বিএনপির চেয়ারম্যান হলেন তারেক রহমান


বিএনপির চেয়ারম্যান হলেন তারেক রহমান
বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছেন তারেক রহমান। চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে চেয়ারম্যান পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। শুক্রবার রাতে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নেতাদের সর্বসম্মতিক্রমে শূন্যপদে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। এদিকে এ খবরে সারা দেশের নেতাকর্মীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অনুরোধে পূর্বঘোষিত উত্তরাঞ্চলে তারেক রহমানের চার দিনের সফর স্থগিত করা হয়েছে। স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। কাল রোববার থেকে এ সফর শুরু হওয়ার কথা ছিল। নেতাকর্মীদের মতে, দীর্ঘ বছর ধরে দক্ষতার সঙ্গে বিএনপিকে পরিচালনা করছেন তারেক রহমান। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ থেকেছেন সারা দেশের নেতাকর্মীরা। তার দূরদর্শী নানা সিদ্ধান্ত বিএনপিকে এখন ব্যাপক জনপ্রিয় দলে পরিণত করেছে। চেয়ারম্যান হওয়ায় সর্বস্তরের নেতাকর্মী আনন্দিত। এখন দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদেও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পরিবারের কাউকে দেখতে চান তারা। এই পদে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও আলোচনা রয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত জীবন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর সপরিবারে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। এর কয়েকদিন পর ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তার মা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পান। বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭(গ) ধারায় দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের কর্তব্য, ক্ষমতা ও দায়িত্বের উপধারা ২ অনুযায়ী, চেয়ারম্যানের সাময়িক অনুপস্থিতিতে তিনিই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসাবে চেয়ারম্যানের সমুদয় দায়িত্ব পালন করবেন। এই ধারার নিয়মে তারেক রহমান ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। সেই থেকে তিনি এ দায়িত্ব পালন করছেন। মূলত তখন থেকেই তারেক রহমান বিএনপি পরিচালনা করে আসছেন। এখন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গঠনতন্ত্রের ৭(গ) ধারায় দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের কর্তব্য, ক্ষমতা ও দায়িত্বের উপধারা ৩ অনুযায়ী চেয়ারম্যান হয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, যে কোনো কারণে চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান বাকি মেয়াদের জন্য চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরবর্তী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে বহাল থাকবেন। রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে রাত সাড়ে ৯টা থেকে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে স্থায়ী কমিটির বৈঠক। এতে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান সভাপতিত্ব করেন। তারেক রহমান ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে। তার ডাকনাম ‘পিনো’। তারেক রহমান মাত্র ২২ বছর বয়সে ১৯৮৮ সালে বগুড়া জেলার গাবতলী থানা বিএনপির সদস্য হন। আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনে যোগ দেওয়ার আগেই তিনি রাজনীতিতে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তারেক রহমান তার মা খালেদা জিয়ার সহযোগী হিসাবে সারা দেশে নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেন। ২০০১ সালের নির্বাচনেও মায়ের পাশাপাশি তারেক রহমান দেশব্যাপী নির্বাচনি প্রচারণা চালান। সে বছর বিএনপি ক্ষমতায় আসার পেছনেও তারেক রহমানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হয়। এই নির্বাচনি প্রচারণায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাজনীতির প্রথম সারিতে তার সক্রিয় আগমন ঘটে। ২০০২ সালে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন তিনি। এরপরই দেশব্যাপী দলের মাঠপর্যায়ের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে ব্যাপক গণসংযোগ শুরু করেন। মূল সংগঠনসহ যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের উদ্যোগে তৃণমূল সভা আয়োজন করেন। মূলত এই জনসংযোগ কার্যক্রমের ফলে দলের নেতাকর্মী ও তরুণদের মাঝে তারেক রহমান শুধু বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সন্তানের পরিচিতির বাইরেও দলের একজন দক্ষ সংগঠক ও সক্রিয় নেতা হিসাবে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেন। তার এই সফলতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে বিরোধী পক্ষ অপপ্রচার শুরু করে। তবে এর কোনোটারই ভিত্তি ছিল না। ওই অপপ্রচারের সুদূরপ্রসারী প্রভাবে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময়ে তাকে কারাগারে যেতে হয়, নির্যাতনের শিকার হতে হয়। একপর্যায়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডনেও যান। