দেশে ঢুকে বিয়ে করে ফের কলকাতায়


দেশে ঢুকে বিয়ে করে ফের কলকাতায়
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর যুবলীগ নেতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি কলকাতায় রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ভারতে পালিয়ে যায় সে। তার সঙ্গে আছে আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন নেতা। গত বছরের সেপ্টেম্বরে অবৈধপথে দেশে ঢুকে দ্বিতীয় বিয়ে করে বাপ্পি। পরে স্ত্রীকে নিয়ে ফের ভারতে চলে যায়। সেখান থেকেই হাদি হত্যার পুরো মিশন পরিচালনা করেছে বাপ্পি। হাদিকে গুলি করার পর শুটার ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীরকে নির্বিঘ্নে ভারতে পালানোর ব্যবস্থাও করেছে সে। হাদি হত্যা মামলার চার্জশিটে (অভিযোগপত্র) অভিযুক্ত ১৭ জনের মধ্যে পরিকল্পনাকারী হিসাবে বাপ্পির নাম উল্লেখ করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। তবে বাপ্পিসহ ভারতে পলাতক অন্য খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে পুলিশের পক্ষ থেকে এখনো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পুলিশের দাবি, খুনিরা অবৈধ পথে ভারতে গেছে। ফলে তাদের সেখানে অবস্থানের অফিশিয়াল তথ্যপ্রমাণ নেই। এ কারণে তাদের ফেরাতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ইন্টারপোলের কাছে সহায়তা চাওয়া যাচ্ছে না। তবে আদালতের অনুমতি পেলে ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করা হবে। ডিএমপির ডিবির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা শুক্রবার বিকালে বলেন, আমাদের কাছে সর্বশেষ তথ্য হলো-বাপ্পি এখন কলকাতায় আছে। সে সেপ্টেম্বরে অবৈধপথে বাংলাদেশে ঢোকে। তখন সে দ্বিতীয় বিয়েও করে। মাদারীপুরের শিবচরে এক মেয়েকে বিয়ে করে তাকে সঙ্গে নিয়ে ফের অবৈধপথে ভারতে চলে যায়। সেখানে বসেই হাদি হত্যার পরিকল্পনা করে। বাপ্পিকে দেশে ফেরাতে উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। আদালত অনুমতি দিলে ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করা হবে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ইন্টারপোলের কাছে তখনই চিঠি লেখা যায় যখন অফিশিয়াল চ্যানেলে পাওয়া যায় অপরাধী কোন দেশে আছে। অথবা আনঅফিশিয়াল চ্যানেলে যখন তদন্ত কর্মকর্তা নিশ্চিত হন তখন আদালতের অনুমতি নিয়ে তাকে ফেরাতে ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করতে পারেন। সূত্র বলছে, তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর থাকলেও পুরো রূপনগর ও পল্লবী এলাকায় তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার ছত্রছায়ায় অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, জবরদখল, বাড়িদখল, খুন-রাহাজানিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ছিল বাপ্পি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট রাজধানীর রূপনগরের কাউন্সিলর কার্যালয়ে যায় সে। ওই বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগের পতনের পর বাপ্পি ভারতে চলে যায়। তখন থেকেই বাপ্পি কলকাতার রাজারহাটের ওয়েস্ট বেড়াবেড়ি মেঠোপাড়া এলাকার ঝনঝনগলির একটি চারতলা ভবনের দ্বিতীয় তলার এ-৩ ফ্ল্যাটে অবস্থান করে আসছিল। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) পর্যন্ত এই ফ্ল্যাটেই ছিল বাপ্পি। তার সঙ্গে ছিল পলাতক শেরেবাংলা নগর থানার স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মুশফিকুর রহমান উজ্জ্বল, একই থানার স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি সজিবুল ইসলাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওমর শরীফ। তবে ৬ জানুয়ারি হাদি হত্যা মামলার চার্জশিটে নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি ডিবি প্রকাশ করার পর সেখান থেকে সটকে পড়ে বাপ্পি। তার সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে জানা যায়নি। সূত্র বলছে, বাপ্পি ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন কলকতার রাজারহাটের ওয়েস্ট বেড়াবেড়ি মেঠোপাড়া এলাকায় পুলিশ পরিচয়ে আত্মগোপনে রয়েছে। রূপনগরের মিল্কভিটা রোডে চৌধুরী ভিলায় থাকেন বাপ্পির মা। তিনি সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেছেন, আমার ছেলে এই হত্যার সঙ্গে জড়িত এটা বিশ্বাস করি না। মোবাইলে কারও সঙ্গে কথা বললেই সে খুনি হয়ে গেল-এমন প্রশ্ন তোলেন বাপ্পির মা। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক মাসের মাথায় এসে ৬ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। চার্জশিটে ১৭ জনকে অভিযুক্ত করা হলেও হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। বলা হয়েছে, রাজনৈতিক কারণেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ডিবির তথ্যমতে, চার্জশিটভুক্ত ১৭ আসামি হলো-ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭), কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া তার সহযোগী মোটরসাইকেলচালক আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী আলমগীর হোসেন (২৬), ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি (৪৩), আদম পাচারের দালাল ফিলিপ স্নাল (৩২), শুটার ফয়সালের ভগিনীপতি মুক্তি মাহমুদ (৫১), বোন জেসমিন আক্তার (৪২), বাবা মো. হুমায়ূন কবির (৭০), মা হাসি বেগম (৬০), স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা (২১), ফয়সালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মো. কবির (৩৩), নুরুজ্জামান ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), দালাল সিবিয়ন দিও (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), ফয়সালের ভগিনীপতি আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) এবং সহযোগী ফয়সাল (২৫)। এর মধ্যে ফয়সাল করিম মাসুদ, আলমগীর শেখ, তাইজুল ইসলাম বাপ্পি, জেসমিন আক্তার ও মুক্তি মাহমুদ এখনো পলাতক। ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা অবস্থায় হাদির মাথায় গুলি করা হয়। মোটরসাইকেলে থাকা হামলাকারীরা পরিকল্পনা অনুযায়ী মুহূর্তের মধ্যেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও ১৮ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এ ঘটনায় ১৪ ডিসেম্বর মামলা হয় পল্টন থানায়। এ মামলার বাদী ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের। সূত্র- যুগান্তর