কঠোর অবস্থানে সেনাবাহিনী


কঠোর অবস্থানে সেনাবাহিনী
দেশে সাধারণ মানুষকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপহার দিতে বদ্ধপরিকর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় থেকে সিভিল প্রশাসনকে সহায়তা দিতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা মাঠে রয়েছেন। তবে নির্বাচন ঘিরে সেনাবাহিনী এই প্রথম আসল মেজাজে ফিরেছে বলে জনমনে আলোচনা উঠেছে। সবাই বলছেন, সাধারণ মানুষ এখন যেভাবে স্বস্তি অনুভব করছে, সেনাবাহিনীর দায়িত্ব এমনই হওয়া উচিত। বাহিনীর সদস্যরা যেমন সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধার সৃষ্টি করছে না, ঠিক তেমনি দুর্বৃত্তদের রেহাইও দিচ্ছে না। বুধবারও রাজধানীজুড়ে সেনাবাহিনীর সব সদস্যকে সতর্কভাবে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। এতে সাধারণ মানুষ বলছেন, সেনাবাহিনী এভাবে দায়িত্ব পালন করলে ভোটে কারচুপি রোধ করা যাবে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর সেনাবাহিনীকে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ এর আওতায় ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামানো হয়। এরপর সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়। তবে নির্বাচনের আগে এবার এক লাখ সেনাসদস্য মাঠে নামানোর পর পাড়া-মহল্লা, অলিতে-গলিতে যেসব ছিঁচকে চোর, ছিনতাইকারী, পকেটমার, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ ছিল তারা প্রায় সবাই গা-ঢাকা দিয়েছে। এখন আর তাদের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। রাস্তার পাশে, চায়ের দোকানে-কোথাও নেই জটলা। দেখা মিলছে না কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসী ও মাস্তানের। এছাড়া রাজধানীর বস্তিতেও গ্রেফতারের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় সব ধরনের অপরাধীরা চলে গেছে আত্মগোপনে। কারণ সেনাবাহিনী যেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্যকেই ছাড় দিচ্ছে না, সেখানে অস্ত্রধারী ও দুর্বৃত্তদের ভয় পাওয়ারই কথা। গত ৫ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ প্রেস ব্রিফিংয়ে সেনা সদরের সামরিক অপারেশন্স পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি সুশৃঙ্খল এবং দেশমাতৃকার সেবায় নিয়োজিত একটি বাহিনী। সেনাপ্রধান পরিষ্কারভাবে একটি কথা বলে দিয়েছেন-সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করব। দেশের সাধারণ মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্র যেতে পারে এবং তার ভোট দিতে পারে তা নিশ্চিত করাই হবে আমাদের অন্যতম দায়িত্ব। সেনাসদর জানায়, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচনের আগেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। যে কারণে গত ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে মোতায়েনকৃত সেনাসদস্য ৫০ হাজারে উন্নীত করা হয়েছে। পরে ২০ জানুয়ারি ১ লাখ সেনা মোতায়েন করা হয়। এর পাশাপাশি নৌবাহিনী ৫ হাজার এবং বিমানবাহিনী ৩ হাজার ৭৩০ জন সেনা মোতায়েন করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সারা দেশে ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬২টি জেলার ৪১১টি উপজেলায় এবং মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে সর্বমোট ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছে। এতে নিয়মিত টহল, যৌথ অভিযান এবং চেকপোস্ট স্থাপনের মাধ্যমে নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম চলমান রাখা হয়েছে। এর ফলে একদিকে অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা যেমন অনেকগুণ বেড়েছে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। সেনাসদরের তথ্য মতে, গত ২০ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৪ দিনে দেড় শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে; যার অধিকাংশই বিদেশি পিস্তল। সব মিলিয়ে গত গত ১৭ মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত ১০ হাজার ১৫২টি অস্ত্র, ২ লাখ ৯১ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে। পাশাপাশি ২২ হাজার ২৮২ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং দুষ্কৃতকারীকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। এর আগে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় জরুরি অবস্থা জারি করে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানো হয়েছিল। তখনো সেনাবাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে যায় এমন কাজ থেকে বিরত থেকেছে। এমনকি নির্দেশনা সত্ত্বেও তারা ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে যায়নি। কাউকে গুলিও করেনি। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে সবচেয়ে সক্রিয় অবস্থায় দেখা যাচ্ছে বলে জনমনে আলোচনা হচ্ছে। তারা কাউকে ছাড় দিচ্ছে না, আবার কাউকে অযথা হয়রানিও করছে না। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মধ্যরাত থেকে দেশব্যাপী কারফিউ জারি করে শেখ হাসিনার সরকার। সিভিল প্রশাসনকে সহায়তা দিতে তখন থেকেই মাঠে সেনাবাহিনী নামানো হয়। গত কয়েকটি নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানো হলেও তারা মূলত রিজার্ভ ফোর্স হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছে। নির্বাচন কেন্দ্র থেকে তারা দূরে অবস্থান করেছিল। তবে এবার সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতাসহ বেশকিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত সেনাবাহিনী টহল কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। চাইলে কাউকে গ্রেফতারও করতে পারবে। সেনাসদরের সামরিক অপারেশন্স পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন জানান, নির্বাচনে সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্ন পরিবেশ নিশ্চিতে এক লাখ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এর আগের নির্বাচনগুলোতে আমরা সর্বোচ্চ ৪০-৪২ হাজার সদস্য মোতায়েন করেছি। অন্যান্য নির্বাচন থেকে এবারের নির্বাচনে আমাদের সেনা মোতায়েনের পার্থক্য হচ্ছে, এবার ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনীকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আগের নির্বাচনগুলোতে এই অনুমতি ছিল না। আগের নির্বাচনগুলোতে আমরা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে দূরবর্তী জায়গায় অবস্থান করেছি। এবার সাধারণ ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন, সেটা মাথায় রেখে সেনাবাহিনী প্রধান ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সেনাসদস্যদের সেনানিবাসে রেখে সুষ্ঠু ইলেকশন করার জন্য বাকি সব সদস্যকে নিয়োগ করা হয়েছে।