তপশিলের পর গুলির ঘটনা ৩৪টি, অস্ত্র উদ্ধার ১১৩৯
অনলাইন নিউজ ডেক্স
মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে দুজন গুলিবিদ্ধসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন। গত শনিবার ওই সংঘর্ষের সময় প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আলু ক্ষেতের মধ্য দিয়ে দৌড়াদৌড়ি ও ককটেল বিস্ফোরণের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ৪ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর রায়পুরায় আধিপত্য বিস্তার ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বে বাড়িঘরে আগুন ও সংঘর্ষের ঘটনায় মুস্তাকিম মিয়া (১৩) নামে এক স্কুলছাত্র গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে। শুধু মুন্সীগঞ্জ ও নরসিংদী নয়, ১১ ডিসেম্বরে তপশিল ঘোষণার পর থেকে গত রোববার পর্যন্ত ৫৮ দিনে আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত বিরোধে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার মধ্যে ৩৪টিতে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়। পুলিশের বিশেষ শাখার তথ্য বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
এতে দেখা যায়, অস্ত্রের ব্যবহার বেশি হয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। ‘শুটিং ইনসিডেন্ট’ হিসেবে বিবেচিত গুলির ঘটনার ৪৬ শতাংশ এই দুই বিভাগে ঘটেছে। অস্ত্রের ব্যবহার কম হয়েছে ময়মনসিংহ, রংপুর ও গাজীপুর মহানগরে।
পুলিশের লুণ্ঠিত এক হাজার ৩৩১টি অস্ত্র ও দুই লাখ রাউন্ডের বেশি গুলি এখনও বেহাত।
কারাগারের লুণ্ঠিত ২৭টি অস্ত্র ও গুলি সাত হাজার রাউন্ডের হদিস নেই। আবার প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে অবৈধ অস্ত্র জব্দ হচ্ছে। বেহাত অস্ত্র, সংঘর্ষ ও অস্ত্র জব্দের পরিসংখ্যান ভোটের মাঠের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না সংশ্লিষ্টরা।
গত কিছুদিন সেনা, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও র্যাবের অভিযানে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অবৈধ দেশি-বিদেশি এক হাজার ১৩৯টি অস্ত্র জব্দ হয়েছে। কিছু অভিযানে গ্রেপ্তার হচ্ছে তালিকাভুক্ত অপরাধী। ডেভিল হান্ট ফেজ-২-তে গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পুলিশের অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ৬৪৪টি। এ ছাড়া ১২ ডিসেম্বর থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেনাবাহিনীর অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ২০৪টি। বিজিবি গত ডিসেম্বরে ১২টি দেশি-বিদেশি পিস্তল, একটি রাইফেল; জানুয়ারি মাসে ১৪টি পিস্তল ও একটি হ্যান্ড গ্রেনেড এবং চলতি মাসের ৯ দিনে ৯টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে। এ ছাড়া তপশিল ঘোষণার পর র্যাব উদ্ধার করেছে ২৫৬টি আগ্নেয়াস্ত্র ও এক হাজার ৬৫২ রাউন্ড গোলাবারুদ।
দরজায় কড়া নাড়ছে ভোট। এর মধ্যে প্রতিদিন বিভিন্ন বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। গতকাল সোমবার শেরপুরের সাপমারী ও ভাতশালা ইউনিয়নে যৌথ বাহিনীর অভিযানে হারেছ আলী নামে একজনকে আটক করা হয়। তাঁর কাছ থেকে একটি শটগান উদ্ধার হয়েছে। ওই অস্ত্রটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট লুট হওয়া বলে জানা গেছে। আটক হারেছকে শেরপুর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে যৌথ বাহিনী।
এ ব্যাপারে রাতে শেরপুর সদর থানার ওসি মো. সোহেল রানা বলেন, শেরপুর সদর থানা থেকে ৫ আগস্ট চারটি অস্ত্র লুট হয়। এখন পর্যন্ত তিনটি অস্ত্র পাওয়া গেছে। পুলিশের লুণ্ঠিতসহ গ্রেপ্তার হারেছ কোনো রাজনৈতিক দলের পদে রয়েছেন বলে জানা নেই। তাকে আসামি করে মামলা হয়েছে।
শনিবার ফরিদপুর সদরের কানাইপুরে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে চারটি বিদেশি পিস্তল, দুটি সিঙ্গেল ব্যারেল শুটারগানসহ গোলাবারুদ জব্দ করে। এ ব্যাপারে ফরিদপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম বলেন, অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। অনুসন্ধান করে কারও সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেলে মামলা হবে। তবে এগুলো পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র নয়। হয়তো নাশকতার জন্য কেউ অস্ত্রগুলো মজুত করেছিল।
গত শুক্রবার রাজধানীর বাড্ডায় পোস্ট অফিসপাড়ার একটি বাসা থেকে ১১টি বিদেশি পিস্তল ও ৩৯৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় মেহেদী হাসান বিপু নামে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গত সোমবার প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর জানায়, তপশিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন ঘিরে দেশে ২৭৪টি নির্বাচনী সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় হত্যাকাণ্ড হয়েছে পাঁচটি। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলছে, তপশিল ঘোষণার পর ৩৬ দিনে সারাদেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী নিহত হন। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) বলছে, জানুয়ারিতেই ৬৪টি নির্বাচনী সহিংসতা ও ২৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
