সরু সড়কেই সর্বনাশ


সরু সড়কেই সর্বনাশ
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ চারলেনে সম্প্রসারণ, একটি উড়াল সড়ক ও চারটি বাইপাস নির্মাণের লক্ষ্যে ১০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একনেকে পাস হয়। ২০২৮ সালে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। অথচ দেড় বছর পরও এ প্রকল্পের দরপত্রের প্রক্রিয়াই শুরু হয়নি। দুই লেনের চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি দেশের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক। তার ওপর সড়ক ব্যবস্থাপনা অতিমাত্রায় দুর্বল হওয়ায় দুর্ঘটনা থেকে প্রাণহানি নিত্যদিনের খবর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর জন্য নানা কারণ তুলে ধরা হলেও দিন শেষে সবাই বলছেন সরু সড়কের কারণেই দুর্ঘটনা আর প্রাণহানি হচ্ছে। ঈদের দিন এ সড়কের লোহাগাড়া এলাকায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৫ জন নিহত হন। বুধবার সকালে বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে চালকসহ ১০ জন নিহত হন। ঈদের ছুটিতেই ওই সড়কে তিন দুর্ঘটনা ঘটে।বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি ও নিরাপদ সড়ক চাই-এর চট্টগ্রামের সভাপতি এসএম আবু তৈয়ব বলেন, অতীতে ক্ষমতাসীনদের কেউ-ই এই সড়ককে সুনজরে দেখেননি। ফলে কক্সবাজারের সঙ্গে সারাদেশের যোগাযোগের একমাত্র সড়কটি অবহেলিতই রয়ে যায়। এটি নামে মহাসড়ক হলেও বেশির ভাগ অংশ কোনো সড়কই নয়। আমাদের দাবি হলো, চারলেন নয়Ñ ব্যস্ততা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মাথায় রেখে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি ছয়লেনে উন্নীত করতে হবে। আর ছয়লেনে উন্নীত করা না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন দুটি ট্রেনের পরিবর্তে অন্তত ৫টি ট্রেন চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে সড়কে যানবাহনের ওপর কিছুটা হলেও চাপ কমবে। তিনি বলেন, ১৬০ কিলোমিটারের সড়কটিপার হতে গড়ে ৫ ঘণ্টা লেগে যায়, যা মানুষের জন্য অনেক বেশি কষ্টের।সড়ক ও জনপথ বিভাগের দোহাজারী কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন খালেদ চৌধুরী বলেন, ২০২৩ সালে একনেকে পাস হওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী মাসে দরপত্র আহ্বান করা হবে। প্রকল্পটি অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে এবং ভবিষ্যতেও এই সম্প্রসারণ কাজ অব্যাহত থাকবে।জানা যায়, দুই ধাপে ১৫৯ কিলোমিটার দীর্ঘ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে চারলেনে বাস্তবায়নে অর্থায়ন করার আগ্রহ প্রকাশ করে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা-জাইকা। পুরো কাজের তদারকি করবে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। সে হিসেবে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। এটি দুধাপে বাস্তবায়ন হবে। প্রথম ধাপে তিনটি বাইপাস, একটি আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ ছয়লেনের উড়াল সড়ক এবং পটিয়ার সীমানার পুরো সড়ককে চারলেনে উন্নীত করা হবে। তিনটি বাইপাসের মধ্যে আছে দোহাজারী, পদুয়া, আমিরাবাদ ও চকরিয়া। দোহাজারী বাইপাস করতে গিয়ে বর্তমান শঙ্খ নদীর ভাটির দিকে আরও একটি ছয়লেনের সেতু নির্মাণ করা হবে। আবার চকরিয়ায় মাতামুহুরী নদীতেও দুলেনের একটি সেতু নির্মাণ করা হবে। ওই সড়ক ও সেতুটি সরাসরি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। কেরানীহাটে একটি আড়াই কিলোমিটারের উড়াল সড়ক (ফ্লাইওভার) নির্মাণ করা হবে, যেটি শুরু হবে দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইনের আগে থেকে।প্রকল্পের এই ধাপে সম্ভব্য খরচ ধরা হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা, যার পুরোটাই জাইকা দেবে। দ্বিতীয় ধাপে কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ওয়াই জংশন থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে ৯৫ কিলোমিটার সড়ক। তা-ও চারলেনে উন্নীত করা হবে, যথারীতি অর্থায়ন করবে জাইকা।প্রকল্প পরিচালক, সড়ক ও জনপথ বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শ্যামল ভট্টাচার্য বলেন, জাইকার সঙ্গে আমাদের সম্পাদিত ঋণ চুক্তি অনুযায়ী আমাদের নেওয়া সব পদক্ষেপ তাদের জানাতে হয়। প্রকল্পটির তিনটি ধাপ। প্রথম হলো ডিটেইল ডিজাইন, এরপর দরপত্র এবং সর্বশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন। আমরা পরামর্শক নিয়োগের জন্য জাইকার কাছে জমা দিয়েছি। তারা পর্যালোচনা শেষ করে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পরামর্শক নিয়োগ দিতে পারব বলে আশা করছি। আর দরপত্র আহ্বান করতে এক বছর সময় লাগতে পারে। আমাদের সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) ও জাইকার নিয়ম দুটোই অনুসরণ করতে হয়।চট্টগ্রাম-কক্সবাজার দেশের ব্যস্ততম সড়কের একটি। এটির বেশির ভাগ অংশের প্রশস্ততা ১৮ থেকে ৩৪ ফুট। ফলে দূরপাল্লার গাড়িগুলো নিজস্ব গতিতে চলতে পারে না। ১৫৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে একটি দ্রুতগতির বাসের সময় লাগে গড়ে ৫ থেকে সাড়ে ৫ ঘণ্টা। অতিরিক্ত বাঁক, সাইড রোড থেকে হরহামেশা গাড়ি সড়কে ওঠে আসার কারণে সড়কটি বাংলাদেশের অন্যতম দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়ক হিসেবেও চিহ্নিত হয়েছে।