ নম্বর ওয়ার্ড (কারওয়ান বাজার এলাকা) বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল মজিদ মিলন বলেন, মুছাব্বির বসুন্ধরা সিটির পেছনে কাজীপাড়ায় নিজ বাড়িতে পরিবার নিয়ে বাস করতেন। গতকাল বুধবার সন্ধ্যার পর তিনি শরীয়তপুর বিএনপির ৪০ নেতাকর্মী নিয়ে স্টার কাবাবের দোতলায় বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে রাত ৮টার দিকে প্রায় সবাই চলে যান। কিছুক্ষণ পর মুছাব্বির, মাসুদ, নুরুল আলম ও মজিদ স্টার কাবাবের সামনে দাঁড়ান। এ সময় একটি মাইক্রোবাস এসে সেখানে থামে। ওই মাইক্রোবাস থেকে লক্ষ্মীপুর বিএনপির এক নেতা নেমে মুছাব্বিরের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি ওয়াসা ভবনে যাবেন বলে মুছাব্বিরকে জানান। তখন ওই নেতার সঙ্গে মজিদ ও নুরুল আলমকে ওয়াসা ভবনে যেতে বলেন মুছাব্বির।
মিলন বলেন, ‘আমরা যাওয়ার মিনিট পাঁচেক পরই মাসুদ ফোন করে গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর জানান। এর পরই আমরা এসে দুটি ভ্যানে দুজনকে নিয়ে বিআরবি হাসপাতালে যাই। সেখান থেকে মাসুদকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।’
প্রত্যক্ষদর্শী নাইম ইসলাম রাত সাড়ে ১০টায় বলেন, ঘটনাস্থল থেকে আনুমানিক ৬০ ফুট দূরে একটি দোকানের সামনে রাত সোয়া ৮টার দিকে চা পান করছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পাই। এরপর দেখি রক্তাক্ত অবস্থায় দুজন দৌড়াচ্ছেন। আনুমানিক ৫০ গজ দূরে গিয়ে তারা রাস্তায় পড়ে যান। স্থানীয়রা তাদের দুজনকে দুটি ভ্যানে হাসপাতালে নিয়ে যান।
ঘটনাস্থল-সংলগ্ন একটি ভবনের তিনতলার বাসিন্দা আবির হোসেন বলেন, শব্দ পেয়ে তিনি বাসা থেকে নেমে আসেন। ততক্ষণে লোকজন জড়ো হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ আসে। পুলিশকে গুলির খোসা উদ্ধার করতে দেখেন তিনি।
জোবায়ের হোসেন জাবেদ নামে আরেকজন বলেন, ‘গুলির পর ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। মুছাব্বির ভাই আমার নেতা ছিলেন।’
পুলিশ সূত্র জানায়, রাত ৮টা ২০ মিনিটে তেজগাঁও তেজতুরীবাজার এলাকায় অজ্ঞাতপরিচয় কয়েক ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে আজিজুল হক মুছাব্বিরকে গুলি করে। প্রাথমিকভাবে তাঁকে উদ্ধার করে বিআরবি হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর দলীয় নেতাকর্মীদের অবস্থান করতে দেখা গেছে। গুলিবিদ্ধ নেতার ভর্তির ঘটনায় বিআরবি হাসপাতালের সামনে বিএনপির নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, আশপাশের ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হবে। হত্যার কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ফারুক হোসেন জানান, ইতোমধ্যে মাসুদের অস্ত্রোপচার হয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারাদেশে দুর্বৃত্তদের হামলা, নির্যাতন ও গুলিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ১১১ নেতাকর্মী নিহত হন। এ ছাড়া সারাদেশে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হন ১০২ জন। আহত হন চার হাজার ৭৪৪ জন।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে খুনোখুনি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আছে উদ্বেগ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক পর্যায়ে এখনও পৌঁছেনি। রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, ব্যক্তিগত শত্রুতাকে কেন্দ্র করে প্রাণ ঝরছে। নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা গভীর হচ্ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