অস্ত্র ব্যবহারের তথ্য
পুলিশের বিশেষ শাখার হিসাবে তপশিল ঘোষণার পর থেকে গত রোববার পর্যন্ত গুলির ব্যবহার ঘটেছে ৩৪টি। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে অস্ত্রের ব্যবহার ৯টি, চট্টগ্রাম ৭টি, খুলনায় ৫টি, ঢাকা মহানগরে ৫টি, খুলনা বিভাগে ৪টি, রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম মহানগর ও রংপুর বিভাগে একটি করে গুলির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১০ জন। তার মধ্যে ঢাকা মহানগরে দুজন, ঢাকা বিভাগে দুজন এবং চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে তিনজন করে ছয়জন হত্যার শিকার হন।
বেশ কিছু অভিযান
দেশের বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রতি সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর অভিযানে অস্ত্র, গুলি উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। নির্বাচন ঘিরে ২০ জানুয়ারি থেকে এক লাখ সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া রোববার থেকে সব বাহিনীর ৯ লাখের বেশি সদস্য নির্বাচনী দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে দেশব্যাপী তৎপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
গতকাল যৌথ বাহিনীর একাধিক অভিযানে অস্ত্র-গুলি উদ্ধার হয়। সোমবার ভোরে সাভারের চাপাইন এলাকায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে বিশেষ অভিযানে তিনটি বিদেশি পিস্তল, ৪টি ম্যাগাজিন, ২০ রাউন্ড গুলি, ৬ রাউন্ড কার্তুজ ও দেশীয় অস্ত্রসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া রাতে উত্তরা ও মিরপুরে পৃথক অভিযানে একটি বিদেশি পিস্তল, ওয়াকিটকি, র্যাবের নকল পরিচয়পত্র, একটি ম্যাগাজিনসহ তিনজন ভুয়া র্যাব পরিচয়ধারী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মাগুরা সদর উপজেলার রাউতরা গ্রামে অভিযানে দুটি বিদেশি পিস্তল জব্দ হয়। রোববার কুমিল্লার দাউদকান্দিতে যৌথ বাহিনীর অভিযানে একটি পিস্তলসহ আরও একজন গ্রেপ্তার হয়। এ ছাড়া যশোর সদর উপজেলার বারান্দি মোল্লাপাড়া এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে দুটি বিদেশি পিস্তলসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। শনিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেট এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে দুটি বিদেশি পিস্তলসহ একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
লুটপাটের অস্ত্রের হদিস নেই
বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া এক হাজার ৩৩১টি অস্ত্রের এখনও হদিস নেই। গুলি পাওয়া যায়নি দুই লাখ ৫৭ হাজার ১৪৪ রাউন্ড। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গণঅভ্যুত্থানের সময় থানাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র আর ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮ রাউন্ড গুলি লুট হয়। অস্ত্র উদ্ধারের জন্য সরকার পুরস্কার ঘোষণা করলেও তাতে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া কারাগার থেকে লুট হওয়া ২৭টি অস্ত্র ও ৭ হাজার রাউন্ড গুলি খোঁজ মেলেনি। বেহাত এসব অস্ত্র ও গুলি জব্দ না হওয়ায় নির্বাচনের সময় এবং এর পরে নাশকতার আশঙ্কা করছেন অনেকে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলেন, অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তবর্তী ৩৫ জেলার পুলিশ সুপারকে নজরদারি ও অভিযান বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিজিবি আরও সতর্ক রয়েছে।
এদিকে ১৩ ডিসেম্বর ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ চালুর পর থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশে ২৪ হাজার ৬২০ জন গ্রেপ্তার এবং ৬৪৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে পুলিশ সদরদপ্তর। গ্রেপ্তার অনেকে জামিন পেয়েছেন।
সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা মনে করি, এখন থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি শুধু না; তার পরবর্তী বেশ কিছুদিন পর্যন্ত সহিংসতার ঝুঁকি রয়ে গেছে।’
নির্বাচনী সহিংসতার পরিসংখ্যান
দেশে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার ঘটনা নতুন নয়। সব নির্বাচনে কম-বেশি হতাহতের নজির আছে। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হন দুজন, আহত ৭৫০ জন। ২০১৮ সালের ভোটে সহিংসতায় মারা যান ১৬ জন ও আহত হন ৬৭০ জন। ২০১৪ সালের দশম নির্বাচনে সহিংসতায় মারা যান ১১৫ জন, আহত হন ৮৫৪ জন। ২০০৮ সালের নবম নির্বাচনে সহিংসতায় মারা যান সাতজন, আহত হন চারজন। ২০০১ সালের অষ্টম নির্বাচনে সহিংসতায় মারা ২৫ জন, আহত হন ৩৭৩ জন।
