ইরানের বিক্ষোভ নিয়ে সবশেষ যা জানা যাচ্ছে
অনলাইন নিউজ ডেক্স
ইরানের বিক্ষোভ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। দেশটিতে ছড়িয়ে পড়া এ বিক্ষোভে রাজধানী তেহরানসহ বেশ কয়েকটি শহরে জনতার ঢল নেমেছে। ২০২২ সালে তেহরানে পুলিশ হেফাজতে কুর্দি নারী মাসা আমিনির মৃত্যুর ঘটনায় দেশটিতে হওয়া বিক্ষোভের পর এটিকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এজন্য দেশটিতে চলমান অর্থনৈতিক মন্দাকেই দায়ী করা হচ্ছে।
রোববার (১১ জানুয়ারি) বিবিসির এক প্রতিবেদনে ইরানের সবশেষ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের ডাকা কর্মসূচি থেকে এ আন্দোলনের শুরু হয়েছে। এটি এখন ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির ৩১টি প্রদেশের ১০০টিরও বেশি শহরে অসংখ্য মানুষ বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন।
দেশটিতে শুরু হওয়া এ বিক্ষোভ দুই সপ্তাহের বেশি সময় পার করেছে। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে অন্তত ৬০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া হওয়া গেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৪৮ জন বিক্ষোভকারী এবং ১৪ জন নিরাপত্তা কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। ইরানের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোও আন্দোলনের কারণে সংকটের মুখে পড়েছে। একজন চিকিৎসক জানান, রোগীদের ভিড় সামলাতে হাসপাতালে পর্যাপ্ত সার্জন নেই। সংকটে পড়েছে চক্ষু হাসপাতালও। এছাড়া দেশটিতে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় বন্ধ থাকা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ না থাকায় প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে।
চলমান আন্দোলনকে ‘বিদেশি-প্রণোদিত’ নাশকতা হিসেবে অভিহিত করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তিনি জানান, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের চাপে সরকার পিছু হটবে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করতেই আন্দোলনের নামে এই পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে চিঠি দিয়েছে ইরান। এতে বিক্ষোভকে ‘সহিংস নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড এবং ব্যাপক ভাঙচুরে’ রূপান্তরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করা হয়েছে। অন্যদিকে ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সতর্কবার্তায় বলেন, তোমরা গুলি শুরু না করাই ভালো, কারণ আমরাও গুলি শুরু করব।
আন্দোলনের শুরু যেভাবে
২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং আগে থেকেই দেশটির বিভিন্ন খাতে দেওয়া আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে আরও দুর্বল হয়ে পড়ে দেশটির অর্থনীতি। বছরজুড়েই ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের ব্যাপক অবমূল্যায়ন এবং অতিরিক্ত মুদ্রাস্ফীতির কারণে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষ। এমন প্রেক্ষাপটে গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজারে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট থেকেই চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের সূচনা হয়।
ব্যবসায়ীদের আন্দোলন ক্রমেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছড়াতে শুরু করলে দ্রুত প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেয় দেশটির সরকার। এরইমধ্যে বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে কয়েকটি ছোট শহরে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলন এখন পর্যন্ত দেশটির ৩১টি প্রদেশের ১০০টিরও বেশি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। এরমধ্যে ৬৭টি স্থানের ভিডিও যাচাই করেছে বিবিসি ভেরিফাই।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংবাদ সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই বিক্ষোভ ৪৮ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজন শিশু এবং আটজন নিরাপত্তা কর্মী রয়েছেন।
খামেনির কড়া বার্তা
চলমান বিক্ষোভ নিয়ে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনি বলেণ, সমস্যা সৃষ্টিকারীদের বিশৃঙ্খলার মুখে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র পিছু হটবে না। শুক্রবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত বক্তব্যে তেহরানে ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীরা ‘শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে খুশি করার জন্য’ তাদের নিজস্ব ভবন ধ্বংস করেছে।
আলোচনায় রেজা পাহলভি
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মাঝেই নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন দেশটির শেষ শাহের (সম্রাট) নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভি। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শাহের জ্যেষ্ঠ পুত্র রেজা পাহলভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় সাম্প্রতিক বিক্ষোভকে ‘অভূতপূর্ব’ বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘ইরানের জনগণকে সাহায্য করার জন্য হস্তক্ষেপ করতে প্রস্তুত থাকার’ আহ্বানও জানিয়েছিলে তিনি।
বিবিসি জানিয়েছে, ইরানে চলমান বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেকে দেশটির শেষ শাহের নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভির প্রত্যাবর্তনের দাবি জানিয়েছেন।