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে দল পরিচালনায় সম্পৃক্ত হতে থাকেন। দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝেও আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠেন তারেক রহমান। তবে সেখানেও বাধার সম্মুখীন হতে হয়। আওয়ামী লীগ সরকার উচ্চ আদালতের মাধ্যমে এক আদেশে তার বক্তব্য-বিবৃতিও প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে, যা গত বছরের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের আগ পর্যন্ত ছিল। ২০০৯ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে এবং ২০১৬ সালে ৬ষ্ঠ কাউন্সিলে তারেক রহমান দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসাবে যুক্তরাজ্য থেকেই দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সেখান থেকে সব সময় ভার্চুয়ালি দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, নেতাকর্মীদের প্রতিও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিতেন। তারেক রহমান ১৯৯৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান, সাবেক যোগাযোগ ও কৃষিমন্ত্রী রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের মেয়ে ডা. জোবাইদা রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের একমাত্র মেয়ে জাইমা রহমান লন্ডনের কুইনমেরি ইউনিভার্সিটি থেকে আইন শাস্ত্রে ল’ ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের গত প্রায় ১৬ বছর বিএনপির বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলা-মামলা, খুন-গুম-নির্যাতন সত্ত্বেও তারেক রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার কারণে দল ছিল ঐক্যবদ্ধ। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি ঐক্য ও সাধারণ মানুষের পক্ষে কাজ করার বার্তা দিয়ে জনসমর্থন আরও বাড়িয়েছেন। তারেক রহমানের দূরদর্শী রাজনীতির ভূয়সী প্রশংসা করে নেতারা বলেন, গতানুগতিক রাজনীতির বাইরে তারেক রহমানের ইতিবাচক ও পরিবর্তনের রাজনীতি জাতির সামনে নতুনভাবে আশার সঞ্চার করেছে। মানুষের মন জয় করতে তিনি নিচ্ছেন একের পর এক যুগান্তকারী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। তার দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও রাষ্ট্র নিয়ে ভাবনা জনগণ গ্রহণ করেছে। বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রেখে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল হিসাবে এক অনন্য জায়গায় নিয়ে গেছেন তারেক রহমান। ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এর সুফল দেশবাসী পাবেন বলে দেশের রাজনীতিতে আলোচনা শুরু হয়েছে। মির্জা ফখরুলের ব্রিফিং : স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, বৈঠকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করায় স্থায়ী কমিটি সন্তোষ প্রকাশ করেছে। চেয়ারম্যান দল পরিচালনার ক্ষেত্রে যেন সফল হতে পারেন সেজন্য স্থায়ী কমিটি দোয়া করেছে। খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতার সময় তারেক রহমানের দল পরিচালনার বিষয়টি তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, তারেক রহমান তার নিজ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতায় অত্যন্ত সফলভাবে বিএনপিকে পরিচালনা করেছেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে ছাত্র-জনতার যে অভ্যুত্থান হয়েছে, তারও নেতৃত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। উত্তরাঞ্চলে চার দিনের সফর স্থগিত করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদসহ অন্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং কিছু পারিবারিক দায়িত্ব পালনের জন্য তারেক রহমান উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলা সফর করবেন বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যানের এই সফর স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচন বানচালের চক্রান্ত চলছে দাবি করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, নির্বাচন বিভিন্নভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ও বানচাল করার জন্য একটা মহল বিভিন্নভাবে চক্রান্ত করছে। তারা ইতোমধ্যেই ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা করেছে। একইভাবে বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক দলের নেতাদের, বিশেষ করে বিএনপির কয়েকজনকে গুলি করা হয়েছে এবং তারা শহীদ হয়েছেন। কয়েকদিন আগে স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সদস্য সচিব মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। অবিলম্বে হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা বারবার সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছি, এই ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকলে এ দেশে নির্বাচনের পরিবেশ বিনষ্ট হবে। নির্বাচনের পরিবেশ যেন বিনষ্ট না হয়, সেজন্য সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য আবারও সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে আহ্বান জানান বিএনপি মহাসচিব।