ভেজাল মদের কারখানা ও ‘কুশ’ ল্যাবের সন্ধান


ভেজাল মদের কারখানা ও ‘কুশ’ ল্যাবের সন্ধান
রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ভেজাল মদ তৈরির কারখানা এবং ওয়ারীতে ‘কুশ’ (উন্নত জাতের মারিজুয়ানা)-এর আধুনিক গবেষণাগারের সন্ধান পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। পৃথক অভিযানে এই দুটি মাদক কারবারি চক্রের পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ ভেজাল মদ, তৈরির উপকরণ ও কুশ। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে বৃহস্পতিবার সেগুনবাগিচায় ডিএনসির প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে ডিএনসির পরিচালক (অপারেশন) বশির আহমেদ বলেন, বুধবার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও জোয়ার সাহারায় অভিযান চালায় ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের দুটি দল। এ সময় বসুন্ধরার একটি ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে ভেজাল মদ তৈরির পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো ও সরঞ্জাম পাওয়া যায়। সেখান থেকে বিপুল অবৈধ মদ ও ভেজাল মদ তৈরির রাসায়নিকসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানকালে ডিএনসির কর্মকর্তারা দেখতে পান, ফ্ল্যাটটির একাধিক কক্ষ ব্যবহার করা হচ্ছিল ভেজাল মদ তৈরি, বোতলজাত করা ও সংরক্ষণের জন্য। সেখানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বোতলে ভেজাল মদ ভরে সিল লাগিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছিল। একই দিনে জোয়ার সাহারা এলাকায় অভিযান চালিয়ে মদের মজুত ও সরবরাহ-সংক্রান্ত আলামত উদ্ধার করা হয়। দুই অভিযানে গ্রেপ্তার তিনজনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে। তারা হলেন– রিপন হিউবার্ট গমেজ, আবদুর রাজ্জাক ও ডেনিস ডমিনিক পিরিছ। অভিযানে ৭৯ বোতল বিদেশি মদ, ১৬৬ ক্যান বিয়ার ও ভেজাল মদ তৈরির ১৩২ লিটার রাসায়নিক জব্দ করা হয়েছে। বিদেশ থেকে নিয়ন্ত্রণ হতো ঢাকার কুশ চাষ ডিএনসির পরিচালক বশির আহমেদ জানান, বিদেশ অবস্থান করেও ঢাকার ওয়ারীতে অপ্রচলিত ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মাদক কুশ উৎপাদন ও সংরক্ষণের পূর্ণাঙ্গ ল্যাবরেটরি (গবেষণাগার) পরিচালনা করছিল একটি চক্র। বিদেশে ইয়াবা পাচারচেষ্টার তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে গাজীপুরের টঙ্গীর একটি কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়। তখন বিদেশগামী একটি পার্সেল তল্লাশি করে বিশেষ কৌশলে লুকানো ইয়াবা পাওয়া যায়। পার্সেলটি ৩ জানুয়ারি কুরিয়ার সার্ভিসে বুকিং দেওয়া হয়েছিল। কুরিয়ার কার্যালয়ের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রথমে সুমেহরা তাসনিয়া ওরফে তাসনিয়া হাসান নামে এক নারীকে শনাক্ত করা হয়। পরে ঢাকার খিলগাঁও থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ডিএনসি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে তার বন্ধু তৌসিফ হাসানের নাম বেরিয়ে আসে। প্রবাসী তৌসিফ তাকে ব্যবহার করে নিজের বাসায় কুশ উৎপাদনের ল্যাব তৈরি করেছেন। এমন তথ্যে ডিএনসি ওয়ারীর ওই ভবনে অভিযান চালায়। সেখান থেকে ওই বাসার তত্ত্বাবধায়ক রাজু শেখকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি এই মাদক সংগ্রহ ও সরবরাহে সহায়তা করছিলেন। অভিযানে উদ্ধার করা হয় বিশেষ পদ্ধতিতে ল্যাবে চাষ করা অঙ্কুরিত কুশ গাছ, কুশ চাষের সরঞ্জাম, সদ্য উৎপাদিত ২০ গ্রাম কুশ, কুশের বীজ, ক্যানাবিনয়েড রেজিন, সিসা ১৫০ গ্রাম, সিসা সেবনের সরঞ্জাম, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিদেশি মদ ও ৪২ পিস ইয়াবা। কুশ ল্যাবের হোতা পলাতক ডিএনসি বলছে, কুশ ল্যাবের মূল পরিকল্পনাকারী ও নিয়ন্ত্রক পলাতক আসামি তৌসিফ হাসান। তিনি ঢাকার ওয়ারী এলাকায় বেড়ে ওঠেন। ‘ও’ লেভেল শেষ করে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশে বিদেশে পাড়ি জমান। সেখানে থেকেই তিনি নিজ বাড়িকে কেন্দ্র করে মাদক উৎপাদন ও সংরক্ষণের গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। তিনি ইন্টারনেটনির্ভর দূরনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির মাধ্যমে ঢাকার ল্যাবের কার্যক্রম তদারকি করতেন। দেশে থাকা সহযোগীদের নিয়মিত নির্দেশনা দিতেন। তার অনুপস্থিতিতে ল্যাবটি পরিচালিত হলেও নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরোপুরি তার হাতে। ওই বাসার একটি কক্ষে কুশ চাষের জন্য তৈরি আধুনিক ল্যাবরেটরি পাওয়া যায়। এ ছাড়া বাসার ছাদে টিন ও ফয়েল পেপার দিয়ে তৈরি একটি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত বিশেষ ঘরে একাধিক টবে কুশ গাছ চাষ করা হচ্ছিল। তৌসিফ প্রতিবছর একাধিকবার দেশে আসতেন।